চারপাশের গাঁওবালাদের কেউ কেউ দুর্ভেদ্য জঙ্গলে বজরঙ্গীদের ঘাঁটি গাড়ার ব্যাপারটা জানত। কিন্তু কার ঘাড়ে ক’টা মুন্ডি আছে যে পঞ্চাশ হাজার টাকার লোভে খবরটা সরকারকে জানায়।
শেষ পর্যন্ত পাটনা থেকে এক জবরদস্ত আংরেজ অফিসার এবং বিশাল পুলিশবাহিনী পাঠানো হল। অফিসারের নাম লিপটন সাহেব। তিনি মাসখানেকের ভেতর বজরঙ্গীদের গোপন আস্তানার হদিশ পেয়ে গেলেন। তার হুকুমে পুলিশের দঙ্গল জঙ্গল ঘিরে গাছপালায় ‘মিটি তেল’ (পেট্রল) ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিল, সেই সঙ্গে চলল বেপরোয়া গুলি।
বজরঙ্গীদের হাতেও দশ-পনেরোটা বন্দুক ছিল; সেগুলো মুঙ্গেরে তৈরি বে-আইনি গাদা বন্দুক। সরকারি বন্দুকের পাল্লা অনেক দূর পর্যন্ত, মুঙ্গেরি বন্দুক সেগুলোর কাছে কিছুই নয়।
একদিকে দাউ দাউ আগুন, অন্যদিকে একটানা গুলি! বজরঙ্গীদের পক্ষে কতক্ষণ আর লড়া সম্ভব? তার দলের বেশ কয়েকজন ডাকু গুলিতে শেষ হয়ে গেল, জখম হল তার চেয়ে বেশি। বাকি সবাই হাতিয়ার ফেলে হাত তুলে ধরা দিল। এদের মধ্যে বজরঙ্গীও ছিল।
এরপর হাজত। হাজত থেকে আদালত। এক বছর পর জজ সাহেবের রায়ে পঁচিশ বছরের ‘কালাপানি’ হয়ে গেল বজরঙ্গীর। সেলুলার জেলে ঢুকে প্রথম প্রথম মনে হত, পুরা জিন্দেগিটাই বরবাদ হয়ে গেছে।
আড়াই সাল মোটামুটি কয়েদখানার আইন-কানুন মেনে চলার পর সে ‘ম্যারিজ সাট্রিফিট’ পায়। মা-লিনের সঙ্গে শাদি হল। গয়া জেলার দুর্দান্ত ডাকু, হত্যারা (খুনি) এখন শান্তশিষ্ট, পোষমানা, দায়িত্বশীল ভারতীয় নাগরিক। বর্মী মা-লিন জাদু জানে। সে গয়া জেলার সেই খুনিকে বশে এনে একেবারে নিরীহ, গৃহপালিত জীবে পরিণত করেছে।
বজরঙ্গীর জীবনের লম্বা ইতিহাস শেষ হল। হাসিমুখে বিনয়ের দিকে তাকিয়ে সে জিগ্যেস করে, ‘আর কিছু জানতে চান?’
বিনয়ও হাসল।–’না। আপনাদের অনেকক্ষণ কষ্ট দিয়ে গেলাম।‘
‘কিসের কষ্ট! আপনি যে মেহেরবানি করে চাচাজির সঙ্গে আমাদের গরিবখানায় এসেছেন, সেজন্যে বহুৎ খুশ হয়েছি।‘
‘আচ্ছা, আজ তা হলে চলি—’
‘আবার আসবেন।‘
.
