সমুদ্রগর্জন আর নাম না-জানা রাত-জাগা পাখিদের হঠাৎ হঠাৎ ডেকে ওঠা ছাড়া কোথাও কোনও শব্দ নেই, ঘরের নিবন্ত হ্যারিকেনটা ছাড়া কোথাও কোনও আলোও নেই।
পৃথিবীর এই সৃষ্টিছাড়া ভূখণ্ডটি ঘুমের আরকে ডুবে আছে। শুধু ঘুম নেই বিনয়ের। আগে ততটা খেয়াল করেনি, কিন্তু খেয়ে দেয়ে বিছানায় শরীর এলিয়ে দেওয়ার পর থেকে গা ম্যাজম্যাজ করতে শুরু করেছে। মাথা ভার। জ্বর আসবে কিনা, কে জানে।
জানলার বাইরে তাকিয়ে ছিল বিনয়। যতদূর চোখ যায়, কুয়াশা অন্ধকার। আজ কী তিথি, জানা নেই। খুব সম্ভব আকাশে চাঁদ আছে, কুয়াশা-টুয়াশা ভেদ করে তার ঘোলাটে আলো এসে পড়েছে লক্ষ লক্ষ মাইল নিচের এই পৃথিবীতে। ( এলোমেলো, অর্থহীন নানা ভাবনা হালকা মেঘের মতো ভেসে বেড়াচ্ছিল বিনয়ের মাথায়। আচমকা সে সব ঠেলে সরিয়ে ঝিনুকের চিন্তাটা ঢুকে গেল।
মনে পড়ল লা-পোয়ে সেদিন পোর্টব্লেয়ারে বলেছিল, খুব শিগগিরই তারা জেফ্রি পয়েন্টে চলে আসবে। এখানে কয়েকটা দিন কাটিয়ে তাদের বোটে বিনয়কে তুলে মিডল আন্দামানে নিয়ে যাবে। এমনকি তারা ভরসা দিয়েছে, সেখানকার রিফিউজি কলোনিগুলোতে বিনয়কে শুধু পৌঁছে দেবে না, আবার জেফ্রি পয়েন্টে ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু কবে আসবে লা-পোয়েরা?
ভাবতে ভাবতে মাঝরাতে পার করে একসময় চোখ বুজে এল বিনয়ের।
.
খুব ভোরে ওঠা চিরকালের অভ্যাস বিনয়ের। দেশে থাকতে দাদু হেমনাথ মিত্র তাঁকে সুর্যোদয়ের আগেই জাগিয়ে দিতেন। সেটাই পরে অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায়। কিন্তু আজ কতক্ষণ ঘুমিয়েছিল খেয়াল নেই, হঠাৎ আবছাভাবে বাইরে কোথাও হইচই চেঁচামেচির আওয়াজে ঘুমটা ভেঙে গেল। চোখে পড়ল অনেক বেলা হয়ে গেছে। কুয়াশা-টুয়াশা উধাও, তপ্ত রোদে ভরে গেছে চারিদিক।
ঘুম ভাঙলেও তার রেশটা এখনও পুরোপুরি কাটেনি, আওয়াজটা কোত্থেকে আসছে, প্রথমটা বুঝতে পারল না। কিছুক্ষণ পরেই টের পেল, জঙ্গল কেটে যেখানে উদ্বাস্তুদের জমি দেওয়া হয়েছে সেখানে বহু লোক একসঙ্গে তুমুল শোরগোল বাধিয়েছে। কী হতে পারে?
