করুণ ব্যথিত দৃষ্টিতে উত্তর দিকটা দেখতে দেখতে শেখরনাথ বললেন, ‘জারোয়ারা আরও হিংস্র, আরও মরিয়া হয়ে উঠবে।’ হতাশায় মাথা নাড়তে লাগলেন, ‘না, কিছুই করা গেল না। চল, ফেরা যাক।’
.
৪.১১
নতুন ছত্রিশটা উদ্বাস্তু পরিবার আসার পর পুরনো উদ্বাস্তুরা জমির কাজ বন্ধ করে দিয়েছিল। ব্যারাকগুলোর সামনে এসে তারা নতুন ফ্যামিলিগুলোর লোকজনকে ঘিরে ধরল। তাদের অনন্ত কৌতূহল। আজ যারা এসেছে তারা প্রতিবেশী হবে। এখানে পরিবার পিছু পাঁচ একর করে জমি পেয়ে নতুন করে ঘর-সংসার গুছিয়ে বসবে। জেফ্রি পয়েন্টেরই স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যাবে।
পুরনোদের অনেকেই নতুনদের জিগ্যেস করছিল।
‘কতদিন অইল বডারের এইধারে আইছ?’
‘দ্যাশ আছিল কুনহানে (কুথায়)? কুন জিলায়?’
‘কলকাতায় আইয়া (এসে) কই (কোথায়) আছিলা?’
এই ধরনের হাজারটা প্রশ্ন।
দেখতে দেখতে সন্ধে নেমে গেল। পুনর্বাসনের কর্মীরা বড় বড় লণ্ঠন, গ্যাসবাতি আর বেশ ক’টা হ্যাঁজাক জ্বেলে দিয়েছে। ব্যারাকগুলোর পাশের অ্যাসবেস্টসের ছাউনির তলায় রান্না করার তোড়জোর চলছে পূর্ণোদ্যমে। সাতটা মস্ত মস্ত উনুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিন চারজন ক্ষিপ্র হাতে গোছা গোছা রুটি সেঁকছে। দু’জন প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড কড়াইতে ডাল তরকারি বসিয়ে হাতা দিয়ে নাড়ছে। ইউরোপ-আমেরিকা যে চ্যারিটেবল অর্গানাইজেশনগুলো বাক্স বাক্স গুড়ো দুধ পাঠায়, দু’জন ঢাউস ঢাউস সিলভারের পাত্রে সেগুলো গুলে জ্বাল দিচ্ছে। ভোজ্য বস্তুগুলো তৈরি হয়ে গেলেই উদ্বাস্তুদের, বিশেষ করে আজ যারা এসেছে, তাদের খেতে বসিয়ে দেওয়া হবে। কেননা সেই কোন ভোরবেলায় এবারডিন মার্কেটের ট্রানজিট সেন্টার থেকে পাহাড় জঙ্গল ভেদ করে তাদের আনা হয়েছে। সকালে হয়তো কিছু খেয়ে এসেছে, তারপর এই সন্ধে অবধি পেটে কিছুই পড়ে নি। খিদেয় বুড়োধুড়ো বাচ্চাকাচ্চা ছাড়াও বাকি সবাই বেজায় কাহিল হয়ে পড়েছে।
বিভাস আর নিরঞ্জন পোর্টব্লেয়ারে নতুন উদ্বাস্তুদের নিয়ে এসেছিল। তাদের সঙ্গে বিভাস জেফ্রি পয়েন্টে এসেছে। গলার স্বর উঁচুতে তুলে সে হাত নাড়তে নাড়তে বলল, ‘পাহাড়ের উচানিচা (উঁচুনিচু) পথ ভাইঙ্গা অ্যাতখানি দূরে অরা আইছে (এসেছে) ওগো (ওদের) শরীলের উপুর দিয়া মেলা (অনেক) তাফাল (ধকল) গ্যাছে। আইজ (আজ) ছাইড়া দাও; অরা খাইয়া দাইয়া ঘুমাউক (ঘুমোক)। কাইল (কাল) যত ইচ্ছা কথা কইও।
পায়ে পায়ে বিনয়ও উদ্বাস্তুদের কাছে চলে এসেছিল। হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে শীর্ণ, পাকানো চেহারার সেই লোকটাকে অর্থাৎ সনাতন দাসকে দেখতে পেল। পরশু তাকে ‘রস’ আইল্যান্ডে দেখেছিল সে। নব্বইটা পরিবারের মধ্যে তাকে আলাদা করে মনে রাখার কথা নয়। তবু বিনয়ের যে মনে আছে তার কারণ সনাতনের অদ্ভুত রোগা শীর্ণ চেহারার জন্য। তা ছাড়া, এই দ্বীপে যারাই পুনর্বাসনের জন্য এসেছে তাদের সকলেরই বউছেলেমেয়ে বা বুড়ো বাপ-মা, ভাইটাই আছে। কিন্তু বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে সানতনের কেউ নেই। স্বজন-পরিজনহীন সনাতনের নিজেকে নিয়েই একটা ফ্যামিলি।