বজরঙ্গীদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আরও ছ’টা কোয়ার্টারে গেল বিনয়রা। সেখানে যারা থাকে তাদের জীবনের ইতিহাসও প্রায় একই। খুনটুন করে ‘কালাপানি’ আসা, ম্যারেজ সার্টিফিকেট পেয়ে জেনানা ফাটকের বিচিত্র স্বয়ম্বর সভায় গিয়ে শাদি; তারপর শাদিপুরে এসে ঘর-সংসার পাতা, ইত্যাদি ইত্যাদি।
দুপুরে সূর্য যখন আকাশের ঢালু পাড় বেয়ে মাথার ওপর উঠে এল, সেই সময় বৈজুদের কোয়ার্টারে চলে এলেন শেখরনাথরা। তাঁদের জন্য বাইরের ঘরে অপেক্ষা করছিল বৈজু আর সোমবারী।
সোমবারী হালকা গলায় বলল, ‘ভাইসাব, মহল্লার ঘরে ঘরে ঘুরে বহুৎ বাতচিত করে আপনারা হয়রান হয়ে পড়েছেন। থোড়া জিরিয়ে নিন। গোসলখানায় পানি আছে। তারপর হাত-মুহ ধুয়ে খেতে বসবেন। আমার রসুই হয়ে গেছে।
মিনিট পনেরো পর বাইরের ঘরের মেঝেতে শতরঞ্জি পেতে খাওয়ার ব্যবস্থা হল।
জাঠের মেয়ে সোমবারী শুধু তলোয়ার বা হাতিয়ার ধরতে শেখেনি, হাতা-খুন্তিও নিপুণভাবে চালাতে পারে। তার রান্নার হাতটি চমৎকার। পদও বেঁধেছে বেশ কয়েকটি। সরু চালের ভাত, ঘি-মাখানো চাপাটি, ঘন অড়র ডাল, সুরমাই মাছ ভাজা, আলুভাজা, সরষে দিয়ে লাল ভেটকি, পুদিনার চাটনি, ঘরে-পাতা দই, ক্ষীরের বরফি।
শেখরনাথ বললেন, ‘এত সব কী করেছিস! কখন করলি?’
লাজুক হাসে সোমবারী।–’কোনওদিন আপনাকে চায়-পানি ছাড়া কিছুই খাওয়াতে পারিনি। আজ ভগোয়ান শিউশঙ্করজি মেহেরবানি করেছেন; তাই আপনি এসেছেন, ভাইসাবরা এসেছেন। আমার দিল খুশ হয়ে গেছে।‘
অবাক বিস্ময়ে সোমবারীর দিকে তাকিয়ে আছে বিনয়। পলকহীন। এই মেয়েটিই একদিন ধারালো হাতিয়ারের কোপে দুজনের মাথা নামিয়ে আন্দামানে এসেছিল, ভাবাই যায় না। চিরকালের ভারতীয় নারীর মতো সোমবারী এক পরমাশ্চর্য সুগৃহিণী। শান্ত, স্নিগ্ধ, অতিথিপরায়ণ। তার অতীত জীবন সম্পর্কে কাল বিনয় যা শুনে গিয়েছিল তার সঙ্গে আজ তাকে যেভাবে দেখল তা মেলানো যাচ্ছে না।
খাওয়া-দাওয়ার পর আবার বেরিয়ে পড়ল বিনয়রা। তিনদিনের মধ্যে শাদিপুরের কাজটা শেষ করতে হবে। রোজ যোলা-সতেরোটা ফ্যামিলির কাছে যেতে না পারলে তা সম্ভব নয়।
সন্ধে পর্যন্ত একের পর এক কোয়ার্টারে ঘুরে এই বিচিত্র পরিবারগুলি সম্পর্কে তথ্য জোগাড় করল বিনয়। নকুল বিশ্বাস প্রতিটি পরিবারের বেশ কয়েকটা করে ছবি তুলল। তারপর সবাই বিশ্বজিৎ রাহার বাংলোয় ফিরে গেল।
.
তিনটে দিন কেটে গেল।
এর মধ্যে শাদিপুরের প্রায় পঞ্চাশটা ফ্যামিলির মানুষজনের সঙ্গে কথা বলেছে বিনয়। তার মনে হয় পোর্টব্লেয়ারের এই ছোট্ট মহল্লাটায় না এলে ভারতবর্ষের এক বিস্ময়কর এলাকা এবং তার বাসিন্দারা তার অজানা থেকে যেত।
শাদিপুর নানা দিক থেকে বিনয়ের ভাবনাচিন্তাকে প্রবলভাবে ঝাঁকুনি দিয়ে গেছে। বঙ্গোপসাগরের এই বিচ্ছিন্ন, সৃষ্টিছাড়া দ্বীপপুঞ্জে অখণ্ড ভারতের পেশোয়ার থেকে বর্মা মুল্লুক পর্যন্ত সুবিশাল অঞ্চলের যে সব পুরুষ এবং নারী কয়েদিরা ‘কালাপানি’র সাজা খাটতে এসেছে তারা ধরেই নিয়েছিল বাকি জীবনটা তাদের এখানেই ক্ষয়ে ক্ষয়ে বরবাদ হয়ে যাবে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।