তিন দিনের মধ্যে পুরনো উদ্বাস্তুদের ব্যারাকগুলোর গা ঘেঁষে একুশটা তাঁবু সারি দিয়ে মাথা তুলে ফেলল। আন্দামানের দুর্গম বনভূমি-ঘেরা এই ভূখন্ডে যেন ছিন্নমূল মানুষের জন্য একুশটা বল্মীক। তাবু বানানো হওয়ামাত্র ছত্রিশটি পরিবারকে সেগুলোর ভেতর নিয়ে যাওয়া হল। তাঁবুগুলো বিরাট বিরাট; ভেতরে অনেকটা করে পরিসর। কুড়িটা তাবুতে দু’টো তিনটে করে ফ্যামিলির জায়গা হয়েছে; বাকি একটায় চারটে ফ্যামিলি। বেশ হাত-পা মেলে তারা থাকতে পারল। তাবু খাটানোর পর বনবিভাগ আর পুনর্বাসন দপ্তরের কর্মীরা আবার তাদের পুরনো ডিউটিতে ফিরে গেল।
.
আপাতত বিশ্বজিৎদের জন্য নির্দিষ্ট দুটো ঘরের একটায় আছেন শেখরনাথ আর বিনয়। পাশের ঘরটায় আছে স্টিল ফোটোগ্রাফার নকুল বিশ্বাস।
দিন তিনেক পরের কথা।
এখন বেশ রাত হয়েছে। একটা ঘরে দু’পাশের দেওয়াল ঘেঁষে দু’টো তক্তপোষে বিছানা। শিয়রের দিকে খোলা জোড়া জানলার এধারে চেয়ার টেবিল।
ঘন্টাখানেক আগে রাতের খাওয়া চুকিয়ে শেখরনাথ বিনয়ের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্পটল্প করে একটা খাটে শুয়ে পড়েছেন। তবে এখনও ঘুমোন নি। তার খাট ঘেঁষে ছোট নিচু টেবিলের ওপর কাঁচের লণ্ঠন জ্বলছে। সেই আলোয় তিনি একটা বই পড়ছেন। রাত্তিরে ঘন্টা দেড়-দুই বই না পড়লে তাঁর ঘুম আসে না। বই পড়াটা তার দীর্ঘকালের প্রিয় অভ্যাস। অবশ্য যত কাল তিনি সেলুলার জেলে কাটিয়েছেন তখন তো বই পেতেন না। ইংরেজের কয়েদখানায় নারকেল ছোবড়া পিটে সরু সরু তার বের করতে করতে বা ঘানি ঘুরিয়ে দিনে পনেরো সের সরষের তেল বের করে মাসের পর মাস কেটে গেছে। এই রুটিনের একটু এদিক ওদিক হলে হয় ‘টিকটিকি’তে চড়িয়ে চাবুক মারা হত, নইলে ‘খানা বন্ধ’ (খাবার-দাবার না দিয়ে শাস্তি)। আহাদ করে কে আর তাকে তার পছন্দসই বই জোগাচ্ছে! তা ছাড়া বই পেলেও সমস্ত দিন হাড় ঘেঁতো-করা খাটুনির পর পড়ার মতো উদ্যম আর থাকত না। শরীর থেকে সমস্ত এনার্জি নিংড়ে নিয়ে ফের তাকে ‘সেল’-এ ঢুকিয়ে তালা বন্ধ করে দেওয়া হত। সেলুলার জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর শেখরনাথ আবার তার পুরনো অভ্যাসে ফিরে গেছেন।
বিনয় অবশ্য শুয়ে পড়ে নি। শিয়রের দিকের বড় টেবিলটার ওপর আরও একটা জোরালো লণ্ঠন জ্বলছে। সেখানে বসে সে তাদের ‘নতুন ভারত’ কাগজের জন্য প্রতিবেদন তৈরি করেছিল। পোর্টব্লেয়ারে। মোহনবাঁশি কর্মকারের চিকিৎসার জন্য যে ক’টা দিন তাদের থাকতে হয়েছে, শেখরনাথ তাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সেলুলার জেলটা দেখিয়েছেন। ইংরেজ আমলের এই বিশাল কয়েদখানার