ইঙ্গিতটা ধরতে পেরেছিলেন বিশ্বজিৎ। কয়েক পলক স্থির দৃষ্টিতে বিনয়ের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তার চোখে কৌতুক ঝিলিক দিয়ে যায়। হঠাৎ শব্দ করে হেসে ওঠেন। স্বচ্ছ, নির্মল, প্রাণখোলা হাসি। হাসতে হাসতেই বলতে থাকেন, কী ভেবেছিলেন, গন্ডাখানেক আন্ডা বাচ্চা নিয়ে বেশ রসেবশে আছি? আমি একদম একা। চিরকুমার থাকব কি না, জানি না। তবে কোনও মহিলা নিয়ার ফিউচারে মিসেস রাহা হয়ে আমার লাইফে আবির্ভূত হবেন, এমন সম্ভাবনা আপাতত নেই। কাকা আছেন তার কথা আপনাকে বলেছি। তিনি কনফার্মড চিরকুমার। আন্দামানের দ্বীপে দ্বীপে ঘুরে বেড়ান। রিসেন্টলি রিফিউজিরা আসতে শুরু করেছে। তাদের সঙ্গেই ইদানীং বেশির ভাগ সময়টা কাটান। পোর্টব্লেয়ারে যখন আসেন, আমার কাছেই থাকেন।
ভুবন চা দিয়ে গেল। কাপ তুলে নিয়ে বিশ্বজিৎ বলতে লাগলেন, ‘অবশ্য আমার মা, দুই বোন আর এক ভাই কলকাতার বরানগরে থাকে। বছরে একবার এসে কয়েকদিন এখানে কাটিয়ে যায়। আমার বাবা নেই। এই যে বাংলোটা দেখছেন এটা পুরোপুরি ভৃত্যতান্ত্রিক। ভুবন, গোপাল, কার্তিক, আর কালীপদ দিনের পর দিন আমার সব ঝক্কি সামলায়।’
কালীপদ বিনয়ের মালপত্র আর বিশ্বজিতের অ্যাটাচিটা মাথায় কাঁধে চাপিয়ে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে এল। বিশ্বজিৎ তাকে বললেন, ‘বিনয়বাবুর জিনিসগুলো পূর্ব দিকের ঘরে রেখে অ্যাটাচিকেসটা আমার ঘরের আলমারিতে ঢুকিয়ে রাখবে।’
বিনয়ের বুকের ভেতর জোরালো কঁকুনি লাগে। বলতে যাচ্ছিল, ‘অ্যাটাচিটা এখানে থাক। রিফিউজিদের লিস্টটা দেখব’ কিন্তু বলা গেল না। ঝিনুকের জন্য সে কতটা ব্যগ্র হয়ে আছে, তার সঙ্গে ঝিনুকের সম্পর্কটা কী ধরনের সেসব বিশ্বজিৎকে জানানো যায়নি। মাত্র একদিনের পরিচয়ে জীবনের গোপন দহন কি খুলে মেলে দেখানো যায়? বিশ্বজিৎকে সে শুধু বলেছিল, ঝিনুক নামে একটি মেয়ের খোঁজ করছে। চেনাজানা কারও সম্বন্ধে জানতে চাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। সেটাকে খুব সম্ভব লঘুভাবেই নিয়েছেন বিশ্বজিৎ, তেমন গুরুত্ব দেননি। হয়তো ভেবেছেন, যখন হোক নামের তালিকা ঘেঁটে বিনয়কে বললেই হল। কিন্তু বিনয়ের এই সন্ধানের পেছনে কতখানি উৎকণ্ঠা, কতখানি ব্যাকুলতা আর আবেগ জড়িয়ে রয়েছে, তিনি বুঝবেন কী করে?
বিশ্বজিৎ এবার বললেন, ‘আমার কথা শোনালাম। জগদীশ কাকা লিখেছেন, লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তুর সঙ্গে ইস্ট পাকিস্তান থেকে আপনি ইন্ডিয়ায় চলে এসেছেন। ব্যস, এটুকুই। আপনার সম্বন্ধে, পাকিস্তানের পরিস্থিতি সম্বন্ধে খুব জানতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু রাত হয়েছে। তাছাড়া সারাদিনের স্ট্রেনে আপনি আমি দুজনেই ভীষণ টায়ার্ড। আজ থাক। পরে আপনার কথা শোনা যাবে।’
কার্তিক এসে খবর দিল বাথরুমে গরম জল দেওয়া হয়েছে।
.
