এক কুহেলিবিলীন সন্ধ্যায় ভবানীপুরের বাড়ি থেকে কারওকে কিছু না জানিয়ে সেই যে ঝিনুক চলে গিয়েছিল তারপর ক’টা মাস কীভাবে যে কেটেছে, বিনয়ই শুধু জানে। কেউ যেন তাকে অপার শূন্যতায় ছুঁড়ে দিয়েছিল। প্রতি মুহূর্তে মনে হত কারা বুঝি বুকে অবিরাম শেল বিধিয়ে চলেছে। বেঁচে থাকার কোনও মানে হয় না।
কিন্তু সময় এক অলৌকিক জাদুকর। ধীরে ধীরে তার সব দুঃখ, সব আকুলতা কখন যে হরণ করে নিতে শুরু করেছিল, টের পায়নি বিনয়। বাকি যেটুকু ছিল তা প্রায় মুছে দিয়েছে ঝুমা। এই এক পরমাশ্চর্য মেয়ে। বেপরোয়া, দুঃসাহসী। যে কোনও যুবককে আচ্ছন্ন করার মতো ম্যাজিক তার হাতে আছে। তাই বলে ঝিনুকের কাছ থেকে বিনয়কে ছিনিয়ে নেবার চেষ্টা সে করেনি। বরং চিরদুঃখী, ধর্ষিত মেয়েটার জন্য তার বুকের ভেতর ছিল অফুরান সহানুভূতি।
কিন্তু ঝিনুক নিঃশব্দে নিখোঁজ হবার পর জীবনের যে অংশটা ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল অপার মায়ায় আর মাধুর্যে তা ক্রমশ ভরে দিয়েছে ঝুমা। নিয়তিতাড়িতের মতো তার কাছে না গিয়ে যেন উপায় ছিল না বিনয়ের।
আন্দামানে আসার আগে যখন বিনয় কুমার সঙ্গে দেখা করতে যায় সে বলেছিল, রোজ না হলেও দু’তিন দিন পর পর বিনয় যেন চিঠি লেখে। ঝুমা তার জন্য অনন্ত আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে আছে।
জীবনের লকূল পাওয়া ভার। সময়ের পাকে পাকে কত অজানা রহস্য যে লুকিয়ে থাকে; আচমকা বেরিয়ে এসে ভবিষ্যতের সমস্ত পরিকল্পনা আর স্বপ্ন তছনছ করে দেয়। কে জানত আন্দামানের জাহাজে আবার ঝিনুকের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে?
আচমকা ঝুমা এবং ঝিনুক চোখের সামনে থেকে সরে যায়। অপার্থিব কোনও দর্পণে নিজের চেহারাটা দেখতে পায় বিনয়। প্রতিবিম্ব আঙুল তুলে তীব্র শ্লেষের সুরে বলে, বাহ্ বাহ্, চমৎকার। যেই ঝিনুক নিরুদ্দেশ হল, অমনি ঝুমার দিকে ঢলে পড়লে। যে নারী কৈশোরের শুরু থেকে তোমার খাসবায়ুতে জড়িয়ে আছে তার স্মৃতি নিয়ে দিন কাটিয়ে দেওয়া যেত না? একটাই তো জীবন। হাতে কত কাজ তোমার। দেখতে দেখতে সময় কেটে যেত।
আয়নার ছায়া আরও বলে, তুমি একটা নোংরা, হীন মানুষ। সংযম নেই, একাগ্রতা নেই, নিষ্ঠা নেই। যেই ঝিনুকের সঙ্গে দেখা হল অমনি তার জন্য উতলা হয়ে উঠেছ। দুই যুবতাঁকে দুই আঙুলের ডগায় দাঁড় করিয়ে এখন কী খেলা খেলতে চাও? বিশ্বাসঘাতক। একসঙ্গে দুটি মেয়ের সঙ্গে প্রবঞ্চনাকরতে তোমার আটকাবে না? মধ্য আন্দামানে যদি ঝিনুকের সঙ্গে দেখা হয়, কী করবে তাকে নিয়ে? ওদিকে ঝুমার সঙ্গে তোমার যে সম্পর্কটা গড়ে উঠেছে তার কী হবে? কী তার ভবিষ্যৎ?
