বিনয় হতবাক। যে মেয়েটা লজ্জায় সংকোচে কান্নাকাটি করছিল, সে মুহূর্তে এতটা পালটে যাবে কে ভাবতে পেরেছে!
সবার চোখ এবার এসে পড়ল সনাতনের ওপর। সাপের মাথায় ধুলোপড়া ছিটিয়ে দিলে যেমন হয়, সেইভাবে মিইয়ে গেছে সে। ঘাড় ভেঙে তার মাথাটা যেন বুকের ওপর ঝুলে পড়েছে।
শেখরনাথ যা বোঝার বুঝে নিয়েছেন। মায়াকে জিগ্যেস করলেন, ‘তুমি সনাতনের ঘর কি করতে চাও না?
মায়ার স্পষ্ট, দ্বিধাহীন জবাব।–’না, বড়কত্তা। এই কথাহান (কথাটা) আমারে আর কইয়েন না। ভগমানের দয়ায় একবার অর (ওর) হাত থিকা নিষ্কিতি (নিষ্কৃতি) পাইছি। ফির (ফের) যদিন অর (ওর) ঘর করতে অয়, আমি গলায় দড়ি দিমু।‘
‘তুমি বৃন্দাবনের সঙ্গেই থাকতে চাও?’
নতচোখে মায়া বলল, ‘হ—’
শেখরনাথ লা-ডিনদের বললেন, ‘তোমরা সনাতনকে একটা ঘরে নিয়ে আটকে রাখ। ওর ব্যাপারে কী করা দরকার, দুপুরে ভেবে ঠিক করব।’
.
দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর যে ঘরটায় বিনয়দের সাময়িক থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে সেখানে পরিতোষ বণিক এবং জেফ্রি পয়েন্ট সেটেলমেন্টের আরও দু’চারজন বাঙালি অফিসারকে ডাকিয়ে আনালেন শেখরনাথ। বিনয়ও সেখানে আছে কিন্তু সে সাংবাদিক, শুধুই শ্রোতা এবং দর্শক মাত্র।
শেখরনাথ বললেন, ‘সকালের ওই বিশ্রী ঘটনাটার পর আমি অনেক ভেবেছি। সনাতনকে এখানে রাখা ঠিক হবে না। বৃন্দাবন আর মায়ার ওপর ওর যা আক্রোশ, যে কোনও সময় খুনোখুনি কাণ্ড ঘটে যেতে পারে।‘
পরিতোষ বলল, ‘আপনে ঠিকই কইছেন কাকা। সারাক্ষণ তো সনাতনরে চৌখে চৌখে রাখন যাইব । হে (সে) ছাড়া মায়া তো পষ্ট কইয়াই দিছে হ্যায় (সে) সনাতনের ঘর করব না। অরে (ওকে) এহান (এখান) থিকা বিদায় করনই ভালা।‘
বাকি অফিসাররা তার কথায় সায় দিল।
শেখরনাথ বললেন, ‘আমি আর বিনয় যে গাড়িটায় মোহনবাঁশিদের নিয়ে এখানে এসেছি, সেটা এখনও রয়ে গেছে। বিশুকে (বিশ্বজিৎ রাহা) একটা চিঠি লিখে দেব। সে যেন সনাতনকে মিডল আন্দামানের সেটলমেন্টে রিহ্যাবিলিটেশনের বন্দোবস্ত করে দেয়। কাল সকালেই লা-ডিন আর ধনপত ওই গাড়িতে সনাতনকে পাহারা দিয়ে পোর্টব্লেয়ারে বিশুর কাছে পৌঁছে দিয়ে আসুক।‘
পরিতোষরা বলল, ‘এইর থিকা কারেক্ট ডিসিশান আর অয় না।’
.
