শেখরনাথ উৎসুক সুরে জিগ্যেস করলেন, ‘তারপর?’
বৈজু বলল, ‘ইলাকায় পুরা শান্তি। ফের টিন্ডালানরা সেই লড়কিকে নিয়ে এগিয়ে এল। শিখ পাঠান চলে যাবার পর আমি এখন লাইনে বিলকুল পয়লা নম্বরে। লড়কি আমার কাছে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। এক নজর দেখেই ভাল লেগে গেল। বড়ো বড়ে আঁখে, গোরা রং, খুবসুরত–’
হঠাৎ দু’হাতে মুখ ঢেকে সোমবারী নিচু গলায় বলে, ‘চুপ কর। ভাইসাবের সামনে এসব বলতে শরম লাগছে না?’
বোঝা গেল সাউথ পয়েন্ট জেলের সেই কয়েদি মেয়েটিই সোমবারী। বৈজু হাত নাচিয়ে বলল, ‘কিসের শরম? যা সচ অই তো বলছি।’ সে একেবারে অকপট।
শেখরনাথ বললেন, ‘তাই তো বলবি। কিসের লজ্জা সোমবারী!’
শেখরনাথ এখানে আসার পর বেশ হালকা মেজাজেই আছেন। ব্রিটিশ আমলের প্রাচীন বিপ্লবীটি শুষ্ক, নীরস একজন মানুষ নন। দেশের মানুষজন, দেশের হাজার সমস্যা তাঁর ধ্যানজ্ঞান–এটাই জানত বিনয়। কিন্তু তিনিও যে রগড় করতে পারেন, রসিকতার জবাবে পালটা রসিকতা–দেখতে দেখতে অবাক বিনয়। গাম্ভীর্যের কঠিন খোলার নিচে কোথায় লুকনো ছিল এমন একটি ফধারা! সরস, সজীব, স্নিগ্ধ।
সোমবারী মুখ নামিয়ে বসে রইল।
বৈজু বলতে থাকে, ‘যে টিল্ডালানরা লড়কিকে নিয়ে আমার কাছে এসেছিল তাদের একজন তাকে পুছল, ‘পসন্দ হয়েছে? তারপর আমাকেও একই সওয়াল। জবাবে আমরা দু’জনেই শির হিলিয়ে দিলাম। আগে যেখানে মরদ কয়েদিদের বসিয়ে রাখা হয়েছিল, আমাকে সেখানে পাঠানো হল। লড়কি গেল জেনানা কয়েদিদের কাছে। নজদিগ আংরেজ অফসর বসে আছে। আমরা মরদরা চুপচাপ বসে আছি, ডরে কারও গলার নলিয়া দিয়ে আওয়াজ বেরুচ্ছে না। জেনানারা ভি বিলকুল খামোস। তিরছি নজরে সোমবারী দূর থেকে আমাকে দেখছে। আমিও তাকে দেখছি। আঁখে আঁখ মিললে সোমবারী অন্য দিকে আঁখ সরিয়ে নিচ্ছে। অ্যায়সাই চলছিল।’
একটানা বলে যাচ্ছিল বৈজু। দম নেবার জন্য কিছুক্ষণ থামল। তারপর ফের শুরু করল, ‘আমরা বসে আছি তো বসেই আছি। ‘ম্যারিজ প্যারিড’ শেষ হল আরও ঘণ্টা, সোয়া ঘণ্টা পর। সব জেনানা কয়েদিরা মরদ কয়েদিদের পসন্দ করেনি, তাদের জেনানা ফাটকের ইমারতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যে মরদরা বাতিল হয়েছিল তাদেরও সেলুলার জেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এবার আংরেজ অফসর আমাদের বলল, ‘যে মরদ যে জোনানাকে পসন্দ করেছে ওই নারিয়েল গাছগুলোর পাশে গিয়ে বাতচিত কর। সাউথ পয়েন্ট জেলখানায় তখন বহুৎ নারিয়েল গাছ ছিল। আমরা এক-এক জোড়া আলাগ আলাপ গাছের তলায় গিয়ে বসলাম। দূর থেকে আমাদের কথা শোনা যাবে না, লেকিন আমাদের ওপর নজর রাখা যাবে। সিপাহিরা আমাদের সবার দিকে বন্দুক নিশানা করে রেখেছিল। কেউ বেতমিজি বদমাশি করলে সিরিফ গোলি চালিয়ে দেবে। অনেক সাল পর মরদরা লেড়কি দেখছে তো, তাদের মাথায় শয়তান ভর করতে পারে, তাই এত নজরদারির বন্দোবস্ত। বলে সে বিনয়ের দিকে তাকিয়ে চোখ নাচাল।-–’ভাইসাব, আংরেজ আমলে কয়েদিদের শাদির ব্যাপারটা কেমন মজাদার ছিল, একবার আন্দাজ করুন। বলেই আবার সাউথ পয়েন্ট জেলের সেই দিনটির স্মৃতিতে ফিরে গেল। তো নারিয়েল গাছের নিচে বসে দু’জনেই খানিকক্ষণ গুংগা (বোবা)। তারপর আমিই শুরুয়াতটা করলাম। –’তোমার কী নাম?’
‘লড়কি বলল, ‘সোমবারী।‘
‘পুছলাম, ‘ঘর কঁহা থা?’