বিনয় আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না। মাথার ভেতরটা ঝিমঝিম করছে। স্নায়ুমণ্ডলী ছিঁড়ে ছিঁড়ে পড়ছে। এলোমেলো পা ফেলে, প্রায় টলতে টলতে এসে বিছানায় নিজের শরীরটাকে ছুঁড়ে দিল।
.
খুব ভোরে ওঠা বহুদিনের অভ্যাস বিনয়ের। আজ কিন্তু একটু দেরি হয়ে গেল। ঘুম ভাঙতে চোখে পড়ল, সিসোস্ট্রেস বে অনেক দূরে যেখানে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশেছে তারও ওধারে জলতল থেকে যেন সূর্যটা আকাশের ঢাল বেয়ে বেশ খানিকটা ওপরে উঠে এসেছে।
সকালের লাল টকটকে সূর্য এখন রং পালটে সোনালি হতে শুরু করেছে। খোলা জানলা দিয়ে অঢেল রোদ এসে পড়েছে ঘরে।
কয়েক পলক বাইরে তাকিয়ে রইল বিনয়। কাল রাতে যেমনটা শুনেছিল আজও উপসাগর থেকে পাড়ে ঢেউ ভেঙে পড়ার শব্দ উঠে আসছে বিরামহীন। আকাশ জুড়ে ঝাঁকে ঝাকে উড়ছে সিগাল। এই সাগর পাখিদের নজর কিন্তু জলের দিকে। মাছের নড়াচড়া দেখলেই হেঁ দিয়ে পড়ছে। ধারালো ঠোঁট সামুদ্রিক কোনও মাছ গেঁথে ফের উঠে যাচ্ছে।
বেশিক্ষণ বসে থাকা গেল না। চকিতে মনে পড়ে গেল, সকালের দিকেই উদ্বাস্তুদের সঙ্গে নতুন সেটলমেন্টে যেতে হবে। ব্যস্তভাবে উঠে পড়ে বিনয়। আর কার্তিক তখনই এক বালতি গরম জল নিয়ে ঘরে এসে ঢুকল। বলল, ‘তাড়াতাড়ি চান করে নিন। সারের (স্যারের) চান হয়ে গেছে। আপনার জন্যি হল-এ বসে আচেন।‘ সার হলেন বিশ্বজিৎ রাহা।
বালতিটা লাগোয়া বাথরুমে নিয়ে চলে যাচ্ছিল কার্তিক, তাকে। থামিয়ে বিনয় জিগ্যেস করে, এখনও তো ঠান্ডা পড়েনি। কালও গরম জল দিয়েছিলে, আজও দিলে-’ বলতে বলতে থেমে যায়।
ইঙ্গিতটা ধরতে পেরেছিল কার্তিক। সে বুঝিয়ে দিল। বর্ষার জল পোর্টব্লেয়ারে ধরে রাখার ব্যবস্থা আছে। সারাবছর তা সাপ্লাই করা হয়। একে জমা জুল, তার ওপর এখানকার সামুদ্রিক নোনা বাতাস। শুধু জমানো জলে চান করলে শরীর খারাপ হবে। তার সঙ্গে গরম জল মিশিয়ে নিলে ভয় নেই।
মিনিট কুড়ির ভেতর শেভ করে, চান সেরে, পোশাক পালটে হল-ঘরে চলে এল বিনয়। আন্দামানের জাহাজে ওঠার আগে প্যান্ট শার্ট কিনেছিল। এখন তা-ই পরেছে সে।
একটা সোফায় বসে সেন্টার টেবিলের ওপর ঝুঁকে খুব মন দিয়ে একতাড়া কাগজ দেখছিলেন বিশ্বজিৎ। কাছাকাছি আসতেই বিনয় চিনতে পারল। কাল যে উদ্বাস্তুরা এসেছে কাগজগুলোতে তাদের নামটাম টাইপ করা রয়েছে। বিশ্বজিৎ তাহলে ঝিনুকের কথা ভুলে যাননি। সে কাদের সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের এই দ্বীপপুঞ্জে এসেছে, নিশ্চয়ই জেনে গেছেন তিনি। অফুরান আশায় আর উত্তেজনায় বুকের ভেতরটা দুলতে থাকে বিনয়ের।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।