এদিকে যে জাহাজটায় উদ্বাস্তুরা কলকাতা থেকে এসেছিল সেই স্টিমশিপ ‘মহারাজা গম্ভীর ভো বাজিয়ে সেলুলার জেল পেরিয়ে মাউন্ট হ্যারিয়েট ডাইনে রেখে চ্যাথাম জেটির দিকে চলে গেছে। বেলা পড়লে ইন্টার-আইল্যান্ড শিপ সারভিসের স্টিমশিপ ‘চলুঙ্গা’ জাহাজটি এসে পড়বে। আজ যে উদ্বাস্তুদের আনা হয়েছে তাদের দু’ভাগ করে বড় অংশটাকে মিডল আন্দামানের নতুন রিফিউজি সেটলমেন্টে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। বাদবাকি যাবে জেফ্রি পয়েন্টের নয়া উপনিবেশে।
খাওয়াদাওয়ার পর উদ্বাস্তুরা ‘রস’ আইল্যান্ডের চারপাশে যে বিরাট বিরাট সব পাথরের চাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে সেগুলোর ছায়ায় শুয়ে পড়েছে। উদ্বাস্তুরা টানা চারদিন উথালপাতাল সমুদ্রে জাহাজের অবিরল ঝকানি খেতে খেতে আসার কারণে এখন তাদের সারা শরীর জুড়ে অনন্ত ক্লান্তি। শোওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের চোখ জুড়ে এসেছে।
বিনয়রাও খাওয়া দাওয়া চুকিয়ে বড় বড় ছাতাগুলোর তলায় বসে জিরিয়ে নিচ্ছিল। সেই কোন ভোরে উঠে তারা ‘রস’-এ চলে এসেছিল। পেটে ভাত পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদেরও ঘুম পাচ্ছিল।
হঠাৎ একনাগাড়ে ভটভট আওয়াজ শুনে সবাই চকিত হয়ে উঠল। বিনয়দের যে ঢুলুনি এসেছিল, লহমায় কেটে গেল। চোখে পড়ল পোর্টব্লেয়ারের দিক থেকে একটা বড় স্টিম লঞ্চ সেসোস্ট্রেস বের ঢেউ কেটে কেটে ‘রস’ আইল্যান্ডের দিকে আসছে।
লঞ্চটা আন্দামানের সবারই চেনা। ওটা আন্দামান অ্যান্ড নিকোবরের চিফ কমিশনারের নিজস্ব জলযান। যদিও সোমনাথ সেন হারবার মাস্টার, এই অঞ্চলের সব বন্দর, জেটি, জাহাজ, স্টিমবোট তাঁর নিয়ন্ত্রণে, কিন্তু চিফ কমিশনার হলেন আন্দামান-নিকোবর দুই দ্বীপপুঞ্জের সর্বেসর্বা। তার লঞ্চটার ওপর সোমনাথ সেনের এতটুকু কর্তৃত্ব নেই। চিফ কমিশনার ইচ্ছা করলে তার জলযানে যখন যেখানে খুশি যেতে পারেন। পদমর্যাদায় তিনি এখানে সবার চেয়ে উঁচুতে।
ব্রজদুলাল মণ্ডল বলেন, ‘আন্দামানে রিফিউজিদের আনা হলে কোনও দিন চিফ কমিশনার ‘রস’ আইল্যান্ডে আসেন না। রিফিউজিদের মনোবল বাড়ানোর জন্য বাঙালিরাই শুধু আসে। সন্ধেবেলা রিফিউজিদের এবারডিন মার্কেটের সামনের মাঠে নিয়ে গিয়ে ওঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এবার নিশ্চয়ই চিফ কমিশনারের সন্দেহ হয়েছে ‘কোটা’য় যদি ঘাটতি থাকে, বিয়েটিয়ে দিয়ে সেপারেট ফ্যামিওি বানিয়ে তা পূরণ করা হতে পারে। তাই নিজেই দেখতে চলে এসেছেন।‘
ডাক্তার চট্টরাজ বললেন, ‘অত্যন্ত ধুরন্ধর লোক।‘
সবাই মাথা নাড়লেন। এ বিষয়ে তারা একমত।
