ডক্টর শ্যামচৌধুরি ডাইনে-বাঁয়ে অসহিষ্ণুভাবে মাথা নাড়তে লাগলেন, ‘এটা একেবারেই ঠিক হচ্ছে না, কোনওভাবেই এটা মেনে নেওয়া যায় না।‘
জনার্দন পাল জোরে জোরে হাত ঝাড়ার মতো ভঙ্গি করে বিরক্ত মুখে বলতে লাগলেন, ‘ক’টা আধ-ন্যাংটা জংলির জন্যে আপনার দরদ একেবারে উথলে উঠছে দেখছি। রিফিউজিগুলোর কথা ভাবুন—’
ডক্টর শ্যামচৌধুরির মতো নিরীহ, শান্ত মানুষও এইবার ভীষণ রেগে গেলেন। জনার্দন পালের দিকে আঙুল তুলে গলার স্বর অনেকটা উঁচুতে তুলে বললেন, ‘কাদের জংলি বলছেন আপনি–অ্যাঁ? দে আর সন্স অফ দিস সয়েল। দে আর—’
ডক্টর শ্যামচৌধুরি এমন খেপে যাবেন হয়তো ভাবতে পারেননি জনার্দন পাল। মিনমিন করে কী যেন বলার চেষ্টা করলেন।
ডক্টর শ্যামচৌধুরির গলার শিরা উত্তেজনায় ফুলে উঠেছে। তিনি এবার চিৎকার করে উঠলেন।–’শাট আপ’–
বাকি সবাই বুঝিয়ে সুঝিয়ে ডক্টর শ্যামচৌধুরিকে শান্ত করলেন।
যে মেজাজে কথাবার্তা চলছিল তার সুরটা কেটে গেছে। হারবার মাস্টার সোমনাথ সেন ঘড়ি দেখে ব্যস্তভাবে বললেন, ‘ওহ, অনেক রাত হয়ে গেছে। ন’টা বেজে আঠারো। আজ ওঠা যাক, কাল সকালে কলকাতা থেকে রিফিউজি নিয়ে জাহাজ আসছে। তাদের রিসিভ করতে যেতে হবে। চলুন–চলুন—’
সবাই উঠে পড়লেন। সোমনাথ সেন, পরমেশ দত্তরা বিনয়কে বললেন, একদিন তাদের বাংলোয় শেখরনাথ, বিশ্বজিৎ এবং বিনয়কে লাঞ্চ বা ডিনার খেতে হবে। তখন প্রচুর গল্পটল্প করা যাবে।
বিনয় লক্ষ করল দশজন তাদের নিমন্ত্রণ জানালেন। বিশ্বজিৎ এবং শেখরনাথ আন্দামানেই থাকেন। তাদের যে কোনওদিন খাওয়ানো যায়। আসল উপলক্ষটা বিনয়ই। ভদ্রতা এবং সৌজন্যের কারণে বিশ্বজিৎদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। দু-একদিনে তো এতজনের বাড়িতে গিয়ে খাওয়া যায় না। এতগুলো নেমন্তন্ন রাখতে হলে দশদিন পোর্টব্লেয়ারে থাকতে হয়। সেটা অসম্ভব। বিনয় বলল, কাকা আর আমি দু-তিনদিনের মধ্যে জেফ্রি পয়েন্ট ফিরে যাব। ক্ষমা করবেন, এবার আর সম্ভব হচ্ছে না। পরে যখন আসব তখন না হয়—’
সবাই জানালেন, বেশ, তাই হবে।
.
