‘বৈজু বেশ তারিফের সুরে বলেছে, ‘বাহাদুর লড়কি তুমি, দুই মুণ্ডি নামিয়ে এসেছ। আমি ইউ পি-বালা। আমার ঘর বনারসসে পচাশ ‘মিল’ তফাতে। তোমার জিন্দেগি আর আমার জিন্দেগি মোটামুটি একরকম। আমার বোনের ইজ্জৎ নিয়েছিল তিন শুয়ারকা বাচ্চা। আমি তাদের খতম করে সিধা থানায় চলে গিয়েছিলাম। আদালতে মামলা উঠলে জজসাহিব আমাকে ‘কালাপানি’ পাঠাল। পুরা পঁচিশ সালের জন্যে কয়েদ খাটতে। ব্যস—’
‘সোমবারী বলেছে, তোমাকে আমার পসন্দ হয়েছে। লেকিন ইয়াদ রাখবে আমি দুই মুণ্ডি নামিয়ে ‘কালাপানি এসেছি। যখন তখন হাতিয়ার চালাতে পারি।’
‘বৈজুর পৌরুষে বোধ হয় খোঁচা লেগেছিল। নাক সিঁটকে বলেছে, ‘আরে ছোড়, অমন হাতিয়ার বালি অনেক দেখেছি। আমিও তিন মুণ্ডি নামিয়ে এখানে এসেছি। তোর থেকে একটা বেশি।’
.
নিজেদের প্রথম দর্শনের ইতিহাস জানিয়ে বিনয় আর শেখরনাথের দিকে তাকাল বৈজু। হেসে হেসে বলল, ‘এরপর পুলিশসাহিবরা আরও চার দফে আমাদের দেখা করিয়ে দিয়েছিল। তারপর পুছল, ‘শাদি করতে তোরা রাজি?’ সোমবারীর সাথ আমার সমঝোতা হয়ে গেছে। শির হেলিয়ে বললাম, ‘পুরা রাজিবাজি অফসরসাহিব।‘ তারপর রেজিস্টারি করে সরকারি কাগজে অঙ্গুঠার ছাপ মেরে মারিজ হয়ে গেল। শাদিকা বাদ আমাদের আর কয়েদখানায় থাকতে হয়নি। এই শাদিপুরে পাঠানো হয়েছিল। আমাকে সরকারি নৌকরি দেওয়া হয়েছিল পিডাব্লুড়ি’তে। যে কয়েদিরা পুটবেলারের (পোটব্লেয়ারের) সড়ক বানাত তাদের হাজিরা, তারা কামকাজ ঠিক করছে কি না, সব দেখতে হত। নজরদারির কাম। তার জন্যে তলব (মাইনে) পেতাম। ঘর সামলাত সোমবারী।‘
শেখরনাথ হাসতে লাগলেন, ‘বন্দুকের নলের সামনে দাঁড়িয়ে তোদর প্রথম দেখা, তারপর বিয়ে। এমন রোমাঞ্চকর বিয়ের কথা পৃথিবীর কেউ কোনওদিন শোনেনি। বিয়ে একটা করেছিলি বটে তোরা—’
বৈজু আর সোমবারীও হেসে ফেলল। বৈজু বলল, ‘কালাপানি এক আজব দুনিয়া। এখানে আংরেজরা কত কিছুই যে করেছে! ভাইসাব আপনি তো এই জিন্দেগিতে শাদি করলেন না। করলে বন্দুকের নালিয়ার (নলের) সামনে দাঁড়িয়ে আপনাকেও করতে হত।
চিরকুমার স্বাধীনতা-সংগ্রামীটি লজ্জা পেলেন। হালকা ধমকের সুরে বললেন, ‘দূর হারামজাদা, তোর মুখে কিছুই আটকায় না।‘
আরও একচোট হাসাহাসির পর বিষণ্ণ বৈজু বলল, ‘ভাইসাব, কালাপানি এসে শাদি হল, ঘর-সংসার হল, লেকিন একটা দুখ রয়ে গেছে।‘
‘কিসের দুঃখ?’
