পালিয়ে যে যাবে তার কোনও উপায় নেই। জঙ্গলের দিকে গেলে জারোয়াদের তীরে অবধারিত মৃত্যু। জলে নামারও উপায় নেই। সেখানে ঝাঁকে ঝাকে হাঙর ঘুরছে।
কিন্তু ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট যখন তাদের শাদির ব্যবস্থা করে শাদিপুরে পাঠাল, জেনানা এবং পুরুষ কয়েদিরা যেন হাতের মুঠোয় বেহেস্ত পেয়ে গেল। নারীসঙ্গহীন এই দ্বীপের পুরুষ কয়েদি পেল একটি ঘরণী। আর মেয়েরা পেল একটি করে নিজস্ব পুরুষ। ঘরগৃহস্থি’ বসানোর পর এই দুর্ধর্ষ খুনি এবং দস্যুদের জান্তব হিংস্র প্রকৃতির উগ্রতা ধীরে ধীরে জুড়িয়ে আসতে লাগল। নিভৃত ঘর-সংসার তাদের আমূল বদলে দিল। এদের ছেলেমেয়ে হতে লাগল, ইংরেজরা যাদের নামকরণ করে গেছে–’লোকাল। বর্ন্য’। এখন বিবাহিত পুরুষ-কয়েদিরা দায়িত্বশীল বাবা আর মেয়ে-কয়েদিরা মমতাময়ী জননী।
অন্যদিকে জাতি-গোত্র-বংশ মিলিয়ে, যোটক বিচার করে এদের বিয়ে হয়নি। একজন পাঠানের ঘরণী হয়েছে একজন বিহারি, একজন রাজস্থানির ঘরবালা শিখ, কোনও বর্মী কারেনের জীবনসঙ্গিনী সেন্ট্রাল প্রভিন্সের রাজপুত্র ক্ষত্রিয়। হিন্দুর ঘর করতে এসেছে মুসলমান, বৌদ্ধের ঘরে এসেছে খ্রিস্টান বা শিখ। আন্দামানে জাতপাতের যাবতীয় সওয়াল ধুয়েমুছে সাফ। সবচেয়ে যা বিনয়কে বেশি নাড়া দিয়েছে তা হল এখানকার ধর্মের দিক। ধর্ম নিয়ে লেশমাত্র মাতামাতি বা অন্ধ গোঁড়ামি নেই। সেই ছেচল্লিশ সাল থেকে কমিউনাল রায়ট বা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় সারা ভারতীয় উপমহাদেশে রক্তস্রোত বয়ে গেছে এবং এখনও বয়ে চলেছে। কিন্তু আট-ন’শো মাইল দূরে বঙ্গোপসাগরের এই দ্বীপে এক ফোঁটা রক্তপাতও হয়নি। জীবন এখানে নিরাপদ, নির্বিঘ্ন, দাঙ্গার উন্মাদনা এখানে এসে পৌঁছয়নি।
শাদিপুরে ধর্ম যার যার নিজস্ব ব্যাপার। স্বামীটি হয়তো যাচ্ছে মসজিদে, তার স্ত্রী মন্দিরে। কারও ঘরবালী নিষ্ঠাবতী খ্রিস্টান, সে যায় গির্জায়; তার স্বামী গুরদোয়ারায় বা ফুঙ্গি চাউঙে (বৌদ্ধ মন্দিরে)। এ নিয়ে কোনও বিরোধ বা সংঘাত নেই, তিক্ততা নেই। ধর্মবিশ্বাসটা যার যার নিজের অধিকারে। কেউ তা নিয়ে মাথা ঘামায় না। স্বামী-স্ত্রী মন্দির, মসজিদ, ফুঙ্গি চাউঙ বা গুরুদোয়ারা থেকে ফিরে এসে নিজের নিজের সংসারের ঘরণী বা গৃহকর্তা। তাদের ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে কোন ধর্ম পালন করবে, কোন ধর্মবিশ্বাস তাদের পছন্দ হবে সেটা তারাই ঠিক করে নেবে। বাপ-মা নিজেদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা তাদের ওপর চাপিয়ে দেবে না।
বিনয় ভাবে, এই শাদিপুরের খবর কি ইন্ডিয়ার মেনল্যান্ডের কেউ জানে? ভারত এবং পাকিস্তানের ধর্মান্ধ মানুষজন এবং জননেতাদের গোঁড়ামিমুক্ত এই ছোট্ট ভূখণ্ডটি এনে দেখালে কেমন হয়?
