নিরঞ্জন যা বলল তা এইরকম। অন্যবার পার্টির লোকেরা রিলিফ ক্যাম্পগুলোতে আর শিয়ালদা স্টেশনে গিয়ে উদ্বাস্তুদের তাতায়, কোনওমতেই তারা যেন আন্দামানে না যায়। পুনর্বাসন পশ্চিমবঙ্গেই দিতে হবে। খিদিরপুর ডকে রিফিউজি আনার পর জাহাজ টাহাজ দেখে ভয়ে মাঝে মাঝে দু-চারটে ফ্যামিলি রাতারাতি পালিয়ে গেছে। কিন্তু এবার খিদিরপুর ডকের দিকে কয়েকটা লরিতে একশো বিশটা ফ্যামিলি নিয়েই রওনা হয়েছিল নিরঞ্জনরা। একদল পুলিশ তাদের পাহারা দিয়ে আনছিল। কিন্তু রাস্তায় পার্টির লোকেরা তাদের আটকে দেয়। ‘উদ্বাস্তুদের পশ্চিমবঙ্গের বাইরে নিয়ে যাওয়া চলবে না, চলবে না।’ ‘এই রাজ্যেই তাদের পুনর্বাসন–দিতে হবে, দিতে হবে।’
পুলিশ লাঠি চালিয়ে পার্টির লোকদের হটিয়ে দিলেও তিরিশটা ডি পি ফ্যামিলিকে শেষ পর্যন্ত তারা ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। বছরখানেক ধরে তারা আন্দামানে উদ্বাস্তু আনছে কিন্তু এমন ঘটনা আগে আর কখনও ঘটেনি। যাই হোক, আন্দামানের জাহাজ ছাড়বে পরদিন ভোরে। তখন নিরঞ্জন আর বিভাসের হাতে এমন সময় ছিল না যাতে ত্রাণশিবির কি শিয়ালদা স্টেশনের চত্বর থেকে তিরিশটা ফ্যামিলি জোগাড় করে এনে ‘কোটা’ পূরণ করতে পারে।
নিরঞ্জনের বয়ান শেষ হওয়ার পর ছাতার তলার পরিবেশটা থমথমে হয়ে গেল। সবাই চুপচাপ।
স’মিলের মালিক জনার্দন পাল বললেন, ‘তিরিশটা উদ্বাস্তু ফ্যামিলি না আসা মানে পাঁচ তিরিশে দেড়শো একর জমি বাঙালিদের হাতছাড়া হয়ে যাবে। পঞ্চাশ একর অর্থাৎ সাড়ে চারশো বিঘা। এতটা জমি কি সোজা কথা! এখানে একটা ষড়যন্ত্র চলছে, এমনটা শোনা যাচ্ছে। রিক্রেম-করা জমি গভর্নমেন্ট ফেলে রাখবে না। মোপালারা তো পা বাড়িয়েই আছে। কিছুদিন ওয়েট করার পর তাদের এনে এখানে বসিয়ে দেবে।
বিভাস বলল, ‘গভর্নমেন্ট হেইডা (সেটা) পারব না। আগের বারে কী হইছিল আপনেরা বুঝিন ভুইলা গ্যাছেন!’ পকেট থেকে একটা ভাজ করা কাগজ বের করে ফেলল।–‘জাহাজে আইতে আইতে (আসতে আসতে) আমি একহান (একখানা) লিস্টি বানাইয়া ফালাইছি।‘
ডক্টর শ্যামচৌধুরি জিগ্যেস করলেন, ‘কিসের লিস্ট?’