দিন সাতেক হল সনাতনকে পোর্টব্লেয়ারে পাঠানো হয়েছে। উদ্বাস্তুদের দৈনন্দিন জীবন পুরনো ছকেই চলছে। সকালে উঠে চা-রুটি টুটি খেয়ে নিজের নিজের জমিতে গিয়ে বনতুলসীর ঝাড় কাটা, আগাছা এবং ছোট ছোট গাছগুলির শিকড় মাটি থেকে উপড়ে ফেলা, দুপুরে এসে চানটান করে খাওয়া দাওয়া চুকিয়ে কিছুক্ষণ জিরিয়ে আবার জমিতে নামা। পনেরো বিঘে করে জমি সাফ করা তো মুখের কথা নয়। সন্ধে অবধি কাজ করে ফিরে আসে তারা। কিছুক্ষণ গল্পসল্প, তারপর খেয়ে দেয়ে কোনওদিন একটু আধটু গানবাজনা, নইলে সটান বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়া। ( ঠিক সপ্তাহখানেক বাদে একটু বেলার দিকে টেবিলে বসে ‘নতুন ভারত’-এর জন্য একটা প্রতিবেদন লিখছিল বিনয়। শেখরনাথ ঘরে নেই। উদ্বাস্তুদের সঙ্গে খুব সম্ভব দূরের কোনও জমিতে গেছেন। পুনর্বাসন দফতরের কর্মীদেরও সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকটা একেবারে নিঝুম।
হঠাৎ ভটভট আওয়াজে চমকে উঠল বিনয়। কাছেই সমুদ্র। জানলা দিয়ে বাঁ দিকে তাকাতেই চোখে পড়ল লা-পোয়েদের সেই ধবধবে মোটর বোট, যার নাম ‘সি-বার্ড’, ঢেউ কেটে কেটে এগিয়ে এসে পাড়ের কাছে নোঙর ফেলল। বিনয়ের বুকের ভেতর.শিহরন খেলে যায়। শেল কালেক্টরদের এই বোটটা আসবে, সেজন্য যেন হাজার-হাজার বছর অপেক্ষা করে আছে বিনয়।
মোটর বোটটা থেকে নেমে সেটলমেন্টের দিকে এগিয়ে এল লা-পোয়ে। বিনয় কাগজ-কলম রেখে জানলার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। লা-পোয়ে কাছাকাছি আসতেই সে তাকে ডাকল, ‘আসুন, আসুন—’
লা-পোয়ে কপালে হাত ঠেকিয়ে বলল, ‘নমস্তে’–তারপর ঘরের ভেতর ঢুকল। হেসে হেসে বলতে লাগল, দেখুন, আমি যা ওয়াদা করেছিলাম, সেটা রেখেছি। ঠিক চলে এলাম। চাচাজিকে (শেখরনাথকে) তো দেখছি না।‘
‘উনি উদ্বাস্তুদের সঙ্গে বোধহয় জমিতে গেছেন। তা আপনারা কবে মিডল আন্দামানে যাবেন?’
‘এখানে আট দশ রোজ সিপি (শঙ্খ কড়ি উড়ি) তুলব। তারপর যাব। আপনি আমাদের সঙ্গে যাচ্ছেন তো?
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। সেদিন পোর্টব্লেয়ারে কী বললাম আপনাকে–ভুলে গেছেন?’
‘নেহি, নেহি। ভুলে গেলে কি জেফ্রি পয়েন্টে আসতাম? আপনি তৈয়ার থাকবেন।‘
‘আমি তৈরিই আছি। যেদিন বলবেন সেদিনই আপনাদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ব।‘
‘ঠিক হ্যায়। আমি এখন উঠি। চাচাজির সাথ একবার মুলাকাত করে সিপি তুলতে যাব।‘ লা-পোয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে ডানদিকে শেখরনাথের সন্ধানে চলে গেল।
কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল বিনয়। অবনীমোহনের সেই চিঠি দু’টোর কথা মনে পড়ে গেল তার। কাশীর আশ্রমে শেষ শয্যায় শুয়ে অনুতপ্ত, গ্লানিবোধে জর্জরিত বাবা ব্যাকুলভাবে লিখেছেন, ঝিনুককে খুঁজে বের করে বিনয় যেন তাঁর কাছে নিয়ে যায়। মৃত্যুর আগে তিনি তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেবেন।
কিন্তু চিরদুঃখী ঝিনুক, অভিমানে অসম্মানে একদিন নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিল। তাকে কি অবনীমোহনের কাছে কাশীতে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে? সে কি আদৌ যেতে রাজি হবে?

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।