প্রায় সাড়ে আটশো ন’শো সেলে সাধারণ বন্দি থেকে স্বাধীনতা-সংগ্রামী সশস্ত্র বিপ্লবীরা কী অবস্থায় দিন কাটিয়েছেন, তাঁদের। ওপর কী নিদারুণ নির্যাতন চালানো হত, তার অনুপুঙ্খ বিবরণ দিয়েছেন তিনি। শুনতে শুনতে সেই সব দিনের স্পষ্ট সব ছবি চোখের সামনে ফুটে উঠছে বিনয়ের। শুধু কি সেলুলার জেলেই, পোর্টব্লেয়ারের দক্ষিণ দিকে শাদিপুরেও তাকে নিয়ে গেছেন শেখরনাথ। সেলুলার জেলের পুরুষ-কয়েদিদের সঙ্গে সাউথ পয়েন্ট জেলের মেয়ে-কয়েদিদের বিয়ে দিয়ে তাদের শাদিপুরে পাঠানো হত। এই সব কয়েদিরা বিয়ের পর কিভাবে ছেলেমেয়ে নিয়ে ঘর-সংসার করছে নিজের চোখে দেখে এসেছে বিনয়। দাম্পত্য-জীবনের স্নিগ্ধ, মধুর আস্বাদ এই ভয়াবহ হত্যাকারীদের আমূল বদলে দিয়েছে। তাদের দুর্ধর্ষ, হিংস্র প্রবৃত্তি ধীরে ধীরে জুড়িয়ে শান্ত হয়ে গেছে। ঘর-গৃহস্থালির মধ্যে খুব সম্ভব কোনও অলৌকিক জাদু লুকনো থাকে।
সেলুলার জেল আর শাদিপুর নিয়ে শুধু একটা নয়, সাত আট কিস্তির একটা লেখা তৈরি করতে হবে। ফোটোগ্রাফার নকুল বিশ্বাস এই দুই জায়গার প্রচুর ছবি তুলেছে। লেখাটা শেষ হলে, তার সঙ্গে ছবিগুলো পোর্টব্লেয়ারে বিশ্বজিৎ রাহার কাছে নকুলের হাত দিয়ে পাঠিয়ে দেবে বিনয়। বিশ্বজিৎ পাঠাবেন কলকাতায় ‘নতুন ভারত’-এর চিফ রিপোর্টার প্রসাদ লাহিড়ির কাছে।
আজ লেখাটা শুরু করেছে সে। এখন কত রাত কে জানে। সামনের খোলা জানলার বাইরে যতদূর চোখ যায়–উঁচু উঁচু পাহাড়, সেগুলোর গায়ে হাজার বছরের আদিম অরণ্য, খানিক দূরের সমুদ্র–সমস্ত কিছুই ঝাপসা। সন্ধের পর থেকেই কুয়াশা পড়তে শুরু করেছিল। সেই কুয়াশা ক্রমশ গাঢ় হতে হতে চারিদিক ঢেকে ফেলেছে। এটা খুব সম্ভব পূর্ণিমাপক্ষ। আকাশে হয়তো চাঁদ আছে। কিন্তু কুয়াশা ভেদ করে তার মায়াবী আলো জেফ্রি পয়েন্টে পৌঁছতে পারছে না। যেদিকেই তাকানো যাক, সব ঘোলাটে, আবছা আবছা। ঘষা ঘষা কাঁচের ভেতর দিয়ে তাকালে যেমন মনে হয় অনেকটা সেইরকম।
মানুষের সাড়াশব্দ কোথাও নেই। ডানপাশের রিফিউজিদের ব্যারাক আর তাঁবুগুলো একেবারে নিঝুম। এখানকার মনুষ্যজগৎ ঘুমের আরকে ডুবে আছে। কিন্তু বিশ্বব্রহ্মান্ড আদৌ নিঃশব্দ নয়। বাঁ দিক থেকে অবিরল সমুদ্র গর্জন ভেসে আসছে। বিনয় টের পাচ্ছে বঙ্গোপসাগরের বিশাল বিশাল ঢেউ প্রবল আক্রোশে আছড়ে পড়ছে সোনালি বালির সৈকতে। সমুদ্র থেকে ঝড়ো হাওয়া উঠে এসে জঙ্গলের মহা মহাবৃক্ষগুলিকে নাস্তানাবুদ করে চলেছে। তারই মধ্যে রাত-জাগা পাখিরা থেকে থেকে ডেকে উঠছে। জেফ্রি পয়েন্টে মধ্যরাতের এই সব ছবি এবং শব্দ তার চেনা।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।