‘সব শাদিশুধা বিয়াহী (বিবাহিত) পুরানা কয়েদির ঘরই লেড়কা-লেড়কিতে ভরে গেছে। লেকিন আমাদের ঘর পুরা ফাঁকা।‘ ছেলেমেয়ে হয়নি, সেজন্য বৈজুর বড় রকমের একটা আক্ষেপ রয়েছে।
ঘরের আবহাওয়া এতক্ষণ মজায় হাসিতে ফুরফুরে হয়ে ছিল। হঠাৎ থমথমে হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ চুপচাপ।
তারপর ভারী গলায় বৈজু বলল, ‘ভগোয়ানের ইচ্ছা নয়, তাই হয়নি। বদনসিব। ছোড়িয়ে ও বাত—’ সে আবার তার লঘু মেজাজে ফিরে গেল।
এদিকে সন্ধে নেমে আসছিল। শাদিপুরের চারপাশ ঘিরে দৈত্যাকার সব প্যাডক আর চুগলুম গাছ হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে আছে। সেগুলো ঝাপসা হয়ে যেতে শুরু করেছে।
শেখরনাথ বললেন, ‘আজ উঠি রে বৈজু। অনেকটা সময় তোদের সঙ্গে বড় আনন্দে কাটল।‘
সোমবারী বলল, ‘আজ এখানে কাল সেখানে, এক জাজিরা (দ্বীপ) থেকে আরেক জাজিরায় ঘুরে বেড়ান। আবার কবে আসবেন তার কি কিছু ঠিক আছে? আউর থোড়া কুছ টেইম (টাইম) থাকুন না। খানা পাকাই, রাত্তিরে খেয়ে যাবেন। আমরা খুব খুশ হব।‘
‘আজ আর হবে না রে সোমবারী। আগেই তো বলেছি, পরে একদিন তোর হাতের রান্না খেয়ে যাব।‘
সোমবারী কী জবাব দিতে যাচ্ছিল, তার আগেই বিনয় শেখরনাথের ঘাড়ের কাছে মুখ এনে নিচু গলায় বলল, কাকা, এখনই কি আমরা বিশ্বজিৎবাবুর বাংলোয় ফিরে যাব?
শেখরনাথ অবাক হলেন।–’হ্যাঁ। কেন বল তো?’
‘বৈজুদের বিয়েটা কিভাবে হয়েছে, এটুকুই শুধু জানা হয়েছে কিন্তু তাদের সম্বন্ধে আরও অনেক কিছু জানার আছে। তা ছাড়া শাদিপুরের পেনাল কলোনিতে আরও বহু পুরনো দিনের কয়েদি ফ্যামিলি রয়েছে। তাদের সঙ্গেও কথা বলে আরও অনেক মেটিরিয়াল জোগাড় করতে হবে। ওদের ছবিও তুলতে হবে। তা না হলে আমাদের কাগজের জন্যে লেখা তৈরি করা যাবে না।‘
শেখরনাথ বুঝলেন।–’ঠিক আছে, মোহনবাঁশিকে ডাক্তার চট্টরাজ ফিট সার্টিফিকেট না দেওয়া অবধি আমরা তো পোর্টব্লেয়ারে আছিই। কাল থেকে দিন তিনেক রোজ পেনাল কলোনিতে আসব। আশা করি, এর মধ্যে তোমার মালমশলা জোগাড় হয়ে যাবে–কী বল?’
বিনয় মাথা নাড়ল। বুঝিয়ে দিল তিন দিন যথেষ্ট।
শেখরনাথ আবার সোমবারীর দিকে ফিরলেন।–’শোন, আমরা কাল সকালে তোদের মহল্লায় আসব। পর পর তিনদিন। কাল দুপুরে তোদের এখানে খাব। রান্না করিস।‘
সোমবারী আর বৈজু প্রায় লাফিয়ে উঠল।–’আমাদের সৌভাগ (সৌভাগ্য)!’ তাদের চোখমুখ থেকে খুশি উপচে পড়ছে।
সোমবারী বলল, ‘কালই না, তিন রোজই আমাদের কাছে খেতে হবে।‘
শেখরনাথ বললেন, ‘না রে, কালকের দিনটাই শুধু। অন্যেরা তো ছাড়বে না। বাকি দুদিন তাদের ঘরে খেয়ে নেব।’
সোমবারী শুনবে না, অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাকে শান্ত করলেন শেখরনাথ।
বৈজু আর সোমবারীকে যত দেখছিল, বিস্ময়ে মন ভরে যাচ্ছিল বিনয়ের। কত আন্তরিক এরা। সহজ, সরল, অতিথিপরায়ণ। পরমাত্মীয়ের মতো ব্যবহার, ভাবাই যায় না। এরাই একদিন দুতিনটে খুন করে ‘কালাপানি’র সাজা খাটতে আন্দামানে এসেছিল, ভাবা যায়!

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।