এলাকাটার দুপাশে উঁচু উঁচু পাহাড়, সেই সব পাহাড়ের গায়ে এবং মাথায় প্রাচীন সব বনস্পতি–প্যাডক, দিদু, চুগলুম ইত্যাদি, সেগুলোকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে মোটা মোটা বুনো বেত এবং নাম-না-জানা আরও কত রকমের লতা।
পাহাড়গুলোর মাঝখানে বিশাল সমতল এলাকা একসময় দুর্ভেদ্য জঙ্গলে ঢাকা ছিল। কিছুদিন আগে উদ্বাস্তুদের সঙ্গে বিনয় যখন প্রথম আসে সেই জঙ্গলের অনেকটাই সরকার থেকে সাফ করে দেওয়া হয়েছিল পুনর্বাসনের জন্য। সরকারি কর্মীরা বিরাট বিরাট গাছগুলো কেটে দিয়েছে এবং এখনও পুরোদমে জঙ্গল ‘ফেলিং’ চলছে। বড় গাছগুলো কাটার পর জরিপওলারা চেনম্যানদের দিয়ে উদ্বাস্তু পরিবার পিছু পাঁচ একর অর্থাৎ পনেরো বিঘে করে জমি মেপে বাঁশের খুঁটি পুঁতে পুঁতে সীমানা ঠিক করে দিয়েছিল। সরকারি জঙ্গল কাটাইয়ের দল শুধু বড় গাছই কেটেছে, কিন্তু উদ্বাস্তুরা যে জমি পেয়েছে। সেখানকার ছোট, মাঝারি গাছ এবং ঝোঁপঝাড় কাটতে হবে তাদেরই।
এখন, এই পড়ন্ত বেলায় পুরনো উদ্বাস্তুরা যথারীতি জমিতে ঝোঁপজঙ্গল কাটছিল। সমস্ত এলাকা জুড়ে তুমুল ব্যস্ততা।
হঠাৎ ট্রাক থেকে শেখরনাথদের সঙ্গে মোহনবাঁশিদের নামতে দেখে উদ্বাস্তুরা দা কুড়ুল ফেলে শোরগোল করতে করতে ছুটে এল। এই সেটলমেন্টের সি. এ অর্থাৎ কলোনাইজেশন অ্যাসিস্ট্যান্ট পরিতোেষ বণিক, চেনম্যান ধনপত, পুনর্বাসন দফতরের বাঙালি এবং বর্মী কর্মীরা চলে এসেছে।
সুস্থ মোহনবাঁশিকে দেখে উদ্বাস্তুরা যেমন খুশি তেমনি উত্তেজিত। ফুসফুসে জারোয়াদের তির-বেঁধা যে মোনহবাঁশিকে কয়েকদিন আগে শেখরনাথ আর বিনয় পোর্টব্লেয়ারের হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল সে যে কোনও দিন জীবন্ত অবস্থায় ফিরে আসবে, কেউ ভাবতে পারেনি। সবাই একসঙ্গে কথা বলছিল।
একজন বলল, ‘মোহনবাশি ভাই, যমের মুখ থিকা তুমি ফিরা আইলা। কী আনন্দ যে অইতে (হইতে) আছে, কইয়া বুঝাইতে পারুম না।‘
আরেকজন বলল, ‘তুমার লক্ষ বচ্ছর পরমায়ু হউক।‘
এইরকম চলছেই।
মোহনবাঁশি শেখরনাথকে দেখিয়ে বলল, ‘বাইচা (বেঁচে) যে গেছি, এই বড়কত্তার লেইগা। উনি মানুষ না, ভগমান।‘ জেফ্রি পয়েন্টের উদ্বাস্তুরা শেখরনাথকে কেউ বড়কর্তা বলে, কেউ বলে কাকা।
কে একজন বলল, ‘আইজ আর কাম কাইজ (কাজকর্ম করুম না। মোহনবাঁশি ভাইয়েরে কাছে পুট বিলাসে (পোর্টব্লেয়ারে) লইয়া যাওনের পর কী কী অইল (হল), ডাক্তারবাবুরা কেমনে হ্যাঁরে (তাকে) বাঁচাইল, বেবাক বিত্তান্ত হুনুম (শুনব)।‘
পরিতোষ বণিক শেখরনাথের পাশে দাঁড়িয়েছিল, নিচু গলায় জিগ্যেস করল, ‘আপনেরা তো হেই (সেই) ভুরে (ভোরে) বাইর অইয়া (হয়ে) আইছেন। দুফারে (দুপুরে) খাওন অয় (হয়) নাই।‘
শেখরনাথ উত্তর দিকে তাকিয়ে ছিলেন। অন্যমনস্কর মতো বললেন, ‘পাহাড় আর জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এসেছি। ভাত কোথায় পাব? তোমাদের হাঁড়িতে আমাদের ক’জনের মতো কিছু আছে কি?’
