অন্য চারটে উনুনে বিরাট বিরাট ডেকচি আর কড়াইতে ভাত-ডাল বসানো হয়েছে। একটা দল আনাজ কাটছে, আরেকটা দল বড় বড় সুরমাই আর লাল ভেটকি কাটছে, চারজন বাটনা বেটে চলেছে।
কলকাতা থেকে এবার একশো কুড়িটা ডি পি ফ্যামিলি অর্থাৎ উদ্বাস্তু পরিবার আসার কথা। পরিবার পিছু চারজন ধরলেও বাচ্চাকাচ্চা মিলিয়ে পাঁচশোর কাছাকাছি মানুষ। তার সঙ্গে পোর্টব্লেয়ারের শ’খানেক। প্রায় ছ’শো লোকের জন্য রান্না কি মুখের কথা! লুচি-তরকারি হয়ে গেলে এই দুটো উনুনে মাছ আর ভাতের সঙ্গে খাওয়ার জন্য পাঁচমেশালি তরকারি বসানো হবে। কতবার যে ভাত, ডাল, মাছটাছ রাঁধতে হবে তার লেখাজোখা নেই। এ এক এলাহি কাণ্ড।
শেখরনাথ বিনয়কে সঙ্গে করে রান্নার জায়গায় চলে এলেন। বললেন, ‘কী রে রাধানাথ, রিফিউজিদের জন্যে কী কী পদ রাঁধা হচ্ছে?’
একটা মাঝারি হাইটের, টাকমাথা, নিরেট চেহারার লোক, পরনে খাটো ধুতি আর হাফশার্ট, গায়ের রং ময়লা, একটা উনুনের পাশ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আইজ্ঞা কাকা, ভাত, মুসোরির ডাইল, আলু ভাজা, নানা আনাজপাতি দিয়া ব্যন্নন (ব্যঞ্জন), মাছের ঝোল আর হের (তার) লগে (সঙ্গে) দুধ তো আছেই।‘
বোঝা গেল, রাধানাথ হেড কুক এবং পূর্ববাংলার মানুষ। শেখরনাথ এবং রাধানাথ পরস্পরকে চেনেন। হয়তো পূর্বপাকিস্তান থেকে এই দ্বীপপুঞ্জে এসে রান্নাবান্নার কাজ করছে রাধানাথ।
শেখরনাথ বললেন, ‘দেখিস, মাছ আর তরকারিতে যেন বেশি ঝাল টাল দিয়ে বসিস না। রিফিউজিদের ফ্যামিলিগুলোতে ছোট ছেলেমেয়ে নিশ্চয়ই থাকবে। ঝাল দিলে তারা খেতে পারবে না।
রাধানাথ একটু হাসল।–’হেই (সেই) খেয়াল আমার আছে। আইজ তো নয়া ‘রিফুজ’ আইতে আছে না। বছর দ্যাডেক (দেড়েক) ধইরা তাগো লেইগা (তাদের জন্য) রানতে (রাঁধতে) আছি। আপনে নিশ্চিন্ত থাইকেন কাকা।
রাধানাথ বেশ চালাক চতুর। একবার কিছু বললে সেটা তার মাথায় থেকে যায়। প্রথম যেবার রিফিউজিরা এল তখন এই ঝাল সম্পর্কে রাধানাথকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন শেখরনাথ। সেটা সে ভোলেনি।
শেখরনাথ খুশি হলেন। প্রসন্ন মুখে বললেন, ‘আমি নিশ্চিন্ত হলাম। এবার আসল কথাটা বল—’
রাধানাথ উন্মুখ হল।–’কী কথা কাকা’
‘জাহাজ কিন্তু এগারোটায় পৌঁছে যাবার কথা। তার আগে তোর রান্নাবান্না হয়ে যাবে তো?’