৪.৯
কলকাতা থেকে জাহাজ-বোঝাই উদ্বাস্তুরা পুনর্বাসনের জন্য যেদিন এসে ‘রস’ আইল্যান্ডে নামে সেদিন ভোরবেলায় পোর্টব্লেয়ার থেকে ছোট বড় সরকারি বাঙালি অফিসার থেকে সাধারণ লোকজনও সেখানে চলে যায়।
আন্দামানের ছোটবড় সবক’টি বন্দর এবং জেটিঘাটই শুধু নয়; জাহাজ থেকে স্টিমার, লঞ্চ, স্টিম বোট, মোটর বোট ইত্যাদি যাবতীয় জলযান হারবার মাস্টার সোমনাথ সেনের নিয়ন্ত্রণে। কলকাতা থেকে উদ্বাস্তু এলে পোর্টব্লেয়ারের অনেক বাঙালি, উদ্বাস্তুদের খাওয়ানোর জন্য চাল, ডাল, মাছ, সবজি, তেল, মশলা, মস্ত মস্ত উনুন, হাঁড়ি, কড়া, রান্নার লোক ইত্যাদি ‘রস’ আইল্যান্ডে নিয়ে যাওয়ার জন্য দু’টো লঞ্চ, চার-পাঁচটা মোটর বোটের ব্যবস্থা করে দেন তিনি।
আজ উদ্বাস্তু আসবে। তাই আজও লঞ্চ টঞ্চের বন্দোবস্ত করা হয়েছে।
ভোরবেলায়, সূর্য সবে উঠতে শুরু করেছে, মালপত্র এবং মানুষজন বোঝাই করে দুটো লঞ্চ, সেলুলার জেলের নিচের দিকের জেটি থেকে কোনাকুনি সেসোট্রেস উপসাগর পেরিয়ে ‘রস’ আইল্যান্ডের জেটিতে পৌঁছে গেল।
লঞ্চে শেখরনাথ, বিশ্বজিৎ, সোমনাথ সেন, ডক্টর শ্যামচৌধুরি, ডাক্তার চট্টরাজ, ব্রজদুলাল মণ্ডল, জনার্দন পালদের সঙ্গে বিনয়ও এসেছে। তারা একে একে দ্বীপে নেমে পড়ল। দশ পনেরোটি লোক ঝপাঝপ সব লটবহর নামিয়ে ফেলল। চালডাল ইত্যাদি জিনিসপত্রের সঙ্গে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড রঙিন ছাতা আর অনেক লোহার ফোল্ডিং চেয়ারও এসেছিল। চার-পাঁচটা আর্দালি জাতীয় লোক সেগুলো নামিয়ে ছাতাগুলোর ভঁটি মাটিতে পুঁতে প্রতিটির তলায় ছ’সাতটা করে চেয়ার পেতে দিল। ছাতার তলায় মস্ত মস্ত অফিসার আর পোর্টব্লেয়ারের অন্য সব মান্যগণ্যদের বসার বন্দোবস্ত। কিছুদিন আগে বিনয় যখন উদ্বাস্তুদের সঙ্গে এখানে এসে নামে, এইরকম ছাতাটাতা দেখেছিল।
অন্যদিনের মতো আজও এই ভোরবেলার গাঢ় কুয়াশায় সমুদ্র এবং দূরের দ্বীপগুলো ঢেকে আছে। ওইসব দ্বীপের গায়ে হাজার বছর ধরে যেসব মহাবৃক্ষ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে, এখন সেগুলো কেমন যেন ঝাপসা ঝাপসা। ঘষা কাঁচের ভেতর দিয়ে দেখলে যেমন মনে হয়, অনেকটা সেইরকম। এমনকি মাউন্ট হ্যারিয়েটের যে চূড়াটা কাঠের সাদা ক্রস নিয়ে আকাশের দিকে মাথা তুলে আছে সেটাও স্পষ্ট নয়। কুয়াশার স্তর ভেদ করে এই দ্বীপপুঞ্জে রোদ এসে পৌঁছতে এখনও অনেক দেরি। যে বিশিষ্ট দামি মানুষগুলির জন্য ছাতা এবং চেয়ারের বন্দোবস্ত তারা কিন্তু কেউ বসেননি, চারিদিকে থোকায় থোকায় দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। অনেকে সমুদ্রের ধার ঘেঁষে ঘাসের জমির ওপর এলোমেলো হাঁটছেন।
সারা ‘রস’ আইল্যান্ডটার এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বেশ কিছু প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড পাথরের চাঁই। তারই কয়েকটার আড়ালে তেরপলের চাদোয়া খাঁটিয়ে সেগুলোর তলায় পুরোদমে রান্নার আয়োজন চলছে। ছটা বিরাট বিরাট উনুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। পোর্টব্লেয়ার থেকে শ’খানেক মানুষ এসেছেন। তাদের কেউ এত ভোরে ব্রেকফাস্ট সেরে আসার সময় পাননি। এঁদের জন্য একটা উনুনে। লুচি ভাজা হচ্ছে, আরেকটা উনুনে লুচির সঙ্গে খাওয়ার জন্য আলুর তরকারি। যেদিন উদ্বাস্তুরা ‘রস’ আইল্যান্ডে এসে নামে সেদিন হারবার মাস্টার, চিফ কনজারভেটর অফ ফরেস্টের সঙ্গে সামান্য কেরানির মধ্যে ভেদাভেদ থাকে না। সবারই খাবার এক–লুচি-তরকারি। তার সঙ্গে চা।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।