পরিতোষ বণিক, ধনপত এবং পুনর্বাসন ডিপার্টমেন্টের অন্য কর্মীরাও চলে এসেছিল। বিভাসের মতোই তারাও, বিশেষ করে পরিতোষ পুরনো রিফিউজিদের চলে যেতে বলে নতুনদের নিয়ে লম্বা ব্যারাকগুলোর দিকে এগিয়ে গেল। একটা ব্যারাকও ফাঁকা নেই। নতুন ছত্রিশটা পরিবারকে পুরনো উদ্বাস্তুতে বোঝাই ব্যারাকগুলোতেই থাকার ব্যবস্থা করে দিল। ব্যারাকটার পাশে আগে থেকে বিরাট বিরাট ড্রামে জল ভরে রাখা ছিল। প্রচুর আলোরও ব্যবস্থা করা আছে।
পরিতোষ নতুন উদ্বাস্তুদের বলল, ‘তোমরা হাত-মুখ ধুইয়া লও। রান্ধন অইয়া (হয়ে) আইছে। আধা ঘণ্টার মইদ্যে খাওনেরটা (খাবার) দেওয়া অইব (হবে)।‘
.
জেফ্রি পয়েন্টে উদ্বাস্তুদের ব্যারাকগুলো থেকে খানিকটা দূরে পাশাপাশি আলাদা দুটো সাজানো-গোছানো ঘর আছে। পোর্টব্লেয়ার থেকে বিশ্বজিৎ রাহা বা পুনর্বাসন বিভাগের বড় অফিসাররা জেফ্রি পয়েন্টে এসে এখানেই থাকেন। আপাতত কিছুদিন শেখরনাথ এবং বিনয়কে একটা ঘর দেওয়া হয়েছে। অন্য ঘরটা দেওয়া হল ফোটোগ্রাফার নকুল বিশ্বাসকে।
রাত্তিরে খাওয়াদাওয়ার পর জেফ্রি পয়েন্টের বাসিন্দারা শুয়ে পড়েছিল। ব্যারাকগুলো নিস্তব্ধ, সারাদিন খাটাখাটুনির পর খাওয়া চুকে গেলেই পুরনো রিফিউজিরা আর এক লহমাও জেগে থাকতে পারে না। বিছানায় গা ঢেলে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখ বুজে আসে। নতুন যারা এসেছে, তাদের ব্যারাক তো বটেই, পুনর্বাসন ডিপার্টমেন্টের কর্মীরা যে ব্যারাকটায় থাকে সেখান থেকেও এতটুকু সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। পুরো কলোনিটাই ঘুমিয়ে পড়েছে।
বিনয় আর শেখরনাথও তাদের ঘরে শুয়ে পড়েছেন। খানিকটা ফাঁকা জায়গা রেখে উলটোদিকের দেওয়ালের পাশে শেখরনাথের খাট। মোহনবাঁশিকে পোর্টব্লেয়ারের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগে এই ঘরে দু’জনে কয়েক দিন কাটিয়ে গেছে। রাত্তিরে কাছাকাছি শুয়ে আন্দামানের সেলুলার জেলের, দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের কত অজানা কাহিনি শোনাতেন শেখরনাথ। সে সবই রোমাঞ্চকর, শিহরন-জাগানো।
আজ কিন্তু ব্রিটিশ আমলের প্রাচীন বিপ্লবীটি একেবারে চুপচাপ। ঘরের কোণে একটা নিবু নিবু। হ্যারিকেন জ্বলছে। সেই নিস্তেজ আলোয় দেখা গেল তার চোখ দুটো বোজা। অল্প অল্প নাক ডাকছে। ক’দিন পোর্টব্লেয়ারে প্রচণ্ড দৌড়ঝাঁপ গেছে, তারপর এতদূরের কলোনিতে আসা। হাজার হোক বয়স তো হয়েছে। যতই মনের জোর থাক, এত ধকল সামলাতে তাঁর মতো বয়স্ক লোকের পক্ষে সমস্যাই। শোওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এমন টগবগে মানুষটিও ঘুমিয়ে পড়েছেন।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।