বিভাস আর নিরঞ্জন কাছাকাছিই রয়েছে। বিশ্বজিৎ তাদের বললেন, ‘বিয়ে দেওয়ার ছকটা তো করে এসেছিলে। সত্যি সত্যিই তার অ্যারেঞ্জমেন্ট যদি করা হত, কী অবস্থায় সবাই পড়তাম, ভেবে দেখ—’
বিভাস এবং নিরঞ্জন মাথা নিচু করে রইল। কোনও উত্তর দিল না।
স্টিম লঞ্চটা ‘রস’ আইল্যান্ডের জেটিতে এসে ভিড়তেই সব অফিসার এবং অন্য মান্যগণ্য লোজন ব্যস্ত পায়ে সেখানে গিয়ে ভিড় জমালেন। আন্দামান-নিকোবরের সর্বময় কর্তাকে অভ্যর্থনা জানানোটা রীতি।
খালাসিরা রেলিং-লাগানো কাঠের পাটাতন পেতে লঞ্চের সঙ্গে জেটিটা জুড়ে দিয়েছিল। চিফ কমিশনার নেমে আসতেই সবাই হাতজোড় করে বললেন, ‘আসুন স্যার, আসুন—’
চিফ কমিশনার মানুষটি সবসময় হাসিমুখ। কখনও উঁচু গলায় কথা বলেন না। তাঁরা এই ভদ্র, শান্ত মুখটির আড়ালে যে একটি চতুর মুখ লুকনো রয়েছে সেটা বাঙালি অফিসাররা এতদিনে জেনে গেছেন। তিনিও হাতজোড় করে বললেন, ‘দেড় বছর ধরে মেনল্যান্ড থেকে রিফিউজিরা আন্দামানে আসছে কিন্তু কখনও আমি ‘রস’-এ আসিনি। আজ খুব ইচ্ছে হচ্ছিল, চলে এলাম।‘ জেটি থেকে ঢালু, এবড়ো খেবড়ো পাথুরে পথ বেয়ে দ্বীপে উঠতে হয়। কারওকে গিয়ে তার হাত ধরতে হল না। তিনি নিজেই উঠে এলেন।
তাঁকে এনে একটা ছাতার তলায় বসানো হল। চিফ কমিশনার বললেন, ‘আজ আর এবারডিন মার্কেটের সামনে নয়, এখানেই রিফিউজিদের সঙ্গে কথা বলতে চাই। তারা কোথায়?’
বিশ্বজিৎ বললেন, ‘খাওয়া দাওয়া করে ওখানে জিরোচ্ছে। তিনি বিরাট বিরাট পাথরের চাঁইগুলো দেখিয়ে দিলেন।‘
চিফ কমিশনার লক্ষ করলেন, চাঁইগুলোর ছায়ায় সারি সারি অগুনতি মানুষ।
বিশ্বজিৎ বিভাস আর নিরঞ্জনকে বললেন, ‘যাও, রিফিউজিদের ডেকে নিয়ে এসো।‘
শেখরনাথ এবং অন্য অফিসাররা দাঁড়িয়ে ছিলেন। চিফ কমিশনার শেখরনাথকে বেশ সসম্ভ্রমে বললেন, ‘বসুন আঙ্কল, বসুন–’ অন্য অফিসারদেরও বসতে বললেন।
বিভাস আর নিরঞ্জন কয়েকজন পুনর্বাসন দফতরের কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে হাঁকডাক করে রিফিউজিদের ঘুম ভাঙিয়ে সঙ্গে করে নিয়ে এল। তাদের বলল, ‘আন্দামানের সব থিকা বড় কত্তা চিফ কমিশনার সাহেব আইছেন (এসেছেন); তোমাগো লগে (তোমাদের সঙ্গে) আলাপ করবেন। ক্যাচামেচি (চেঁচামেচি) কইরো না। হাতজোড় কইরা তেনার সামনে খাড়াইবা (দাঁড়াবে)।‘
বিভাসরা যেমন বলে দিয়েছিল সেইভাবে এসে চিফ কমিশনারের সামনে রিফিউজিরা কাতার দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। আন্দামানের হর্তাকর্তাবিধাতাটি কেন তাদের মতো সর্বস্ব খুইয়ে আসা তুচ্ছ মানুষজনের সঙ্গে আলাপ করতে চান, ভেবে ভেবে তারা তলকূল পাচ্ছিল না। সকলে ত্রস্ত, হতচকিত, জড়সড়।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।