খাওয়াদাওয়া চুকতে ঢুকতে বেশ রাত হয়ে গেল। বিনয়কে পুব দিকের ঘরে পৌঁছে দিয়ে দক্ষিণ দিকে নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লেন বিশ্বজিৎ।
বিনয়ের ঘরের মাঝখানে মস্ত খাট ছাড়াও রয়েছে আলমারি, ড্রেসিং টেবিল, আর্ম চেয়ার, মেঝেতে জুট কার্পেট ইত্যাদি। শিয়রের দিকে এবং ডানপাশে কাঠের দেওয়ালের গায়ে মস্ত জোড়া জানালা। পাল্লাগুলো খোলা।
ধবধবে নরম বিছানায় কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল বিনয়। দুই দেওয়ালে দুটো আলো জ্বলছিল; এক সময় নিভিয়ে দিয়ে শুয়েও পড়ে সে।
সাড়ে চার দিনের সমুদ্রযাত্রা, তার ভেতর পুরো একটা রাত সাইক্লোনের তুমুল তাণ্ডবের মধ্যে কেটেছে। আজ ‘রস’ আইল্যান্ডে নামার পর লহমার জন্যও বিশ্রাম হয়নি। কত মানুষ, কত রকমের ঘটনা, সারাক্ষণ হইচই। এসবের মধ্যে গা এলিয়ে জিরিয়ে নেবার মতো ফুরসত কোথায়?
সারা শরীরে অসীম ক্লান্তি। শোয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ার কথা। কিন্তু ঘুম আসছে না। খানিকটা সময় এপাশ ওপাশ করে উঠে পড়ল বিনয়। বিছানা থেকে নেমে শিয়রের দিকের জানলার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাঁয়ে ঘন জঙ্গলে ঢাকা মাউন্ট হ্যারিয়েটের গায়ে সেই সাদা ক্রসটা চোখে পড়ছে। ডাইনে কোনাকুনি পাহাড়ের মাথায় সেলুলার জেল। সামনের দিকে সোজাসুজি যতদূর চোখ যায় উপসাগর–সিসোস্ট্রেস বে।
পোর্টব্লেয়ার এখন একেবারে নিঝুম। কীটপতঙ্গ, সরীসৃপ বা মানুষ, কেউ জেগে নেই। কিন্তু সমুদ্র বুঝিবা কখনও ঘুমায় না। বহুদুর থেকে জ্যোৎস্নার রুপোলি তবক-মোড়া ঢেউয়ের পর ঢেউ সশব্দে আছড়ে পড়ছে পাড়ে। অবিরল। ক্লান্তিহীন। আর আছে জোরালো হাওয়া; সমুদ্র ফুঁড়ে উঠে এসে শহরের বাড়িঘর, উঁচু উঁচু ঝাকড়া-মাথা মহা মহা বৃক্ষ নাস্তানাবুদ করে দিচ্ছে।
কোনও দিকে লক্ষ নেই বিনয়ের। সমস্ত কিছু ছাপিয়ে ঝিনুকের মুখ চরাচর জুড়ে চোখের সামনে ফুটে উঠছে। এক সপ্তাহ, দু’সপ্তাহ কি আরও বেশি, যতদিন, লাক, মধ্য আন্দামানে সে যাবেই। একবার যখন দেখা গেছে, খুঁজে তাকে বার করবেই। বুঝিয়ে দেবে অপমানে, অভিমানে ঝিনুক যে নিরুদ্দেশ হয়েছিল সেজন্য সে দায়ী নয়। ঝিনুকের মানসিক যাতনা, যাবতীয় ক্লেশ আর ক্ষোভ সে ঘুচিয়ে দেবে।
ভাবতে ভাবতে আচমকা মস্তিষ্কের গোপন কুঠুরি থেকে আরও ক’টি মুখ বেরিয়ে এল। আনন্দ সুনীতি হিরণ সুধা এবং– এবং ঝুমা।
কী আশ্চর্য, খিদিরপুর ডকে একটি তরুণীর মুখে ঝিনুকের আদলটি দেখে সে উদ্ভ্রান্তের মতো জাহাজের খোলে সাড়ে চার দিন তাকে খুঁজে বেড়িয়েছে। ‘রস’ আইল্যান্ডে নামার পরও সেই সন্ধানে ছেদ পড়েনি। পাঁচ দিনেরও বেশি সময় ঝিনুকের জন্য বুকের ভেতরটা এমনই উতরোল হয়ে আছে যে আর কারও কথা মনে পড়েনি; বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ভুলে গিয়েছিল বিনয়।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।