আস্তে মাথা নাড়াল পরিতোষ।–’না, নাই। অহনই (এখনই) রান্ধনিগো (রাধুনেদের) আখা (উনুন) ধরাইয়া ভাত চাপাইয়া দিতে কই (বলি)।‘ সে দৌড়ে চলে গেল।
শেখরনাথ বিনয় আর নকুলকে বললেন, ‘চল তো আমার সঙ্গে।‘ বলে সোজা উত্তর দিকে হাঁটতে শুরু করলেন।
বিনয় বা নকুল কেউ কোনও প্রশ্ন করল না, তার পিছু পিছু এগিয়ে চলল।
খানিকটা যাওয়ার পর শেখরনাথ বিনয়কে বললেন, ‘একটা ব্যাপার তোমার চোখে পড়েছে কি?’
অবশ্যই পড়েছিল। বিনয়রা যে ক’দিন পোর্টব্লেয়ারে ছিল তার মধ্যে উত্তর দিকে বহু দূর পর্যন্ত জঙ্গল কেটে জমি বের করা হয়েছে। আগের সীমানা থেকে প্রায় আধ মাইল জুড়ে একটা বড় গাছও আর নেই। মাটি থেকে দু’তিন হাতের মতো রেখে ওপরের গুঁড়ি এবং ডালপালা কেটে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। গুঁড়িগুলোর নিচের দিকের যে অংশ এখনও রয়েছে, সেগুলোতে বঁড়শির আকারের লোহার বিরাট বিরাট আংটা গেঁথে দিয়ে লম্বা লম্বা ভারী শেকল লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের হাতি এনে শেকলের অন্য প্রান্তটা তাদের পায়ে শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হবে। এই সব ট্রেনিং পাওয়া হাতি গুঁড়িগুলোর বাকি অংশ শিকড়-বাকড় সুদ্ধ টেনে উপড়ে ফেলবে।
জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যে কাল্পনিক পেরিমিটার রোড এতদিন ছিল, জঙ্গল কাটার পর সেটা উত্তর দিকে অনেক দূর পিছিয়ে গেছে। এই পেরিমিটার রোড ধরে পঞ্চাশ ষাট গজ পরপর উঁচু উঁচু বাঁশের টঙ। ওগুলোতে বসে বুশ পুলিশ রাতদিন চব্বিশ ঘণ্টা পাহারা দেয়। কেননা টঙগুলোর ওধারের জঙ্গলে থাকে জারোয়ারা। যে কোনও মুহূর্তে তারা জেফ্রি পয়েন্টের উদ্বাস্তু কলোনিতে হানা দিতে পারে।
পেরিমিটার রোডের কাছাকাছি চলে এসেছিলেন শেখরনাথ আর বিনয়। শেখরনাথ বললেন, ‘রিহ্যাবিলিটেশন ডিপার্টমেন্টের বড় বড় অফিসার, এমনকি চিফ কমিশনারের কাছে আর্জি জানিয়েছিলাম উত্তর-দিকের জঙ্গল যা কাটা হয়েছে–হয়েছে। আর যেন কাটা না হয়। পূর্বদিকে জারোয়া নেই, ওখানকর ফরেস্ট বরং কাটা হোক। কিন্তু আমার কথা কেউ শুনল না। এর ফলে জারোয়াদের এরিয়াটা অনেক ছোট হয়ে গেল। যেভাবে ‘ফেলিং’ চলছে আরও অনেকটা জঙ্গল ধ্বংস হয়ে যাবে। এর প্রতিক্রিয়া কী হবে জানো?
বিনয় নিঃশব্দে তার দিকে তাকাল।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।