সকালের জলখাবার শেষ হতে সাড়ে ন’টা বেজে গেল। তারপর বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। এগারোটায় ‘এস এস মহারাজা’ জাহাজের ‘রস’ আইল্যান্ডে পৌঁছবার কথা। তার অনেক আগেই অনেক দূরে দু’পাশে দুই দ্বীপের মাঝখান দিয়ে একটা চলমান বিন্দু দেখা গেল। ছোট্ট বিন্দুটা ক্রমশ বড় হতে হতে দশ হাজার টনের বিশাল জলযান হয়ে ‘রস’ আইল্যান্ডের জেটিতে এসে ভিড়ল। কিছুদিন আগেই এই এস এস অর্থাৎ স্টিমশিপ ‘মহারাজা’তেই বিনয় এসে নেমেছিল।
জাহাজ ভিড়তেই তুমুল হইচই শুরু হয়ে গেল। পোর্টব্লেয়ার থেকে যারা এসেছেন রাধানাথের টিম ছাড়া বাকি সবাই জেটির কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। বিনয়ও তাঁদের সঙ্গেই আছে। ওদিকে জাহাজের উঁচু ডেকের ধারে ক্যাপ্টেন ছাড়াও অন্য সব কর্মীকে দেখা যাচ্ছে। তাদের মধ্যে বিভাস আর নিরঞ্জনও রয়েছে।
খালাসিরা হাঁকডাক করে ওপর থেকে কাঠের সিঁড়ি নামিয়ে দিল জেটিতে। বিভাসরা জাহাজের খোল থেকে রিফিউজিদের তাড়া দিয়ে দিয়ে তুলে এনে সিঁড়ি দিয়ে একে একে সবাইকে নামিয়ে আনল।–’নামেন হগলে (সকলে)। নামেন, নামেন—’
বিনয়ের মনে পড়ল, আগের বারও এইভাবেই উদ্বাস্তুদের নামিয়েছিল বিভাসরা। সে লক্ষ করল, ছিন্নমূল মানুষগুলি শীর্ণ, ভয়ার্ত। বিহ্বলের মতো তারা এদিকে ওদিকে তাকাচ্ছে।
সোমনাথ সেন, বিশ্বজিৎ রাহা, ব্রজদুলাল মণ্ডলরা, বিশেষ করে শেখরনাথ প্রতিটি উদ্বাস্তুর পিঠে হাত রেখে সদয় গলায় বলতে লাগলেন, ‘ভয়ের কিছু নেই। আমরা এত জন বাঙালি তোমাদের নিতে এসেছি। আন্দামানে সবসময় তোমাদের পাশে থাকব।
আরও কয়েকজন তাঁর কথায় সায় দিলেন।
ব্রজদুলাল মণ্ডল শেখরনাথের পরিচয় দিয়ে বললেন, ‘উনি একজন মস্ত মানুষ। ইংরেজ আমলের বিপ্লবী। দেশের স্বাধীনতার জন্যে অনেক লড়াই করেছেন। ইংরেজদের হাতে ধরা পড়ার পর ওঁকে ‘কালাপানি’র সাজা দিয়ে আন্দামানে পাঠানো হয়েছিল, সাতাশ আটাশ বছর আগে। তিনি আর দেশে ফিরে যাননি, এখানেই থেকে গেছেন। যেখানে তোমাদের জমিজমা দিয়ে বসতি গড়ে তোলা হচ্ছে, সেখানে সবসময় ওঁকে পাবে।
উদ্বাস্তুরা শেখরনাথের ব্যাপারটা কতটা বুঝতে পারল, বোঝা গেল না, তবে এতজন গণ্যমান্য বিশিষ্ট মানুষের আশ্বাসে তারা বেশ ভরসা পেল। অন্তত তাদের মুখচোখ দেখে তেমনই মনে হল। বিনয়ের।
পুনর্বাসন দপ্তরের অনেক কর্মী পোর্টব্লেয়ার থেকে এসেছিল। তাদের মধ্যে কয়েকজন মুখে চোঙা লাগিয়ে হেঁকে হেঁকে উদ্বাস্তুদের ডাকছিল, ‘আপনাদের জন্যে রান্না হয়ে এসেছে। কেউ সমুদ্রে নামবেন না, ঝাঁকে ঝাঁকে হাঙর ঘুরছে। এধারে জল তোলা আছে; হাতমুখ ধুয়ে খেতে বসে যান। সকালে এসেই দ্বীপের মাঝামাঝি জায়গায় সারি সারি বিশাল বিশাল ড্রামে জল তুলে রাখা হয়েছিল। কর্মীরা সেগুলো দেখিয়ে দিল।
