এদিকে পুনর্বাসনের দু’জন কর্মী কোত্থেকে দুটো চেয়ার নিয়ে এসেছিল শেখরনাথ আর বিনয়ের জন্য। তারা বসে পড়লেন।
সনাতন লা-ডিনদের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে বৃন্দাবনের ওপর ফের চড়াও হওয়ার জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করছিল।–’আমারে ছাইড়া দ্যান, ছাইড়া দ্যান—’
শেখরনাথ বললেন, ‘ছেড়ো না। ধরে রাখো—’ সনাতনকে জিগ্যেস করলেন, কেন তুমি বৃন্দাবনের গলা টিপে ধরেছিলে?
সনাতন গলা থেকে বিষ উগরে দিল।–’উই খানকির পুত আমার বউরে ভাগাইয়া লইয়া আন্ধারমানে (আন্দামানে) পলাইয়া আইছে। ওই যে মাগি মুহে (মুখে) কাপড় গুইজা কানতে (কাঁদতে) আছে ও আমার বউ। মাগি বেবুশ্যার থিকাও খারাপ কত্তা।‘
শেখরনাথ হকচকিয়ে গিয়েছিলেন। বিনয় এবং অন্য সবাই হতভম্ব। এমন একটা সুন্দরী মেয়ে সনাতনের মতো গাল-ভাঙা, খাড়া খাড়া চুল, আধাবয়সি সনাতনের স্ত্রী হতে পারে, এটা ভাবাই যায় না।
শেখরনাথ তার গাম্ভীর্য বজায় রেখে সনাতনকে বললেন, ‘মুখ থেকে আর একটা নোংরা কথাও বের করবে না। যদি না শোন, লা-ডিনরা তোমার ছালচামড়া তুলে ফেলবে।‘
এবার ডুকরে কেঁদে উঠল সনাতন। –’কত্তা, সাধে কি আর মুহ (মুখ) থিকা গালি বাইর অয় (বেরোয়)? আমার কী সব্বনাশটা ওই শয়তানে করছে, একবার ভাইবা (ভেবে) দ্যাহেন (দেখেন)?’
শেখরনাথের দৃষ্টি এবার বৃন্দাবনের ওপর গিয়ে পড়ল।–’সনাতন যা বলছে তা কি ঠিক?’
সনাতনের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে বৃন্দাবন উঠে বসেছিল। জোরে জোরে বেশ কিছুক্ষণ শ্বাস টেনে স্বাভাবিক হয়ে উঠতে শুরু করেছে। সে অপরাধীর মতো মুখ নামিয়ে রইল।
শেখরনাথ তীক্ষ্ণ চোখে তাকে লক্ষ করছিলেন। মায়াকে দেখিয়ে ফের জিগ্যেস করলেন, এই মেয়েটি কি সত্যিই তোমার বিয়ে-করা বউ?
বৃন্দাবনের মাথা আরও নুয়ে পড়ল। মায়া একনাগাড়ে কেঁদেই যাচ্ছিল। আর কান্নার তোড় হঠাৎ কয়েক গুণ বেড়ে গেল।
শেখরনাথ কড়া গলায় বৃন্দাবনকে বললেন, ‘চুপ করে থাকলে চলবে না। যা বললাম তার উত্তর দাও। আসল ব্যাপারটা কী, আমাকে জানাও।‘
সনাতন জ্বলন্ত চোখে বৃন্দাবনের দিকে তাকিয়ে আছে। সে বলল, ‘অর (ওর) কইলজায় (কলিজায়) কি সাচা (সত্যি) কথা কওনের (বলার) সাহস আছে? আমিই আপনেরে কই (বলি) কত্তা—’
কী ভেবে শেখরনাথ বললেন, ‘আচ্ছা, বল—’
সনাতন শুরু করল। তাদের আদি বাড়ি ছিল ফরিদপুরে। দেশভাগের পর পাকিস্তানে থাকা গেল না। সংসারে তার স্ত্রী মায়া এবং সে ছাড়া অন্য কেউ নেই। লক্ষ লক্ষ ছিন্নমূল মানুষের সঙ্গে তারাও কলকাতায় চলে আসে। ফরিদপুরে নিজেদের গ্রাম এবং আশপাশের কয়েকটা এলাকা ছাড়া জন্মের পর থেকে দূরে আর কোথাও যায়নি সনাতন। কলকাতার মতো বিশাল শহরে এসে একেবারে দিশাহারা হয়ে পড়েছিল।
শিয়ালদা স্টেশনের প্ল্যাটফর্মগুলোতে, এবং সামনের বিরাট চত্বরে সাত-আট হাত লম্বা এবং ছ’সাত হাত চওড়া চৌকো জায়গার চারপাশে ইট বসিয়ে সীমানা তৈরি করে কয়েক শ’ উদ্বাস্তু ফ্যামিলি থাকে, সরকারি-বেসরকারি লঙ্গরখানায় গিয়ে খায়।
