চিফ কমিশনার বাংলা বলতে পারেন না, একটু আধটু বুঝতে পারেন। বিনয় লক্ষ করেছে, এর আগেও উদ্বাস্তুদের সঙ্গে কথা বলতে তার দোভাষীর দরকার হয়েছে। এই কাজটা বিশ্বজিত্ব করে থাকেন। আজও দায়িত্বটা তাকেই নিতে হল।
চিফ কমিশনার বয়স্ক উদ্বাস্তুদের প্রত্যেককে আলাদা আলাদা করে জিগ্যেস করছেন, তাদের বাড়ি কোথায় ছিল, ইস্ট পাকিস্তানের কোন কোন ডিস্ট্রিক্টে, কবে দেশ ছেড়ে তারা ইন্ডিয়ায় এসেছে, তাদের পরিবারে কতজন করে মানুষ, ইত্যাদি ইত্যাদি।
জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বিশ্বজিতের মারফত। তিনি উদ্বাস্তুদের কাছে উত্তর জেনে নিয়ে চিফ কমিশনারকে জানিয়ে দিচ্ছেন।
একসময় একটি বছর চল্লিশের উদ্বাস্তুর ওপর চিফ কমিশনারের নজর গিয়ে পড়ল। জিগ্যেস করলেন, ‘তোমার কী নাম?’
লোকটার শুকনো, পাকানো চেহারা। ভাঙাচোরা মুখ, গাল বসে গেছে, চুলদাড়ি খাড়া খাড়া।। কণ্ঠার হাড় গজালের মতো ঠেলে বেরিয়ে এসেছে, হাতের শিরাগুলো প্রকট। পরনে আধময়লা খাটো ধুতি আর ফতুয়া, পায়ে টায়ার কাটা স্যান্ডেল। চাউনিতে, হাবভাবে কেমন একটা খ্যাপাটে ব্যাপার রয়েছে।
লোকটা বলল, ‘আইজ্ঞা, সনাতন দাস। ‘দেশ কোথায় ছিল?’
‘আইজ্ঞা, ঢাকায়।‘
‘ফ্যামিলিতে কতজন মেম্বার?’
‘পিরথিমীতে আমার আর কেও (কেউ) নাই। আমি এক্কেরে (একেবারে) একলা। আমারে লইয়াই আমার ফেমিলি।‘ সনাতনের কথাগুলো হাহাকারের মতো শোনাল।
আন্দামানে স্বজন-পরিজন নিয়ে পুনর্বাসনের জন্য শত শত ফ্যামিলি এসেছে। কিন্তু এই মানুষটা ব্যতিক্রম। সে সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ। এই দ্বীপপুঞ্জে এমন উদ্বাস্তু আগে আর একজনও আসেনি।
শুধু চিফ কমিশনারই নন, অন্য সবাই অবাক দৃষ্টিতে সনাতনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। চিফ কমিশনার সনাতনকে আর কোনও প্রশ্ন করলেন না। ঘণ্টাদেড়েক ‘রস’ আইল্যান্ডে উদ্বাস্তুদের মধ্যে কাটিয়ে, তাদের প্রচুর ভরসা দিয়ে, বিভাস নিরঞ্জন এবং অন্য সব বাঙালি অফিসারদের বিয়ের ব্যবস্থা করে ‘কোটা’ পূরণের আধাআধি ছকটা ভেস্তে দিয়ে নিজের স্টিম বোটে পোর্টব্লেয়ারে ফিরে গেলেন।
এদিকে ইন্টার-আইল্যন্ড স্টিমশিপের ‘চলুঙ্গা’ জাহাজ জেটিতে এসে ভিড়েছে। যেসব লঞ্চে করে বিনয়রা সকালে ‘রস’ আইল্যান্ডে এসেছিল সেগুলো একধারে নোঙর ফেলে দাঁড়িয়ে আছে।
আগে থেকেই পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, নতুন যে উদ্বাস্তুরা আন্দামানে আসবে তাদের শতকরা ষাট ভাগকে পাঠানো হবে মিডল আন্দামানের নতুন কলোনিগুলোতে। বাকি চল্লিশ ভাগ যাবে জেফ্রি পয়েন্টে। সেই মতো প্রচুর হাঁকডাক করে চুয়ান্নটা ডি পি ফ্যামিলিকে ‘চলুঙ্গা’ জাহাজে তোলা হল। কিছুক্ষণ পর জাহাজটা চলতে শুরু করল।