খাট থেকে নামতে গিয়ে বিনয় লক্ষ করল ওধারের খাটটা ফাঁকা। সে টের পায়নি শেখরনাথ কখন বেরিয়ে গেছেন।
বিনয় ঘরের বাইরে এসে লম্বা লম্বা পায়ে উত্তর দিকে যেতে যেতে দেখতে পেল কলোনির প্রায় সবাই সেখানে জড়ো হয়ে উত্তেজিতভাবে একটানা চেঁচিয়ে চলেছে। নিশ্চয়ই কোনও অঘটন ঘটেছে। বিনয় চলার গতি বাড়িয়ে দিল। তার পেছন পেছন পরিতোষ, আমিন লা-ডিন, চেনম্যান ধনপত এবং রিহ্যাবিলিটেশন ডিপার্টমেন্টের আরও কয়েকজন ছুটতে ছুটতে আসতে লাগল।
বিনয় লক্ষ করল আরও উত্তরে পেরিমিটার রোডের দিক থেকে হাঁটু অবধি ধুতি তুলে হনহন করে হেঁটে আসছেন শেখরনাথ। খুব সম্ভব সকালে উঠে জঙ্গল কেটে জারোয়ারদের সীমানা আজ আরও কতটা ছোট করা হচ্ছে সেটা দেখতে গিয়েছিলেন। জারোয়ারদের ব্যাপারটা মাথা থেকে কিছুতেই বের করে দিতে পারছেন না। শোরগোল শুনে সচকিত শেখরনাথ এখন উধ্বশ্বাসে পা চালাচ্ছেন।
শেখরনাথ, বিনয় এবং পুনর্বাসনের কর্মীরা প্রায় একই সঙ্গে পৌঁছে গেল। রিফিউজিরা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে বৃত্তের ভেতর কিছু একটা লক্ষ করতে করতে সমানে চেঁচিয়ে যাচ্ছে। শেখরনাথদের দেখে তারা সরে সরে পথ করে দিল। দৃশ্যটা এইরকম।
সেই পাকানো, ক্ষয়াটে চেহারার সনাতন দাস একটা লম্বা-চওড়া জোয়ান ছেলেকে চিত করে ফেলে তার বুকের ওপর চেপে বসে সাঁড়াশির মতো দুই হাতে গলা টিপে ধরেছে। প্রচণ্ড আক্রোশে সনাতনের মুখটা গনগন করছে, গর্তে-বসা চোখ থেকে আগুন ঠিকরোচ্ছে। মনে হয় সনাতনের ওপর কোনও দানব ভর করেছে।
যুবকটিকে বিনয় চেনে। কিছুদিন আগে তার সঙ্গে এই জেফ্রি পয়েন্টেই পরিচয় হয়েছিল। নাম বৃন্দাবন বসাক। তার বয়স কম, তরতাজা চেহারা। ইচ্ছা করলে সনাতনকে সে আছাড় মেরে হাড়গোড় চুরমার করে দিতে পারে। কিন্তু বৃন্দাবনের সেরকম কোনও ইচ্ছাই যেন নেই। তার চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, তবু সনাতনকে ঠেলে সরিয়ে দিচ্ছে না। ওদের পাশে বৃন্দাবনের ভারী সুন্দর বউটি, যার নাম মায়া, মুখে কাপড় গুঁজে অঝোরে কেঁদে চলেছে।
কয়েকজন উদ্বাস্তু সনাতনের হাত ধরে টানাটানি করে ছাড়াবার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। সনাতন শুধু গলা টিপেই ধরে নেই, একটানা কুৎসিত গালাগালিও দিয়ে যাচ্ছে।’শুয়োরের ছাও, তরে (তোকে) আমি যমের বাড়ি না পাঠাইয়া ছাড়ুম না। তর কইলজা (কলিজা) ফাইড়া রক্ত খামু।
সনাতন তো সবে কাল জেফ্রি পয়েন্টে এসেছে। বৃন্দাবনরা এসেছে অনেক আগে। তার ওপর সনাতনের এত ক্রোধ, এত আক্রোশ কেন? মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছিল না বিনয়। বিমূঢ়ের মতো সে তাকিয়ে আছে।
শেখরনাথ হাত তুলে উদ্বাস্তুদের হল্লা থামিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় সনাতনকে ধমকে উঠলেন, ‘এই, ওকে ছেড়ে দাও, ছাড় বলছি—’
সনাতন ছাড়ল না। শেখরনাথের ধমকানি তার কানে ঢুকেছে বলে মনে হল না।
শেখরনাথ এবার লা-ডিন আর ধনপতকে বললেন, ‘তোমরা ওদের ছাড়িয়ে দাও
লা-ডিন এবং ধনপত, দু’জনেরই ছ’ফিটের ওপর হাইট, চল্লিশ ইঞ্চির মতো বুকের ছাতি, শরীরে অসীম শক্তি। তারা সনাতনকে দুই হাত ধরে এক হ্যাঁচকা টানে বৃন্দাবনের বুকের ওপর থেকে তুলে আনল।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।