খাওয়ার ডাক শোনার সঙ্গে সঙ্গে ছিন্নমূল মানুষগুলোর মধ্যে তুমুল চাঞ্চল্য দেখা দিল।–’জবর ক্ষুদা (খিদে) পাইছে। সমুন্দুরের আলিসান ঢেউয়ে জাহাজে কয়ডা দিন আছাড়ি-পিছাড়ি খাইছি। প্যাটে ভাত রুটি গ্যালে (গেলে) বমি অইয়া (হয়ে) গ্যাছে। অহন (এখন) ক্ষুদায় প্যাট জ্বইলা যায়। তারা জলের ড্রামগুলোর দিকে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড় লাগাল। তাদের পিছুপিছু লম্বা লম্বা পা ফেলে শেখরনাথও এগিয়ে গেলেন। নিশ্চয়ই উদ্বাস্তুদের খাওয়া-দাওয়া তদারক করবেন।
এদিকে নিরঞ্জন আর বিভাস জেটিঘাটের কাছে সোমনাথ সেন, বিশ্বজিৎ রাহা, ব্রজদুলাল মণ্ডলদের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। বিভাস নিচু গলায় তাদের বলল, ‘এইবার কইলকাতায় রিফিউজি আনতে গিয়া নিরঞ্জন আর আমার কী ফ্যাসাদ যে অইছে (হয়েছে), কইয়া বুঝাইতে পারুম না।
বিশ্বজিৎ জিগ্যেস করলেন, ‘কিসের ফ্যাসাদ?’
‘কুনোহানে (কোথাও) বইয়া (বসে) কইতে পারলে ভালা হয়। মেলা (অনেক) কথা—’
মস্ত মস্ত ছাতার তলায় দশ বারোটা করে ফোল্ডিং চেয়ার আর টেবিল পাতা রয়েছে। একটা ছাতার দিকে হাত বাড়িয়ে বিশ্বজিৎ বললেন, ‘চল, ওখানে বাস যাক।‘
কিন্তু একটা মাত্র ছাতার নিচে এতজন নামিদামি বিশিষ্ট মানুষের পক্ষে বসা সম্ভব নয়। ক্ষিপ্র হাতে বিভাসরা অন্য ছাতাগুলো থেকে বেশ কয়েকটা চেয়ার নিয়ে এল। সবাই বসে পড়নে কিন্তু ওরা পঁড়িয়ে রইল। বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের এই সব হর্তাকর্তাদের অনেক নিচের স্তরের কর্মী তারা। কী করে বসে?
সোমনাথ সেন হেসে হেসে বললেন, ‘আরে বোসো বোসো। এটা অফিস টফিস নয়। কাছে বসলে আমাদের সম্মানহানি হবে না।‘
বিভাস আর নিরঞ্জন সসঙ্কোচে বসল। বিনয় আগেই গিয়ে বিশ্বজিতের পাশে বসে পড়েছিল। ওদিকে উদ্বাস্তুদের নামিয়ে দিয়ে, সিঁড়ি টিড়ি তুলে ‘এস এস মহারাজা’ সেলুলার জেলের পাশ দিয়ে ঘুরে চ্যাথাম জেটিতে যাওয়ার তোড়জোড় করছে। কিছুদিন আগে বিনয় যখন আন্দামানে এল, এই জাহাজটাকে এভাবেই যেতে দেখেছিল।
বিশ্বজিৎ নিরঞ্জনদের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। বললেন, ‘এবার বল—’
নিরঞ্জন বলল, এইবার একশো বিশডা ডি পি (ডিসপ্লেসড পার্সনস) ফেমিলি আননের কথা আছিল। কিন্তু, ‘কোটা’ পূরণ করতে পারি নাই।
চারিদিক থেকে প্রশ্নটা ধেয়ে এল।–’কেন? কেন?’
নিরঞ্জন বলল, ‘পার্টির লোকেরা ঝামেলা পাকাইছে।‘
‘সে তো যতবার আন্দামানে রিফিউজিদের আনা হয়, ততবারই এটা হয়। নতুন তো নয়—’

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।