লিখতে লিখতে হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল বিনয়। পোর্টব্লেয়ার থেকে জেফ্রি পয়েন্টে ফেরার পর বাবার কথা একবারও ভাবে নি সে। উদ্বাস্তুদের এই সৃষ্টিছাড়া উপনিবেশে এমন সব কান্ড ঘটে গেছে যে ভাবার মতো সময়ও ছিল না। কোনও কার্যকারণ নেই, তবু মনের গোপন এক কুঠুরি থেকে অবনীমোহন এই মধ্যরাতে বেরিয়ে এলেন। মনের ভাবগতিক বোঝা ভার। কখন কোন দিকে মানুষকে ছুটিয়ে নিয়ে যাবে, অনেক সময় আগে থেকে তার সংকেত মেলে না।
অবনীমোহনের চিঠি আগেও পেয়েছে বিনয়। এবার পোর্টব্লেয়ারে থাকার সময় তাঁর আরও একটা চিঠি এসেছে। সেটা বিময়ের কাছেই আছে। কী ভেবে খাটের তলা থেকে নিজের সুটকেসটা টেনে এনে সেটার ভেতর থেকে চিঠি বের করে ধীরে ধীরে পড়ে ফেলল। এই নিয়ে বারদশেক পড়া হল।
বিনয়ের বাবা অবনীমোহন বসু চিরকালই তার কাছে মস্ত এক প্রহেলিকা। প্রথম জীবনে তিনি কয়েক বছর অধ্যাপনা করেছেন। তারপর হঠাৎই নেমে পড়লেন ব্যবসায়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় কলকাতা থেকে ঢাকা ডিস্ট্রিক্টের রাজদিয়ায় গিয়ে জমি কিনে চাষবাস শুরু করলেন। খুব বেশি হলে দেড় দু’বছর। তারপর জমিজমা আবাদ ছেড়েছুঁড়ে আসামে গিয়ে চুটিয়ে কিছুকাল কনট্রাক্টরি। মহাযুদ্ধ শেষ হলে কলকাতায় ফিরে এক গুরুর কাছে দীক্ষা নিয়ে মগ্ন হলেন ধর্মকর্মে। কলকাতায় আর ক’দিনই বা থাকতেন! মাঝেমাঝেই চলে যেতেন বেনারসে গুরুর আশ্রমে। জীবনযাপনে শৃঙ্খলা নেই, নেই ধারাবাহিক কোনও পরিকল্পনা। সম্পূর্ণ খামখেয়ালি একটি মানুষ। স্ত্রী আগেই মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনটি সন্তান তো ছিল–সুনীতি, সুধা আর বিনয়। তাদের নিয়ে গুছিয়ে গাছিয়ে বাকি দিনগুলো স্বচ্ছন্দে কাটাতে পারতেন। কিন্তু ঘর-সংসারের প্রতি আসক্তি তার ছিল না। সব পিছুটান ছিন্ন করে চিরকালের মতো চলে গেলেন গুরুর আশ্রমে, কাশীতে।
এত এত কান্ড ঘটানোর পরও বাবাকে বিনয়ের মনে হত উদার, সহানুভূতিশীল, হৃদয়বান। কিন্তু বেনারসে যাওয়ার আগে তাঁর সম্বন্ধে বিনয়ের যাবতীয় ধ্যানধারণা ভেঙে চুরমার করে দিয়ে গেছেন অবনীমোহন। দাঙ্গায় ধর্ষিতা ঝিনুককে তিনি মনে প্রাণে গ্রহণ করতে পারেননি। রক্তের মধ্যে সঞ্চরমান আজন্মের জীর্ণ সংস্কারকে বিসর্জন দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব হয় নি। অপমানে, মানসিক আঘাতে বিপর্যস্ত ঝিনুক নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। সেই চরম ধাক্কাটা এসে লাগে বিনয়ের ওপর। যে মেয়েটি কিশোর বয়স থেকে তার শ্বাসপ্রশ্বাসে জড়িয়ে আছে, উদ্ভ্রান্তের মতো তাকে বিশ্বব্রহ্মান্ডে খুঁজে বেড়িয়েছে সে। শেষ পর্যন্ত আন্দামানে তার সঙ্গে হঠাৎই দেখা হয়ে গেছে।
