বজরঙ্গী বলল, ‘হাঁ হাঁ, জরুর। আপনি যখন বলছেন, জবাব দেব না? কী জানতে চান ইনি?’
‘ওর কাছ থেকেই শোন। শেখরনাথ বিনয়কে বললেন, ‘শুরু কর–’
বিনয় পকেটে থেকে একটা নোটবই আর পেন বের করে মা-লিনকে দিয়ে আরম্ভটা করল, ‘আপনি কত বছর আগে ‘কালাপানি’ এসেছিলেন?
মা-লিন বলল, ‘কবে এসেছিলাম তা কি আর মনে আছে? হোগা লগভগ তিশ পয়তিশ সাল।‘
‘কালাপানি আসতে হল কেন?’
‘দা দিয়ে এক হারামখোরের মুণ্ডি নামিয়ে দিয়েছিলাম, তাই। বর্মা মুল্লুকের দা কেমন হয় জানেন। কি বাবুজি? দুদিকেই ধার। সিরিফ (স্রেফ) একবারই চালিয়ে ছিলাম। ব্যস, জানবরটার মুণ্ডি উড়ে গেল।‘
‘খুন করতে গেলেন কেন?’
‘করব না? মা-লিনের মঙ্গোলিয় চোখ দুটো থেকে এক ঝলক আগুন যেন ঠিকরে বেরিয়ে এল। সে এক নিঃশ্বাসে তার জীবনের পুরনো ইতিহাস বলে গেল। আন্দামান আসার আগে তার একটা বিয়ে হয়েছিল, তার ঘরবালা লোকটা খারাপ ছিল না। দিল আচ্ছাই থা। লেকিন ছিল নেশাখোর। চণ্ডু খেত, চরস খেত। নেশা তো সবাই করে। লেকিন একটা বড় দোষ ছিল জুয়া। জুয়া খেলতে বসলে আর হোঁশ থাকত না। এই জুয়ার আড্ডাতেই তার এক ভারী দুশমন ছিল। কোনও দিনই তার ঘরবালার সঙ্গে পেরে উঠত না। হেরে ফতুর হয়ে যেত। অনেকদিন গুত্সা পুষে রেখেছিল হারামির ছৌয়াটা (বাচ্চাটা)। এক রোজ তারা রাত্তিরে ঘুমোচ্ছে, দুশমনটা তাদের কাঠের বাড়িতে আগ (আগুন) লাগিয়ে দিল। সেই আগে ঘরবালা পুড়ে পুড়ে মরে যায়। মা-লিন কোনও রকমে বেঁচে যায়। কিন্তু স্বামীর দুশমনকে সে ছাড়েনি, দিনের বেলায় তাদের গাঁও-এর শ’খানেক মানুষের সামনে দা চালিয়ে লোকটাকে শেষ করে দেয়। জনতা তাকে ধরে পুলিশ চৌকিতে নিয়ে যায়। তারপর আদালত, ফাঁসির ফান্দাতেই ঝুলতে হত, জেনানা বলে হয়তো জজসাহিব মেহেরবানি করে কালাপানি পাঠিয়ে দেয়। জিন্দেগির বাকি পাঁচিশ সাল তাকে এই জাজিরাতেই (দ্বীপেই) কাটাতে হবে। এক সাল সাউথ পয়িন্ট জেনানা ফাটকে কাটানোর পর বজরঙ্গীর সাথ শাদি হল। নয়া ঘর-গিরস্থি হল।
একটানা বলার পর থামল মা-লিন। বিনয় জিগ্যেস করল, ‘বর্মায় কোথায় আপনাদের দেশ ছিল?’
‘পোগো টোনের (টাউনের) নাম শুনেছেন?’
‘শুনেছি।‘
‘ওহি টৌন থেকে লগভগ’ বিশ ‘মিল’ (মাইল) দূরে এক গাঁওয়ে।‘
‘গাঁওটার কথা মনে আছে?’
‘থোড়া গোড়া। পুরা ইয়াদ নেহি। কত সাল আগে চলে এসেছি! কতটুকু আর মনে থাকবে!’
‘আপনার পুরনো শ্বশুরবাড়িতে কেউ নেই?’
‘ছিল এক বুড়া শ্বশুর আর সাস (শাশুড়ি)। তারা এতদিনে কি আর বেঁচে আছে।‘
‘আপনার বাপের বাড়ি শ্বশুরবাড়ি থেকে কত দুরে?’
‘বেশি দূরে নয়। নজদিগ। পাশের গাঁওয়ে!’
‘সেখানে কে কে আছে?’
‘যখন কালাপানি হয় বাপ-মা বেঁচে ছিল। তারা এতদিনে মরে টরে গেছে। তিন ভাই আর এক বহিন আমার। তারা হয়তো বেঁচে আছে। ঠিক জানি না।‘
‘তারা আপনার খোঁজখবর নেয়নি?’
‘হত্যারা (খুনি) লড়কির কে আর খবর নেয় বাবুজি?’
