একসময় বৈজুদের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন শেখরনাথরা। শাদিপুর কলোনির অন্য বাসিন্দারা তক্কে তক্কে ছিল। তারা এসে ছেকে ধরল। সকলেরই এক আবদার।
‘চাচাজি, বৈজুর ঘরে তো এতক্ষণ কাটিয়ে এলেন। এবার আমাদের ঘরে চলুন–’
‘না, আগে আমাদের ঘরে আগে—’
‘না, আমাদের ঘরে—’
হইচই শুরু হয়ে গেল। এদিকে অন্ধকার নেমে গিয়েছিল। কলোনির ঘরে ঘরে আলো জ্বলে উঠেছে। শেখরনাথ হয়তো ক্লান্তিবোধ করছিলেন। বললেন, ‘আজ আমাদের তোরা ছেড়ে দে। কাল পরশু তরশু–তিনদিন এখানে আসছি। তখন সবার ঘরে একবার করে যাব।‘
ফের চেঁচামেচি শুরু হল।
‘পুরা রোজ শাদিপুরে থাকবেন। আমাদের ঘরে দু’পহরে খেতে হবে।‘
‘নেহি নেহি, আমার ঘরে—’
‘চাচাজি, আমি কিন্তু ছাড়ব না।‘
দেখা গেল কেউ ছাড়তে চাইছে না। সবার ইচ্ছা তাদের ঘরে শেখরনাথরা খান। তিনি দু’হাত ওপরে তুলে নাড়তে নাড়তে ওদের থামালেন।-–’দ্যাখ, তিন দিনে যদি এতগুলো বাড়িতে খেতে হয়, স্রেফ ভেদবমি করে শ্মশানঘাটে চলে যেতে হবে। বৈজুকে কথা দিয়েছি, কাল দুপুরে তাদের কাছে খাব। জনতার দিকে তাকাতে তাকাতে তাঁর আঙুল দু’জনের ওপর স্থির হল। বললেন, ‘পরশু মুস্তাক আর তরশু রাজপালের ঘরে খাব।‘
আবার হল্লা শুরু হয়ে গেল।
‘বৈজু, মুস্তাক আউর রাজপাল আপনার বহুত প্যারা, আমরা আপনার না-পসন্দ, ক্যা?’
শেখরনাথ বিব্রতভাবে বললেন, ‘তোদের সবাইকে আমি সমান ভালবাসি। পরে এসে তোদের ঘরে একদিন একদিন করে খেয়ে যাব। রাগ করিস না।‘
অগ্নিযুগের প্রাচীন এই বিপ্লবীটি যে বঙ্গোপসাগরের বিশাল দ্বীপপুঞ্জের হৃদয় জয় করে নিয়েছেন, আগেই জেনেছিল। বিনয় আজ আবার নতুন করে দেখল।
শেখরনাথ বললেন, ‘কাল আবার আসছি। তোরা কিন্তু কোথাও যাস না। এসে যেন তোদের পাই।‘
.
৪.৭
বিশ্বজিৎ একজন ফোটোগ্রাফার ঠিক করে দিয়েছেন। এবারডিন মার্কেটে তার ফোটোগ্রাফির দোকান আছে। নাম নকুল বিশ্বাস। রোগা, পাকানো চেহারা। লম্বা ধাঁচের মুখে ব্রণ শুকিয়ে কালচে কালচে দাগ, গাল তুবড়ে বসে গেছে। চোখে নিকেলের গোল চশমা। কাঁচাপাকা চুলের মাঝবরাবর সিঁথি। পরনে ঢোলা ফুলপ্যান্ট আর গলায় বোতাম-আঁটা ফুলশার্ট, কব্জির কাছে সেটার দুই হাতাতেও বোম লাগানো। বয়স পঞ্চাশের আশপাশে।
কাল রাত্তিরে বিশ্বজিৎকে বলে দু’টো গাড়ির বন্দোবস্ত করিয়ে রেখেছিলেন শেখরনাথ। একটা গাড়ি মোহনবাঁশিকে নিয়ে হাসপাতালে চেক-আপ করাতে যাবে। বিনয় আর নকুলকে নিয়ে কালীপদর গাড়িতে শেখরনাথ যাবেন শাদিপুরে।
সকালবেলায় স্নান সেরে চা এবং খাবার খেয়ে তৈরি হতে হতে সাড়ে আটটা বেজে গেল। ততক্ষণে নকুল বিশ্বাস একটা ঢাউস চামড়ার ব্যাগে ক্যামেরা ঝুলিয়ে হাজির হল।
বাংলোর সামনে অনেকটা এলাকা জুড়ে সবুজ ঘাসের জমি। সেখানে স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে বসে ছিল কালীপদ। বিনয়রা তিনজন নিচে নেমে গাড়িতে উঠল। ফ্রন্ট সিটে কালীপদর পাশে নকুল। বিনয় আর শেখরনাথ ব্যাক সিটে।
গন্তব্য জানাই ছিল কালীপদর। সে স্টার্ট দিয়ে গাড়িটাকে ঢালু রাস্তায় নামিয়ে ডানদিকে ছুটিয়ে দিল।
খানিকটা যাওয়ার পর বিনয় জিগ্যেস করল, ‘কাকা, শাদিপুরে সব সুন্ধু কতগুলো ফ্যামিলি আছে?’