এই সময়েই এসে গেছে অবনীমোহনের চিঠি। তিনি মৃত্যুশয্যায়। পৃথিবী থেকে চিরবিদায়ের আগে তাঁর সংস্কারমুক্তি ঘটেছে। ঝিনুকের সঙ্গে অমানুষিক, নির্মম আচরণের জন্য এখন তিনি অনুতপ্ত, গ্লানিবোধে জর্জরিত।
অবনীমোহন লিখেছেন, বিনয় যেন যেভাবে পারে ঝিনুককে খুঁজে বের করে একবার তার কাছে নিয়ে যায়। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল থেকে ফুসফুসে শেষ শ্বাসটি নেওয়ার আগে চিরদুঃখী মেয়েটির কাছে তিনি ক্ষমা চেয়ে নেবেন।
শেল কালেক্টরদের মোটর বোটটা জেফ্রি পয়েন্টে আসবে কয়েক দিন পর। ওরা বলেছে তাকে মিডল-আন্দামানে পৌঁছে দেবে। সেখানে গিয়ে ঝিনুককে বুঝিয়ে সুঝিয়ে কলকাতায় নিয়ে যাবে বিনয়। তারপর বেনারস। এক দেড়মাসের আগে কি তা সম্ভব? ততদিন কি অবনীমোহন বেঁচে থাকবেন? তা হলে এখন কী করবে সে? দেশভাগের পর কত সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু এমনটা আগে আর কখনও তার জীবনে আসে নি।
হঠাৎ এই মধ্যরাতে জেফ্রি পয়েন্টের নিঝুম রিফিউজি সেটলমেন্টকে চকিত করে একটা ব্যাকুল, আর্ত, করুণ, চিৎকার কারও হৃদপিণ্ড ভেদ করে যেন একটানা উঠে আসতে লাগল।
চমকে উঠল বিনয়। ওপাশের খাটে ধড়মড় করে উঠে বসেছেন শেখরনাথ। বিভ্রান্তের মতো জিগ্যেস করলেন, ‘কেউ যেন কাঁদছে, তাই না?’
বিনয় মাথা নাড়ল।–’হ্যাঁ।‘
‘কোন দিক থেকে আওয়াজটা আসছে?’
‘বুঝতে পারছি না।‘
‘চল তো, দেখা যাক এই নিশুতি রাতে কে এমন করে কাঁদছে–’ শেখরনাথকে খুব চিন্তিত দেখাল।
.
৪.১৩
চকিতে অবনীমোহনের চিঠি টেবিলের দেরাজে ঢুকিয়ে দিয়ে তার সামনের লণ্ঠনটা এক হাতে ঝুলিয়ে নিল বিনয়। শেখরনাথ নিলেন একটা চার ব্যাটারির বড় টর্চ। তারপর দু’জন ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল। শেখরনাথের খাটের পাশে ছোট টেবিলের ওপর যে লণ্ঠনটা জ্বলছিল সেটা জ্বলতেই লাগল।
কান্নাটা আরও তীব্র, আরও করুণ হয়ে উঠেছে। ঘরের বাইরে এসে টর্চ জ্বাললেন শেখরনাথ। কিন্তু বিনয়ের হাতের লণ্ঠন বা টর্চের আলো চারপাশের কুয়াশামাখা জমাট ঘোলাটে অন্ধকার সরিয়ে বেশি দূর এগুতে পারছে না।
বিনয়ের হঠাৎ মনে পড়ল, এমন কান্না আগেও সে শুনেছে। শুধু কোনও এক জায়গায় নয়; অনেক,অনেক জায়গায়। সেই সব কান্নাতেও ছিল একই আকুলতা, বুকে শেল বিধলে যেরকম হয়। সেই একই যন্ত্রণা। কিন্তু কোথায় কোথায় শুনেছিল, কিছুতেই ভেবে পেল না বিনয়।
উদ্বাস্তুদের ব্যারাকগুলোতে কোনও রকম সাড়াশব্দ নেই। সারাদিন জমিতে প্রচন্ড খাটাখাটুনির পর খেয়ে দেয়ে এমন গভীর ঘুমে তারা তলিয়ে আছে যে মধ্যরাতের এই আর্ত রোদনও তাদের ঘুম ভাঙাতে পারে নি।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।