সনাতন তার বউ মায়াকে নিয়ে এইরকম একটা ছোট জায়গায় কোনওরকমে ঘাড় গুঁজে থাকত। তাদের ঠিক পাশের খোপটায় ছিল বৃন্দাবনরা। সে থাকত তার খুড়াখুড়ি (কাকা-কাকিমা) আর দুই খুড়তুতো ভাইবোনের সঙ্গে। তার বাপ-মা রায়টে মারা গেছে। ওদের বাড়ি ঢাকা ডিস্ট্রিক্টে।
বছরখানেক শিয়ালদায় কাটানোর পর বৃন্দাবনের খুড়াখুড়িরা যাদবপুর-নাকতলার কাছে জবরদখল কলোনিতে খানিকটা জমি জোগাড় করে চলে যায়। কিন্তু বৃন্দাবন শিয়ালদা স্টেশনের মাটি কামড়ে পড়ে রইল। সে কিছুতেই জবরদখল কলোনিতে যাবে না। তখন কি সনাতন জানত তলায় তলায় মায়ার সঙ্গে বৃন্দাবনের পিরিত শুরু হয়েছে। এদিকে সরকারি কর্তারা আন্দামানে পাঠানোর জন্য রোজ শিয়ালদা স্টেশনে এসে ছিন্নমূল মানুষগুলোকে সমানে বোঝাচ্ছে। একদিন সনাতনের চোখে ধুলো ছিটিয়ে মায়াকে নিয়ে উধাও হয়ে যায় বৃন্দাবন। সনাতন উন্মাদের মতো মায়ার অনেক খোঁজ করেছে। কিন্তু তার হদিশ পায়নি। শেষ পর্যন্ত সেও আন্দামানে পুনর্বাসনের জন্য চলে এসেছে। যা কখনও ভাবতে পারেনি, জেফ্রি পয়েন্টে এসে তারই সন্ধান পেল।
সনাতন বলতে লাগল, ‘কাইল (কাল) সন্ধ্যায় আমরা এহানে (এখানে) আইছি। আইজ (আজ) সকালে ঘুম থিকা উইঠা চা-চু (চা এবং খাবার) খাইয়া ভাবলাম নয়া জাগাহান (জায়গাটা) কেমুন, এটু ঘুইরা দেহি (দেখি)। ঘুরতে ঘুরতে দ্যাখলাম উই দুই হালা হালি (শালা-শালী) খ্যাতে (জমিতে) কাম করতে আছে। মাথায় য্যান (যেন) আগুন ধইরা গেল। বিন্দাবনের উপুর ঝাপাইয়া পইড়া গলার নলি জাইতা (টিপে) ধরলাম। কথা শেষ করে হাঁপাতে লাগল সনাতন। একটু পর আবার বলল, ‘হগল (সকল) খুইলা কইলাম। অহন (এখন) বিচার করেন কত্তা।‘
শেখরনাথ সোজাসুজি মায়ার দিকে তাকালেন।’সনাতন এতক্ষণ যা বলল তা কি ঠিক?
যে মেয়েটা ভয়ে লজ্জায় আতঙ্কে কুঁকড়ে ছিল, সমানে কাঁদছিল, আচমকা সে সটান দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল, ‘হ, ঠিকই কইছে।‘ তারপর সনাতনের দিকে আঙুল বাড়িয়ে দিল।–’অরে কয়ডা কথা জিগান (জিগ্যেস করুন) বড় কত্তা। দ্যাশে (দেশে) থাকতে নিশাভাং (নেশাভাং কইরা আমারে রোজ পিটাইত না? সোক্সার (সংসার) খরচের টাকাপয়সা দিত না। কতদিন না খাইয়া উপাস দিয়া যে থাকছি! তভু অরে (ওকে) ছাইড়া যাই নাই। কিন্তুক কইলকাতায় আইয়া যহন (যখন) বুঝলাম মাইয়ামাইনষের দালালগো কাছে আমারে বেইচা (বেচে) দেওনের (দেওয়ার) মতলব করছে করছে তহন (তখন) বিন্দাবনের লগে পলাইয়া আন্ধারমানে চইলা আইছি। নাইলে (না হলে) এতদিনে আমি বাজাইরা মাইয়ামানুষ (বেশ্যা) অইয়া (হয়ে) যাইতাম। বিন্দাবন আমারে বাঁচাইয়া দিছে। অহন আইছে সোয়ামিগিরি ফলাইতে। জিগান, অরে (ওকে), যা কইলাম সাচা না মিছা?’

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।