এই প্রশ্নটা আগেও বার বার নিজেকে করেছে বিনয়। যথেষ্ট সংশয় আছে তার। তবু বাবার চিঠিটা নিয়ে লা-পোয়েদের মোটর বোটে ষাট মাইল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে মিডল আন্দামানের সেটলমেন্টে তাকে ঝিনুকের কাছে যেতে হবে। যেতেই হবে। এই প্রতিজ্ঞাটি মনে মনে কতবার সে করেছে সে।
.
৪.১২
মোহনবাঁশিকে মৃত্যুর হাঁ-মুখ থেকে বাঁচিয়ে পোর্টব্লেয়ার থেকে যেদিন বিনয়রা জেফ্রি পয়েন্টে নিয়ে এল তার পর পরই নতুন ছত্রিশটা ডি পি ফ্যামিলিও চলে এসেছে। শেখরনাথ লক্ষ করেছেন সেটলমেন্টের ক’টা ব্যারাকে আগে-আসা উদ্বাস্তুদের সঙ্গে ওদের রাখা হয়েছে। এতে নতুন-পুরনো সব উদ্বাস্তুরই যে ভীষণ অসুবিধে হচ্ছে, সেটা মুখ ফুটে না বললেও চলে। পরিতোষ বণিককে ডেকে আজ কঠিন গলায় তিনি জিগ্যেস করলেন, ‘ব্যারাকে কতজন পুরনো রিফিউজি ছিল?’
সংখ্যাটা ঠিকঠাক জানাল পরিতোষ।–-‘পাঁচশো সতরো জন। বুড়াধুড়া (বুড়োটুড়ো), পোলাপান, হগল (সকল) মিলাইয়া।‘
‘এতগুলো মানুষকে ঠাসাঠাসি করে পাঁচটা ব্যারাকে ঢুকিয়েছ। নতুন যে ছত্রিশটা ফ্যামিলি এসেছে। সবসুদ্ধ তাদের মেম্বার কত?’
‘একশ’ বাহাত্তর জন।
‘হিসেবে তো দেখছি কোনও গোলমাল নেই। ব্যারাকে যে পুরনো উদ্বাস্তুরা কষ্ট করে থাকে তাতে তাদের দম আটকে আসে। একটা ছুঁচ ফেলার যেখানে জায়গা নেই সেখানে আরও একশ’ বাহাত্তর জনকে ঢুকিয়েছ! রিফিউজিদের কী মনে কর তুমি আর তোমার কর্তারা–পোকামাকড়? অন্ধকূপ হত্যার মতো একটা কান্ড ঘটাতে চাও নাকি?’
পরিতোষ চুপ।
শেখরনাথ বলেই যাচ্ছিলেন, ‘এতগুলো মানুষ মেনল্যান্ড থেকে আসছে, এ খবরটা তোমাদের তো আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, নাকি হয় নি?’
পরিতোষ আস্তে ঘাড় কাত করেল।–’অইছে (হয়েছে)।‘
‘তা হলে তাদের থাকার জন্যে আগে থেকে কেন ব্যবস্থা করা হয়নি?’
পরিতোষের উত্তর নেই। শেখরনাথ ধমকে ধমকেই কথা বলছিলেন। এবার তার সুর আরও চড়ল।–’বিশু আর অন্য অফিসাররা তো সবই জানে। তারা তোমাদের বলে নি নতুন ফ্যামিলিগুলোর থাকার জন্যে অ্যারেঞ্জমেন্ট করে রাখতে?’