‘যে নব্বইডা’ ফেমিলি এইবার আইছে হেগো (তাদের) মইদ্যে পনরোডা অবিয়াত (অবিবাহিত) বষ্যের পোলা (যুবক) আর পনরোডা অবিয়াত মাইয়া আছে। এয়াগো (এদের) আলদা কুনো ফেমিলি নাই। আগের বারের মতো এই ‘রস’ দ্বীপেই হেগো (তাদের) বিয়া দিয়া সেপারেট ফেমিলি বানাইয়া (তৈরি করে) কোটা’র পুরাটা না অইলেও (হলেও) আধাআধি পূরণ কইরা ফেলান (ফেলা) যাইব।’
অর্থাৎ গতবারের পরিকল্পনা অনুযায়ী সমস্যাটার অর্ধেকটা সমাধান ভেবে রেখেছে বিভাস। যতটা জমি বাঙালিদের আসে, সেটুকুই লাভ। সেবার ‘কোটা’র চেয়ে ছ’টা ফ্যামিলি কম ছিল, ‘রস’ আইল্যান্ডেই ছ’জোড়া যুবক-যুবতীর বিয়ে দিয়ে কোটা’ সম্পূর্ণ করা হয়েছিল। এবারও সেই একই পদ্ধতি।
পকেট থেকে বিভাস যে কাগজটা বের করেছিল, সেটার ভাঁজ খুলে বিভাস বলতে লাগল, ‘অবিয়াত (অবিবাহিত) পোলা-মাইয়াগো নামগুলান এইবার শুনাই। বংশী পরামানিক, গৌর পাল, নিতাই পাল, যদু কর্মকার, যোগেন আচার্য, গণেশ সাহারায়, গোপাল বারুই, শ্রীহরি ঘোষ, অনন্ত রুদ্রপাল এই রকম পনরো জন। মাইয়ারা (মেয়েরা) হইল তারামণি, দুর্গা, হরিমতি, পদ্ম, টগরী, ময়না, কাজল, সাগরী এই রকম আর কি। গেল বারে ছ’টা বিয়া সারতে ঘণ্টাখানেক লাগছিল, এইবার সোময় এটু বেশি লাগব। রিফিউজিগো খাওন দাওন (খাওয়া দাওয়া) হউক, আমরাও খাইয়া লই। বিকালের মইদ্যে বিয়াগুলান সাইরা ফালামু (ফেলব)। সন্ধ্যার আগে আগে যহন (যখন) পোর্টব্লেয়ারে রওনা হমু (হব), পুরাটা অইব (হবে) না, কিন্তুক অনেকখানিই অইব (হবে)।’
আস্তে আস্তে মাথা নাড়লেন বিশ্বজিৎ।–’লিস্ট তৈরি করে কাজ অনেকটা এগিয়ে রেখেছিলে ঠিকই। কিন্তু এই রাস্তায় সমস্যার সলিউশন এবার আর হবে না।‘
বিভাস হতভম্ব।–’ক্যান?’
‘বিয়ে দিয়ে ফ্যামিলি বাড়াবার চাতুরিটা চিফ কমিশনার ধরে ফেলেছেন। ব্যাপারটা ভীষণ রিস্কি। হয়ে যাবে। নব্বইটা ডি পি ফ্যামিলি নিয়ে এসেছ; ওই নব্বইই দেখাতে হবে।‘
‘কিন্তু বাকি তিরিশড়া ফেমিলির জমিনের কী অইব (হবে)?’
‘পরে সেসব ভাবা যাবে।‘
বিভাসকে হতাশ দেখাল।–’গেলবার ছয়ডা বিয়া দিয়া আমরা যে ‘কোটা’ পুরা করছিলাম, চিফ কমিশনার হেইটা (সেটা) জানলেন কেমনে?’
তিক্ত একটু হাসি ফুটে ওঠে বিশ্বজিতের মুখে। বললেন, ‘পোর্টব্লেয়ারের বাঙালিদের মধ্যে দু-চারটে বিভীষণ নেই? তাদের কেউ চিফ কমিশনারের কাছে গিয়ে লাগিয়েছে।‘
.
শুধু উদ্বাস্তুদেরই নয়, পোর্টব্লেয়ার থেকে যাঁরা তাদের এই দ্বীপে স্বাগত জানাতে এসেছেন তাদের সবার খাওয়া হয়ে গেছে। সূর্য আকাশের ঢাল বেয়ে পশ্চিম দিকে অনেকটা নেমে গেছে। কিন্তু রোদে এখনও ছুরির ধার। আকাশ বা সমুদ্রের দিকে তাকানো যায় না। সেসোস্ট্রেস বে’র নোনা জলের পাহাড়প্রমাণ উত্তাল ঢেউগুলো থেকে তীব্র ঝঝ উঠে আসছে। যে সাগরপাখিগুলো দিনের আলো ফোঁটার সঙ্গে সঙ্গে শিকারের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে, মাছ নজরে পড়লেই জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তাদেরও এখন দেখা যাচ্ছে না। রোদের মারাত্মক তাপ থেকে নিজেদের বাঁচাতে তারা পাড়ের বিরাট বিরাট গাছগুলোর ঘন পাতার আড়ালে গিয়ে লুকিয়েছে। বেলা পড়লে রোদ যখন জুড়িয়ে আসবে, ফের তারা সমুদ্রের ওপর চক্কর দিতে বেরুবে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।