প্রাইভেট শিপিং কোম্পানির চন্দ্রনাথ চৌধুরি বললেন, ‘এই ধরনের পলিটিকস আমাদের সর্বনাশ করে দিচ্ছে।‘
জনার্দন পাল বললেন, ‘আমার মনে হয়, কমিউনিস্টরা রিফিউজিদের উসকে দিয়ে নিজেদের সাপোর্ট বেসটা বাড়াতে চাইছে। এত মানুষকে পাশে পেলে তাদের স্ট্রেন্থ অনেক বাড়বে।‘
রাজনীতি নিয়ে ক্লাবঘরের আবহাওয়া ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল। অ্যানথ্রোপোলজিক্যাল ডিপার্টমেন্টের ডক্টর শ্যামচৌধুরি আলোচনার মোড় অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিলেন।–’আন্দামানকে আপনারা সবাই সেকেন্ড বেঙ্গল বানাতে চান। আমিও তাই চাই কিন্তু অন্য একটা দিক ভেবে দেখেছেন কী?’
সবার চোখ তার ওপর স্থির হল। চিফ কনজারভেটর অফ ফরেস্ট ব্রজদুলাল মণ্ডল জিগ্যেস করলেন, ‘কোন দিকের কথা বলছেন?’
‘সাউথ আর মিডল আন্দামানের ফরেস্ট যেভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে তাতে এই আর্কিপেলাগোর সবচেয়ে বড় দুটো দ্বীপে গাছপালা বলতে কিছু থাকবে না। তাতে এই দ্বীপপুঞ্জে মারাত্মক এনভায়রনমেন্টাল প্রবলেম দেখা দেবে। ক্রমাগত জঙ্গল কেটে কেটে রিফিউজিদের জন্য জমি বের করতে থাকলে দশ-বারো বছরে এখানকার পরিবেশের সর্বনাশ হয়ে যাবে। গভর্নমেন্টের এই বিষয়টা বিশেষ করে ভাবা উচিত, নইলে পরে আফসোস করতে হবে।‘
জনার্দন পালকে রীতিমতো উত্তেজিত দেখাল। বললেন, ‘এতসব উদ্বাস্তুর রিহ্যাবিলিটেশন তা হলে হবে কী করে? জঙ্গলের চেয়ে মানুষের জীবনের দাম অনেক বেশি। বিশেষ করে যারা ইস্ট পাকিস্তান থেকে সর্বস্ব খুইয়ে এপারে চলে এসেছে।‘
ব্রজদুলাল মণ্ডল মানুষটি শান্ত ধরনের। কালো রং, ভারী চেহারা। চোখে গোলাকার চশমা। পরনে ঢলঢলে ফুলপ্যান্ট আর ঢোলা শার্ট, যেটার গলা অবধি সব ক’টা বোতাম আটকানো। নিরুত্তেজ, ঠান্ডা গলায় বললেন, তা হলে বলছেন গাছপালার দাম নেই? জঙ্গল কেটে আন্দামানকে যদি মরুভূমি করে ফেলা হয়, যারা এখানে বাস করবে, তাদের হাল কী হবে, ভেবে দেখেছেন?
জনার্দন পালের স্নায়ুগুলো খুব সম্ভব চড়া তারে বাঁধা থাকে। ফের তিনি কণ্ঠস্বর চড়িয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, পিডব্লডি’র চিফ ইঞ্জিনিয়ার তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘মানুষের জন্যে গাছপালা, বনজঙ্গল খুবই জরুরি। মিস্টার মণ্ডল ঠিকই বলেছেন, নির্বিচারে গাছটাছ কেটে ফেললে আল্টিমেটলি মানুষেরই ক্ষতি।‘
জনার্দন পালের মাথায় হয়তো গাছপালার গুরুত্ব কিছুটা ঢুকল। এবার শান্তভাবেই জিগ্যেস করলেন, জাঙ্গল ফেলিং না করলে রিহ্যাবিলিটেশন হবে কিভাবে?’