শেখরনাথ যেন একটা অতল খাদের কিনারায় তাকে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে এসেছেন। গলার ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। কোনও রকমে পরিতোষ বলল, ‘কইছিলেন। কিন্তুক—’
‘কিসের কিন্তু—’
‘মাত্র কয়দিনের মইদ্যে (মধ্যে) ব্যারাক বানান (বানানো সম্ভব আছিল না। ভাবছিলাম—’
হাত তুলে পরিতোষকে থামিয়ে দিয়ে শেখরনাথ বললেন, ‘কী ভেবেছিলে সেটা কে শুনতে চাইছে? তোমাদের ওপরওলারা উদ্বাস্তু আসার কথা জানিয়েছে। সেইমতো তাদের অ্যাকোমোডেশনের বন্দোবস্ত করে রাখবে, এটাই তো তোমার কাজ। সেইজন্যেই তো এই সেটলমেন্টের দায়িত্ব তোমাকে দেওয়া হয়েছে। এতটুকু বোধবুদ্ধি নেই? কলকারখানার যন্ত্রপাতি নিয়ে তোমাকে ডিল করতে হয় না। কতগুলো নিরাশ্রয়, ভিটেমাটি খুইয়ে-আসা মানুষকে তোমার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। তাদের জন্যে সবচেয়ে আগে যা চাই তা হল হিউম্যান কনসিডারেশন, মমতা। আর তুমি কিনা নিজের ইন-এফিসিয়েন্সির জন্যে সাফাই গাইতে শুরু করলে! আমি একেবারে অবাক হয়ে যাচ্ছি।‘
অবিরল ভর্ৎসনায় সিটিয়ে গিয়েছিল পরিতোষ। কী একটা জবাব দিতে যাচ্ছিল কিন্তু গলায় স্বর ফুটল না। ঠোঁটদুটো থরথর করে কাঁপছিল।
পরিতোষের ম্রিয়মাণ মুখের দিকে তাকিয়ে হয়তো করুণাই হয়েছে শেখরনাথের। তার কাঁধে একটা হাত রেখে এবার নরম গলায় বললেন, ‘অনেক বকাবকি করেছি। রাগ কোরো না। সবসময় মনে রেখো এই মানুষগুলো সর্বস্ব হারিয়ে ইন্ডিয়ায় এসেছে। দেশ যে স্বাধীন হয়েছে তার জন্যে সবচেয়ে বেশি দাম দিতে হয়েছে এদেরই। ওরা যাতে এখানে এতটুকু কষ্টভোগ না করে সেদিকে লক্ষ্য রাখা উচিত। একটু থেমে ফের শুরু করলেন, ‘যাক ওসব। শুনেছিলাম, এখানে তাঁবুর সরঞ্জাম রয়েছে। ঠিক?’
‘হ্যাঁ–’ আস্তে মাথা নাড়ল পরিতোষ। এতক্ষণ ভয়ে, অস্বস্তিতে কুঁকড়ে ছিল। মুখচোখ দেখে মনে হয়েছিল সেই ভাবটা কেটে গেছে।
শেখরনাথ বললেন, ‘যতদিন না নতুন ব্যারাক ট্যারাক তৈরি হচ্ছে তাঁবু খাটানোর ব্যবস্থা কর। ক’টা তাঁবুর মতো মালপত্র আছে?’
‘বিশ বাইশটা হবে মনে হচ্ছে।‘
‘ঠিক আছে। আজ থেকেই কাজ শুরু করে দাও। তাঁবুগুলো খাটানো হলে নতুন ছত্রিশটা ডি পি ফ্যমিলিকে তার ভেতর রাখা হোক। অন্তত পুরনো ডি পি ফ্যামিলিগুলোর সঙ্গে ঠাসাঠাসি করে তাদের থাকতে হবে না।‘
শেখরনাথের মতো একজন মানুষের কাছ থেকে নতুন বাড়তি একটা দায়িত্ব পেয়ে পরিতোষের হাতে-পায়ে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। প্রচন্ড রাগারাগির পরও তিনি যে তার ওপর আস্থা রেখেছেন এটাই পরিতোযের কাছে বিরাট এক পুরস্কার। বিভাস নতুন উদ্বাস্তুদের জেফ্রি পয়েন্টে পৌঁছে দিয়ে পরদিনই চলে গিয়েছিল। নইলে তাকেই হয়তো এই দায়িত্বটা দিতেন শেখরনাথ। এটা পরিতোষের পক্ষে বিরাট স্বস্তি। নিজের কর্মক্ষমতা সে প্রমাণ না করে ছাড়বে না।
বনবিভাগের কর্মীরা জেফ্রি পয়েন্টের উত্তর, পশ্চিম আর পুব দিকে ‘জাঙ্গল ফেলিং’, অর্থাৎ বিশাল বিশাল গাছ কেটে জমি বের করছিল। হাঁকডাক করে তাদের ডেকে আনল পরিতোষ; তা ছাড়া পুনর্বাসন দপ্তরের কর্মীরা তো ছিলই। এমনকি উদ্বাস্তুদেরও ডাক পড়ল। সবাই জড়ো হলে তাদের তাঁবু খাটানোর কাজে লাগিয়ে দেওয়া হল। পরিতোষ ছোটাছুটি করে, বিপুল উদ্যমে তদারক করতে লাগল। এদের সকলের ওপরে ছিলেন স্বয়ং শেখরনাথ।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।