‘দেশে যেতে ইচ্ছে করে না?’
‘আগে আগে দেশের জন্যে মন খারাপ হয়ে যেত। পঁয়তিশ সাল আন্দামানে কাটিয়ে দিলাম। বাকি জিন্দেগিও কাটবে। এই জাজিরাই (দ্বীপই) এখন আমার দেশ, আমার মুল্লুক। এর বাইরে আর কিছুই ভাবতে পারি না।‘
একটু চুপ করে কী ভেবে নিল বিনয়। তারপর জিগ্যেস করল, ‘বর্মার লোকজনদের বেশির ভাগই শুনেছি বৌদ্ধ। আপনিও কি তাই?’
‘হাঁ–’ মাথা সামান্য হেলিয়ে দিল মা-লিন। ‘আমি ভগেয়ান বুদ্ধের পূজা করি।‘
‘আর বজরঙ্গীজি?’
‘ও হিন্দু।‘
‘আপনি বৌদ্ধ, বজরঙ্গীজি হিন্দু–দু’জনের ধর্ম আলাদা আলাদা। এতে সমস্যা হয় না?’
‘কিসের সমস্যা! ধরম তো যার যার আপনা ব্যাপার। আমার ঘরবালা কালীমন্দিরে যায়, হনুমান। মন্দিরে যায়। আমি যাই ফুঙ্গি চাউঙে (বৌদ্ধ মন্দিরে)। শাদিপুরে ফিরে এসে আমি ওর ঘরবালী, ও আমার ঘরবালা। কোই মুশকিল নেহি—’
‘আপনার ছেলেমেয়েদের তো দেখছি না?’
‘তারা ইস্কুলে গেছে। ফিরতে ফিরতে বিকেল।
হঠাৎ একটা প্রশ্ন ফস করে মুখ থেকে বেরিয়ে এল বিনয়ের।–’আপনি বৌদ্ধ, বজরঙ্গীজি হিন্দু। আপনার ছেলেমেয়েরা তা হলে কী?’
মা-লিন বলল, ‘ওরা এখনও ছোট। একজনের উমর পন্দ্র, আরেক জনের সাড়ে তেরো। বড় হয়ে ওরা কোন মন্দিরে যাবে সেটা ওদের পসন্দ। চাই কি মসজিদ কি গির্জাতেও যেতে পারে। আমাদের আপত্তি নেই। ওই যে বললাম, ধরম আপনা আপনা–’
নকুল বিশ্বাসকে বলা ছিল, সেই মতো শাদিপুরে আসার পর থেকে সমানে ছবি তুলে চলেছে। মা-লিন আর বজরঙ্গীর ঘরে ঢুকেও ক্যামেরা থামেনি, সমানে ক্লিক করে যাচ্ছে।
এবার বজরঙ্গীর দিকে তাকাল বিনয়।–’আপনি ইন্ডিয়ার কোন এলাকা থেকে এসেছেন?’
বজরঙ্গী বলল, ‘বিহার। জিলা গয়া, গাঁও ভোগবানি।‘ বিনয়ের নানা প্রশ্নের উত্তরে বজরঙ্গী অকপটে জানাল, সে ছিল গয়া জেলার এক দুর্ধর্ষ ডাকাতদলের সর্দার। তার নামে সমস্ত অঞ্চল ভয়ে তটস্থ হয়ে থাকত। কত পয়সাওলা লোকের বাড়িতে মধ্যরাতে সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে হানা দিয়ে সোনাদানা, হিরে-জহরত, নগদ টাকা লুটেছে, লুটে বাধা দিলে ধারালো দায়ের কোপে কতজনের মাথা নামিয়ে রক্তস্রোত বইয়ে দিয়েছে তার লেখাজোখা নেই।
বজরঙ্গীদের আস্তানা ছিল এক গভীর জঙ্গলে। লুটপাটের পর দলবল নিয়ে সে সেখানে ঢুকে যেত। পুলিশ অনেক চেষ্টা করেও তাদের হদিশ পায়নি। এই নিয়ে সরকারের উঁচু মইলে হইচই শুরু হয়ে গেল। যেমন করে হোক, জিন্দা বা মুর্দা-বজরঙ্গীকে পাকড়াও করতেই হবে। একটা হত্যারা (খুনি) ডাকু তার দল নিয়ে অবাধে লুটতরাজ চালিয়ে যাচ্ছে, এটা আংরেজ সরকারের পক্ষে বিরাট বদনাম। মুখে চুনকালি লাগিয়ে দেবার মতো ব্যাপার। নিরুপায় হয়ে সরকার হাজারে হাজারে ইস্তাহার ছাপিয়ে গয়া জেলায় বিলি করল। যে বা যারা বজরঙ্গীকে ধরে দিতে বা তার সন্ধান দিতে পারবে, নগদ পঞ্চাশ হাজার টাকা ইনাম দেওয়া হবে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।