.
এই তিনদিন রোজ শাদিপুর থেকে ফিরে রাত্তিরে খাওয়া-দাওয়া চুকিয়ে কয়েদি দম্পতিদের ইতিহাস এবং জীবনযাপনের কাহিনি লিখেছে সে। নকুল বিশ্বাস সেখানকার যে সব ফোটো তুলেছে সেগুলো ডেভলাপ করে দুই-একদিনের মধ্যে দিয়ে যাবে।
মনে হয়, তার লেখাটা ভালই হয়েছে। ‘নতুন ভারত’-এর পাঠকেরা একটা নতুন অজানা জগতের কথা পড়ে খুশিই হবে।
নকুল বিশ্বাস ফোটোর কপিগুলো দিয়ে গেলে লেখাসুদ্ধ ফোটোগুলো একটা পুরু কাগজের প্যাকেটে পুরে, সেটার মুখ আটকে, বিশ্বজিৎ রাহাকে দেবে। তিনি কলকাতায় পাঠাবার ব্যবস্থা করবেন।
.
৪.৮
ডাক্তার চট্টরাজ মোহনবাঁশি কর্মকারকে ‘ফিটনেস’ সার্টিফিকেট দিয়েছেন। ভিটামিন ছাড়া তাকে অন্য কোনও ওষুধ খেতে হবে না। সে তার বউবাচ্চাদের নিয়ে জেফ্রি পয়েন্টের রিফিউজি সেটলমেন্টে ফিরে যেতে পারে। তবে ভারী কোনও কাজ আপাতত বেশ কিছুদিন বন্ধ। যেমন জঙ্গল কাটাই, চাষবাস ইত্যাদি।
শেখরনাথ বললেন, ‘আমরা তা হলে মোহনবাঁশিদের নিয়ে কালপরশুর মধ্যে চলেই যাই। এর ভেতর সেটলমেন্টের কাজ কতটা এগিয়েছে, কে জানে। তিনি সরকারি কর্মী নন, সেদিক থেকে কোনওরকম দায়িত্বই তাঁকে দেওয়া হয়নি। কিন্তু পূর্বপাকিস্তানের ছিন্নমূল মানুষদের নতুন বসতি গড়ে তোলার অনেকখানি দায় যেন তারই। ব্রিটিশ আমলের এই পুরনো শ্রদ্ধেয় বিপ্লবী নিজের কাঁধে সেটা নিজেই তুলে নিয়েছেন।
বিশ্বজিৎ বললেন, ‘এতদিন যখন আপনারা রইলেনই, আরও চারটে দিন থেকে যান কাকা—’
‘কেন রে?’ শেখরনাথ উৎসুক হলেন।
‘সেদিন বলেছিলাম না, নিরঞ্জন আর বিভাস রিফিউজি আনতে কলকাতায় গেছে। তাদের জাহাজ এর মধ্যে চলে আসবে।‘
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে।‘
বিশ্বজিৎ বিশদভাবে বুঝিয়ে দিলেন। উদ্বাস্তুরা সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আন্দামানে সহজে আসতে চায়; তাদের খিদিরপুরে এনে জাহাজে তোলা খুবই কষ্টকর। যদিও বা তাদের চোখের সামনে আন্দামান সম্পর্কে স্বপ্নের একটা ছবি টাঙিয়ে তোলা হল, ছিন্নমূল মানুষগুলি জাহাজের খোলে আতঙ্কগ্রস্তের মতো দলা পাকিয়ে বসে থাকে। স্বপ্নের ছবিটা কতটা সত্যি তারা জানে না। বঙ্গোপসাগরের অজানা দ্বীপপুঞ্জে তাদের জন্য কী নিদারুণ ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করে আছে, কে জানে। ভয়, অনিশ্চয়তা, সংশয়–সব মিলিয়ে তারা সারাক্ষণ সিঁটিয়ে থাকে। তার ওপর রয়েছে চারদিনের সমুদ্রযাত্রার ধকল। ‘রোলিং’ এবং ‘পিচিং’-এ আছাড় খেতে খেতে হাড়গোড় চুরমার হয়ে যায় উদ্বাস্তুদের। খাওয়ামাত্র হড় হড় করে তারা বমি করে ফেলে। ক্ষুধার্ত, আধমরা, সন্ত্রস্ত মানুষগুলো আন্দামানে এসে যদি এখানকার বাঙালিদের, বিশেষ করে শেখরনাথের মতো লোকজনদের দেখে অনেক ভরসা পাবে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।