‘গাছপালা, জঙ্গল–এসব যতটা সম্ভব বাঁচিয়ে সেটা করতে হবে। সেইমতো প্ল্যানিং করা দরকার। আমার মনে হয় সেটা এখন পর্যন্ত করা হয়নি। এখনই এদিকে নজর দিতে হবে।‘
অ্যানথ্রোপোলজিক্যাল ডিপার্টমেন্টের ডিরেক্টর ডক্টর শ্যামচৌধুরি বললেন, ‘আরও একটা সমস্যা এই রিহ্যাবিলিটেশন প্রসেস শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিয়েছে। নিশ্চয়ই সেটা আপনারা লক্ষ করেছেন।‘
হারবার মাস্টার সোমনাথ সেন বললেন, ‘সেটা কী বলুন তো?’
শ্যামচৌধুরি বললেন, ‘ব্যাপারটা এলাবোরেটলি বলা দরকার। পঞ্চাশ-ষাট বছর আগেও আন্দামানে তেরো রকমের ট্রাইব ছিল। ন’টা ট্রাইব এর মধ্যে শেষ হয়ে গেছে। বাকি রয়েছে চারটে–লিটল আন্দামানের ওঙ্গে, নর্থ আর সাউথ সেন্টিনেল দ্বীপের সেন্টিনালিজ আর সাউথ আর মিডল আন্দামানের জারোয়া। আর আছে গ্রেট আন্দামানিজরা, তাদের সংখ্যা ওনলি সেভেনটি ফাইভ। ট্রাইব হিসেবে পিওর নয়, নানা রক্তের মিশ্রণ ঘটে তাদের চেহারা টেহারা পালটে গেছে। এই পঁচাত্তর জনও কতদিন টিকে থাকবে, কে জানে। সে যাক, ওঙ্গে আর সেন্টিনালিজরা অনেক দূরে থাকে। সেখানে আপাতত গভর্নমেন্টের রিহ্যাবিলিটেশনের কোনও পরিকল্পনা নেই। ওরা বেঁচে গেছে। কিন্তু ভয়ঙ্কর বিপদ জারোয়াদের। সাউথ আর নর্থ আন্দামানের জঙ্গলে এতকাল নিজেদের মতো করেই থাকত। কিন্তু রিফিউজি রিহ্যাবিলিটেশন শুরু হওয়ার পর থেকে রোজ জঙ্গল কাটা হচ্ছে, জারোয়াদের সীমানা তাতে দ্রুত ছোট হয়ে যাচ্ছে। তারা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। রিফিউজিদের ওপর রেগুলারলি তারা চড়াও হচ্ছে। দু’একজন মারা গেছে, কয়েকজন জখম হয়েছে। এদের সংরক্ষণের দিকটা ভাবা উচিত।‘
বিনয় এতক্ষণ নীরবে শুনে যাচ্ছিল। এবার বলল, ‘কাকা কয়েকদিন আগে চিফ কমিশনারের সঙ্গে দেখা করে জারোয়াদের সমস্যার কথা জানিয়ে বলেছিলেন রিফিউজিদের জন্যে অনেকটা এলাকার জঙ্গল কাটার ফলে তাদের চলাফেরার জায়গা কমে যাচ্ছে। এতে এই ট্রাইবের লোকজন ক্রমশ হিংস্র হয়ে উঠেছে।‘
শেখরনাথকে যে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের প্রতিটি মানুষ–পুরনো কয়েদি থেকে সরকারি আমলা, ব্যবসাদার, দোকানদার, বেসরকারি অফিসের সাধারণ কর্মী ‘কাকা’ বলে সেটা সবাই জানে।
আগ্রহে ক্লাবঘরের প্রতিটি মেম্বার বিনয়ের দিকে তাকাল। নৃতাত্ত্বিক শ্যামচৌধুরি জিগ্যেস করলেন, ‘চিফ কমিশনার কাকাকে এ ব্যাপারে কোনওরকম অ্যাসিওরেন্স দিয়েছেন?’
বিনয় বলল, ‘খুব সম্ভব না। জাঙ্গল ফেলিং বন্ধ করে দেবেন, এমন কথা বলেননি, শুধু নাকি বলেছেন, ব্যাপারটি তিনি ভেবে দেখবেন।‘
বিশ্বজিৎ রাহাও বিনয়ের কথায় সায় দিলেন।–’কাকা সেদিন যখন বিনয়বাবুকে বলছিলেন, আমিও ওঁদের সামনে ছিলাম। তিনি চিফ কমিশনারের সঙ্গে দেখা করে এসে এসব জানিয়েছেন।‘

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।