‘এইর (এর আগে চাইর বার (চার বার) রিফুজ আইছে আন্ধারমান দ্বীপি। হেরা (তারা) তো প্যাটে দুনিয়ার খিদা লইয়া জাহাজ থিকা নামে। নাইমা কুনোবার ভাতের লেইগা (জন্য) এক দণ্ডও বইয়া (বসে) থাকতে অইচে (হয়েছে)? যদি এগারোটার জাগায় (জায়গায়) দশটায়ও আইয়া পড়ে, ফেল করুম না।‘ আত্মবিশ্বাস জোরদার করার জন্য একটা ইংরাজি শব্দও পূর্ব বাংলার ডায়ালেক্টের মধ্যে গুঁজে দিল সে।
শেখরনাথ মৃদু হাসলেন।
কত আদমলেন। কিছুক্ষণ রাধানাথদের সঙ্গে কাটিয়ে শেখরনাথ বিনয়কে বললেন, ‘চল, ওই দিকটায় যাই—’
যেধারে ছাতাগুলোর তলায় চেয়ার পাতা রয়েছে সেদিকে পা বাড়ালেন শেখরনাথ। তার পাশাপাশি হাঁটতে লাগল বিনয়।
শেখরনাথ বলতে লাগলেন, ‘রাধানাথ লোকটা বেশ উদ্যোগী। পূর্ব বাংলার ঢাকা ডিস্ট্রিক্টের মানিকগঞ্জ সাব-ডিভিশনে ছিল আদি বাড়ি। দাঙ্গার বছর, মানে ফর্টি সিক্সে ওদের ওই অঞ্চলৈ বহু মানুষ খুন হয়। আতঙ্কে রাধানাথরা কলকাতায় পালিয়ে আসে। স্বাধীনতা আর দেশভাগের তখনও একবছর বাকি। সেই অর্থে ওরা রিফিউজি নয়। দেশে রাধানাথের একটা ছোট ভাতের হোটেল ছিল; ওর রান্নার হাত চমৎকার। কলকাতায় হোটেল খোলার মতো পয়সার জোর ছিল না। কলকাতায় পাইস হোটেলগুলোর রমরমা। এই ধরনের দু-তিনটে হোটেলে সামান্য মাইনের রাঁধুনির কাজ করেছে সে। কিন্তু লোকটা অ্যাম্বিশাস এবং দূরদর্শী। পার্টিশানের পর লাখ-লাখ মানুষ ইস্ট পাকিস্তান থেকে উৎখাত হয়ে বর্ডারের এপারে চলে এল। পুনর্বাসনের জন্যে আন্দামানে তাদের পাঠানো শুরু হলে সেইসময় পোর্টব্লেয়ার সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়। এখানে বেশ কিছু বাঙালি আছে; ভবিষ্যতে চাকরি বাকরি, ব্যবসা বাণিজ্যের জন্যে আরও অনেক বাঙালি আসবে। রাধানাথ ভাবল, আন্দামানে এলে তার কপাল খুলে যেতে পারে। বিরাট ঝুঁকি নিয়ে পোর্টব্লেয়ারের জাহাজে উঠে পড়ল। তারপর কিভাবে যেন বিশু (বিশ্বজিৎ রাহা) আর রিহ্যাবিলিটেশনের অন্য দু-তিনজন টপ অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের হাতে-পায়ে ধরে বোঝাল, ঠিক রিফিউজি না হলেও একরকম রিফিউজিই তো। দাঙ্গায় উৎখাত হওয়া একজন মানুষ। কেঁদেকেটে রিফিউজি কোটায় একটা লোন বের করে এভারডিন মার্কেটের কাছে একটা ভাতের হোটেল খুলে ফেলল। বছর দুয়েকের মধ্যে সেই ব্যবসা বেশ জমে উঠেছে তার। বাঙালিদের খুব পেট্রোনেজ পায় সে। ইত্যাদি ইত্যাদি।
.
একসময় বেলা বাড়লে কুয়াশার স্তরগুলি ছিন্নভিন্ন করে রোদ উঠে এল। এখন চারিদিক ঝকঝকে, পরিষ্কার। চোখের সামনে প্রতিদিনের সেই পরিচিত দৃশ্য। সমুদ্রের পাহাড়প্রমাণ ঢেউগুলি বিপুল আক্রোশে পোর্টব্লেয়ারের দিকে ধেয়ে গিয়ে পাড়ের ওপর আছড়ে পড়ছে। কাছে বা দূরে যেদিকে যতদূর চোখ যায় ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ছে সিগাল।
সাড়ে আটটায় রাধানাথ তার টিমের চারজন ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে শালপাতার থালায় সবাইকে লুচি-তরকারি আর চা দিয়ে গেল।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।