এসব শেখরনাথের অজানা নয়। বিশ্বজিৎ যখন একটানা বলে যাচ্ছিলেন, তাকে বাধা দেননি। এবার বললেন, ‘ঠিক আছে, থেকে যাব।’
.
হাতে সময় আছে। পোর্টব্লেয়ার শহরটা সেভাবে দেখা হয়নি বিনয়ের। কালীপদের জিপে দু’দিন সারা শহর ঘুরে বেড়াল সে।
একদিন সন্ধেবেলায় বিশ্বজিৎ তাকে বাঙালিদের একমাত্র ক্লাব ‘অতুল স্মৃতি সমিতি’তে নিয়ে গেলেন।
অনেক উঁচু স্তরের অফিসারদের নাক-উঁচু, ভারিক্কি একটা ভাব থাকে। নিজেদের চারপাশে দুর্ভেদ্য পাথরের দেওয়াল তুলে এঁরা দূরত্ব বজায় রাখেন। কিন্তু আন্দামানের এই বিচ্ছিন্ন দ্বীপের ‘অতুল স্মৃতি সমিতি’তে ভেদাভেদটা খুব বেশি নয়, মনে হল বিনয়ের। ভারী পদমর্যাদার অফিসারদের কেরানি, সুপারভাইজার, বড়বাবু ধরনের কর্মীরা সমীহ করে ঠিকই; তবে ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকে না। সম্পর্কটা খোলামেলা, অনেকখানিই সহজ এবং আন্তরিক।
বিনয় যেদিন আন্দামানে আসে সেদিনই ‘রস’ আইল্যান্ডে চিফ কনজারভেটর অফ ফরেস্ট ব্রজদুলাল মণ্ডল, চিফ মেডিক্যাল অফিসার ডাক্তার প্রণবেশ চট্টরাজ, হারবার মাস্টার সোমনাথ সেন। এমন কয়েকজন বড়কর্তার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। আজ ডাক্তার চট্টরাজকে দেখা গেল না। তবে অ্যানথ্রোপোলজিকাল সার্ভের ডক্টর শ্যামচৌধুরি, পিডব্লুউডি’র চিফ ইঞ্জিনিয়ার পরমেশ দত্ত, বিরাট স’মিলের মালিক জনার্দন পাল, একটা প্রাইভেট শিপিং কোম্পানির ডিরেক্টর চন্দ্রনাথ চৌধুরি–এমন কয়েকজন এবং সরকারি বেসরকারি আট দশজন ছোট মাপের অফিসার ক্লার্কার্কদের সঙ্গে পরিচয়। করিয়ে দিলেন বিশ্বজিৎ।
হারবার মাস্টার সোমনাথ সেন বললেন, ‘আপনার সঙ্গে একদিনই দেখা হয়েছিল। তারপর শুনলাম আপনি রিফিউজিদের সঙ্গে জেফ্রি পয়েন্টে চলে গেছেন। ভাল করে আলাপই হয়নি। রাহাসাহেব বলেছেন, আপনি ইস্ট পাকিস্তান থেকে মাত্র কিছুদিন আগে এসেছেন। সেখানকার পরিস্থিতি এখন কিরকম?
পিডব্লুডি’র চিফ ইঞ্জিনিয়ার পরমেশ দত্ত বললেন, ‘রেডিওতে খবর শুনি, কিংবা দু’তিন দিন পর পর কলকাতা থেকে যে নিউজ পেপারগুলো আসে তাতে যা বেরোয়, খুবই দুশ্চিন্তার কারণ। তবে মনে হয়, এই সব মিডিয়ায় সবটা বেরোয় না। মাইনোরিটি কমিউনিটির লোকজনের পক্ষে সেখানে থাকা কি আর সম্ভব হবে?’