একটু ভেবে শেখরনাথ বললেন, ‘পঞ্চাশ-একান্নটা তো হবেই।‘
মনে মনে অঙ্ক কষে নিল বিনয়।–’রোজ মিনিমাম, সতেরো আঠারোটা ফ্যামিলির লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে পারলে তিনদিনে পুরো শাদিপুর কভার করা যাবে। কাজটা বেশ ডিফিকাল্ট।‘
শেখরনাথ সামান্য হাসলেন শুধু।
মিনিট পঁচিশেকের মধ্যে গাড়ি শাদিপুর পৌঁছে গেল।
আগের দিনের মতোই দুই ব্যারাকের মাঝখানে ফাঁকা জায়গাগুলোতে এলাকার বাসিন্দাদের জটলা। কাল শেখরনাথ তাদের বলে গিয়েছিলেন, তাই আজ আর কেউ মহল্লা ছেড়ে দূরে কোথাও যায়নি।
সবাই এসে শেখরনাথদের ঘিরে ধরল। কালকের মতোই তারা সবাই তাকে নিজেদের ঘরে নিয়ে যেতে চায়।
শেখরনাথ বললেন, ‘যে যার ঘরে যা। আমরা সবার কাছেই যাবো। এসো নকুল, এসো বিনয়– তিনি শুরুটা করলেন ডানধারের ব্যারাকটা দিয়ে। ভিড়ের ভেতর লম্বাচওড়া তাগড়াই চেহারার একটা লোক, বয়স ষাটের কাছাকাছি, আর একজন মাঝবয়সি মেয়েমানুষ দাঁড়িয়ে ছিল, তাদের বললেন, ‘চল, তোদের ঘরে আগে যাই—’
লোকটা এবং মেয়েমানুষটি যেন হাতে আকাশের চাঁদ পেয়ে গেল। বলল, ‘আইয়ে আইয়ে চাচাজি। বিনয়দেরও খুব সমাদরের সুরে ডাকল, ‘চলিয়ে চলিয়ে—’
বিনয় লক্ষ করেছে, মেয়েমানুষটির মুখে মোঙ্গলিয় আদল। সে নিশ্চয় বর্মীই হবে।
ওরা দু’জনে শেখরনাথদের নিয়ে ডানপাশের ব্যারাকের উত্তর দিকের একটা ঘরে খুব খাতির করে বসাল।
মেয়েমানুষটি বলল, ‘চাচাজি, আপনারা বসুন। আমি চায়-পানি আর নাস্তা বানিয়ে নিয়ে আসি।‘
‘তোকে ব্যস্ত হতে হবে না। আমরা সে সব চুকিয়েই এসেছি।’ শেখরনাথ মেয়েমানুষটি এবং লোকটির হাত ধরে দু’টো মোড়ায় বসিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আগে তোদের পরিচয় করিয়ে দিই। এর নাম বিনয়, কলকাতা থেকে এসেছে। আর নকুলকে তোরা নিশ্চয়ই দেখেছিস?’
‘হাঁ, হাঁ—’ পুরুষ এবং মেয়েমানুষটি একসঙ্গে বলে উঠল, ‘উনি ফোটো খিচেন। হাবরাডিন (এবারডিন) মার্কিটে দুকান আছে।‘
শেখরনাথ এবার বিয়ের দিকে ফিরলেন।–এরা হল বজরঙ্গী আর মা-লিন। স্বামী-স্ত্রী। তাঁর চোখ ফের বজরঙ্গীদের দিকে।’ইনি পত্রকার, কলকাতার একটা খবরের কাগজে কাজ করেন। তোদের সঙ্গে আলাপ করতে এসেছেন। যা যা জিগ্যেস করবেন তার জবাব দিবি।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।