বিনয়ের মনে পড়ল সেদিন এই ‘চলুঙ্গা’ জাহাজেই তার চোখের সামনে দিয়ে মিডল আন্দামানে চলে গিয়েছিল ঝিনুক। যখন তাকে স্পষ্ট করে দেখতে পাওয়া গেল, সে তখন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সন্ধে নেমে যাবে খানিক পরেই। তেজি, উগ্র রোদের চিহ্নমাত্র কোথাও নেই। সমস্ত চরাচর ঝাপসা হতে শুরু করেছে।
যে লঞ্চ ক’টা দাঁড় করানো রয়েছে তাতে একবারে শ’দুয়েক লোককে পোর্টব্লেয়ারে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। উদ্বাস্তুদের নিয়ে বার দুই সেসোস্ট্রেস বে পারাপার করতে হল জলযানগুলোকে। তাদের সঙ্গে গেছে নিরঞ্জন, বিভাস এবং পুনর্বাসন দপ্তরের কর্মীরা। বাকি সবাইকে নিয়ে লঞ্চ ক’টা যখন ওপারে গেল কুয়াশা আর অন্ধকারে ছেয়ে যাচ্ছে চারিদিক।
রিহ্যাবিলিটেশন ডিপার্টমেন্টের যে তিনটে বড় বিল্ডিং আছে এবারডিন মার্কেটের পিছন দিকটায়, সেখানে আজকের নতুন উদ্বাস্তুদের পাঠিয়ে দেওয়া হল। ওখান থেকে তাদের জেফ্রি পয়েন্টে পাঠানো হবে।
শেষবার লঞ্চগুলো এসে বাকি সবাইকে তুলে নিয়ে পোর্টব্লেয়ারে পৌঁছে দিল।
৪.১০ কলকাতা থেকে নতুন উদ্বাস্তু
৪.১০
কলকাতা থেকে নতুন উদ্বাস্তু আসার জন্য একটা দিন বিশ্বজিৎ শেখরনাথকে পোর্টব্লেয়ারে আটকে রেখেছিলেন। তারা এসে গেছে। মোহনবাঁশি এখন সম্পূ সুস্থ। তাই শহরে আর থাকার দরকার নেই। পরদিন ভোরে শেখরনাথ মোহনবাঁশি এবং তার বউছেলেমেয়েদের নিয়ে রওনা হলেন। তাদের সঙ্গে বিনয় আর ফোটোগ্রাফার নকুল বিশ্বাসও গেল। পোর্টব্লেয়ার থেকে চল্লিশ মাইল দূরে আন্দামানের গভীর অরণ্য নির্মূল করে জেফ্রি পয়েন্টে যে উপনিবেশ বসানো হচ্ছে সেখানকার একটা ফোটোও এখন পর্যন্ত ‘নতুন ভারত’ অফিসে পাঠানো সম্ভব হয়নি। ওদিকে কলকাতা থেকে চিফ রিপোর্টার প্রসাদ লাহিড়ি প্রতিটি চিঠিতেই ফোটোর জন্য তাগাদা দিচ্ছিলেন। নকুল বিশ্বাস শাদিপুরের প্রচুর ছবি তুলেছে, এবার জেফ্রি পয়েন্ট কলোনির ছবি তুলবে। রিপোর্টের সঙ্গে ছবি ছাপা হলে তা পাঠকের কাছে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। নকুলকে পাওয়ায় ফোটোর ব্যাপারটার সুরাহা হয়ে যাবে।
কালীপদ জিপে করে সবাইকে চ্যাথাম জেটিতে পৌঁছে দিল। সেখান থেকে লঞ্চে খাঁড়ি পেরিয়ে ওধারের জেটি। জেটির গায়ে একটা ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকবে। সেটার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন বিশ্বজিৎ। ট্রাকটা শেখরনাথদের জেফ্রি পয়েন্টে পৌঁছে দেবে।
লঞ্চ থেকে নেমে যখন সবাই ট্রাকে উঠল তখন অন্ধকার এবং কুয়াশা পুরোপুরি কাটেনি।
দু’ধারে হাজার বছরের অরণ্য। তার মধ্য দিয়ে পাহাড়ি রাস্তা চড়াই উতরাই এবং অগুনতি বাঁক ঘুরে ঘুরে এগিয়ে গেছে। সেই রাস্তা ধরে পাক খেতে খেতে ট্রাকটা যখন জেফি পয়েন্টের সেটলমেন্টে পৌঁছল, দুপুর পেরিয়ে গেছে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।