বিনয় লক্ষ করল, তার চারপাশে যাঁরা বসে আছেন, সবার চোখেমুখে প্রবল আগ্রহ। সেই সঙ্গে তীব্র উৎকণ্ঠাও। পূর্বপাকিস্তানের অভ্যন্তরে কী ঘটে চলেছে, কলকাতা থেকে এতদূরের দ্বীপে রেডিও আর খবরের কাগজ মারফত কতটুকুই বা জানা যায়। ইন্ডিয়ায় যাতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বা বিদ্বেষ না বাড়ে সেজন্য অনেক ভয়ঙ্কর খবর চেপে রাখা হয় কিংবা অনেকটা হালকা করে কাগজে ছাপা হয় কিংবা রেডিওতে প্রচার করা হয়। বিনয় তা জানে। বলল, আমি যখন সীমান্তের ওপার থেকে আসি পাকিস্তানের পরিস্থিতি ভাল ছিল না। সারাক্ষণ আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হত। বিহারি মুসলিমরা এপার থেকে ওপারে গিয়ে পরিবেশ আরও মারাত্মক করে তুলেছে। একটু থেমে আবার শুরু করল, ‘আমি যে কতটা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বর্ডারের এপারে এসেছি, সে শুধু আমিই জানি। যে কোনও মুহূর্তে আমি খুন হয়ে যেতে পারতাম। ঝিনুকের প্রসঙ্গটা বাদ দিয়ে বিশ্বস্ত, সৎ, সাহসী দুই মুসলমান মাঝির ভরসায় কিভাবে আকণ্ঠ উদ্বেগ নিয়ে দীর্ঘ নদী পেরিয়ে স্টিমার ঘাটায় এসেছিল, সেখান থেকে গোয়ালন্দে রিফিউজি স্পেশালে চেপে শিয়ালদা স্টেশনে পৌঁছেছিল তার অনুপুঙ্খ বিবরণ দিয়ে গেল।
অনেকক্ষণ নীরবতা।
তারপর বিনয়ই ফের বলতে লাগল, আমার দাদু, মানে মায়ের মামা, দিদা-পাকিস্তানে থেকে গেছেন। দাদু একজন আদর্শবাদী মানুষ। যাই ঘটুক তিনি দেশ ছেড়ে আসবেন না। কয়েকদিন আগে তার একটা চিঠি পেয়েছিলাম। তিনি লিখেছেন, পাকিস্তানের পরিস্থিতি দিন দিন আরও ঘোরালো হয়ে উঠেছে। সারাক্ষণ হুমকি দেওয়া হচ্ছে; দাদু বেনামা বেশ কিছু চিঠি পেয়েছেন–দেশ ছেড়ে চলে যাও। যুবতী মেয়েরা নিরাপদ নয়, রাতের অন্ধকারে তাদের জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ঘরে আগুন, খুনখারাপি–এসব তো আছেই। সব সময় প্যানিকের মধ্যে বাস করা যায় না। দলে দলে মানুষ সর্বস্ব ফেলে চলে আসছে। তবে মাইনোরিটি কমিউনিটির লোকজন এখনও অনেকেই সেদেশে রয়েছে। যদি গভর্নমেন্ট তাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা না করে কতদিন থাকতে পারবে, জানি না।
পরিবেশটা থমথমে হয়ে গেল।
একসময় প্রসঙ্গটা পালটে যায়। এবার বিষয় কলকাতা এবং আন্দামানে উদ্বাস্তু পুনর্বাসন।
চিফ কনজারভেটর অফ ফরেস্ট ব্রজদুলাল মণ্ডল বললেন, ‘কলকাতার অবস্থা তো শুনছি সাংঘাতিক। পলিটিক্যাল পার্টিগুলো তো রিফিউজিদের নিয়ে রোজ আন্দোলন করে চলেছে। বিশেষ করে কমিউনিস্টরা তাদের আন্দামানে আসতে দিতে চায় না। যতভাবে পারে রিফিউজিদের আটকে রাখতে চাইছে ওয়েস্ট বেঙ্গলেই।‘
বিনয় আস্তে আস্তে মাথা নাড়ল।–’হ্যাঁ, ঠিকই শুনছেন।‘
‘এর জন্যে পরে পস্তাতে হবে।‘
সমিলের মালিক জনার্দন পাল বললেন, ‘বাঙালির মতো আত্মঘাতী জাতি খুব কমই আছে। পলিটিক্যাল গেইনের জন্যে যারা বাধা দিচ্ছে তারা কি জানে না, কত বড় একটা সুযোগ ওয়েস্ট বেঙ্গলের হাতে এসে গেছে? এখানে রিহ্যাবিলিটেশনটা যদি সুদলি হয়ে যেত, আমরা ইন্ডিয়াতেই সেকেন্ড একটা বেঙ্গল পেয়ে যেতাম।‘

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।