‘সোমবারী বলল, ‘পঞ্জাব। গুরগাঁওকা আশপাশ এক গাঁওমে—’
’ঘরে কে আছে?’
‘এক বুড়হা বাপ। আর কোঈ নেহি–’
‘হিন্দু?’
‘হাঁ। আমরা জাঠ।‘
‘তোমার মতো খুবসুরত লড়কিকে কালাপানি আসতে হল কেন?’
‘সোমবারী বলল, ‘বাপু খুব ভুগত। বহুৎ কিসিমকা বুখারে সারাদিন শুয়ে থাকত। আমাদের খেতি জমিন ছিল ষাট পঁয়ষ বিঘার মতো। বাপু জমিনে যেতে পারত না। এদিকে পড়োশিরা ছিল বহুৎ হারামি। মতলববাজ। মাঝে মাঝেই থোড়া থোড়া করে আমাদের জমিন দখল করে নিচ্ছিল। বাপু তো খাঁটিয়া থেকে উঠতে পারে না। আমি গিয়ে বলতাম, ‘অ্যায়সা মাত্ কর। পড়োশিরা আমার মতো এক লড়কিকে পাত্তাই দিত না। বলত, ‘যা, ভাগ–’ যতবার যাই আমাকে ভাগিয়ে দেয়। আমিও জাঠের মেয়ে। হর রোজ জমিন নিয়ে ঝগড়া ফ্যাসাদ বাধত। বুরা (খারাপ) জবান ছিল ওদের। খারাব খারাব গালি দিত। আমিও ছাড়তাম না। এইভাবেই চলছিল। হারামজাদেরা জমিনের দখলও নিচ্ছিল। পড়োশিরা মনে হয় পুলিশকে পাইসা (পয়সা) খাইয়ে হাত করেছে। ঠিক করলাম লড়াইটা আমাকেই করতে হবে। ওরা খুঁটি পুঁতে ওদের সীমানা বাড়াচ্ছিল রাত্তিরে। আমি রাতে জমির পাশে বসে লণ্ঠন জ্বেলে পাহারাদারি শুরু করলাম। জমিনে কেউ নামলেই হল্লা বাধিয়ে দিই। ওরা ভেগে যায়। আমি রুখে দাঁড়াচ্ছি, এতে ওরা খেপে গেল। একদিন রাত্তিরে ওরা আচানক আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তুলে নিয়ে দৌড়তে লাগল, চিল্লাবো যে তার উপায় নেই। মুখে হাত দিয়ে ঠেসে ধরে রেখেছে। লেকিন আমিও জাঠের ঘরের লড়কি। গায়ে তাকত কম ছিল না, সিনাতেও সাহস ছিল। আচানক চার পাঁচটা ঝটকা মেরে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দৌড় শুরু করেছিলাম। ওদের মতলব ছিল আমার ইজ্জৎ লুটে বিলকুল খতম করে দেওয়া। শয়তানের বাচ্চারা আমার পিছু ছাড়েনি, তবে আমাকে ধরতে পারেনি, আমি আমাদের ছোট কোঠিতে ফিরে এসেছিলাম। বাপুকে কিছু জানাইনি। লেকিন যতই সাহস থাক, মনে হচ্ছিল ওরা আমাকে ছাড়বে না, ফির হামলা চালাবে। এতগুলো মরদের সাথে একা আওরতের লড়া সম্ভব নয়। মাথায় আগুন ধরে গিয়েছিল। দুশমনগুলোকে আন্ধেরাতে চিনে ফেলেছিলাম। ঠিক করে ফেললাম ওরা ফির হামলা চালাবার আগেই ওদের খতম করব। আমাদের ঘরে একটা বড় কিরপান (কৃপাণ) ছিল, সেটা দোপাট্টার ভেতর লুকিয়ে পরদিন সুবেহ সুরুয (সূর্য) ওঠার পর বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের কোঠি থেকে সবচেয়ে নজদিগ ছিল দুই দুশমনের কোঠি। জানতাম সুবেহ ঘুম থেকে উঠে তারা খাঁটিয়ায় বসে গপসপ করতে করতে চায়-পানি খায়। বাকি দুই দুশমন থাকে গাঁও-এর শেষ মাথায়, অনেকটা দূরে। আমি আগে যাব নজদিগবালাদের কাছে, পরে দূরের দুশমনদের হিসাব চুকাব। আমি কাছের দুই হারামির কোঠি পৌঁছে গেলাম। হর রোজের মতো ওরা চায়ের গিলাস নিয়ে বসেছিল। আমাকে দেখে দু’জনেই অবাক, ভাবতে পারেনি এত সুবেহ সুবেহ তাদের বাড়ি চলে আসব। আমার আঁখ থেকে তখন আগুন ছুটছে। তাই দেখে দু’জনে ডরে গেল। চৌপায়া থেকে নেমে পালাতে যাবে, পারল না, দোপাট্টার তলা থেকে কিরপান। বের করে দু’বার চালিয়ে দিলাম। দু’টো মুণ্ডি (মাথা) কান্ধা থেকে দশ হাত তফাতে ছিটকে পড়ল। খুনে ভেসে যেতে লাগল চারদিক। একটা কাম শেষ হয়েছে, আরও দুই দুশমন বাকি। আমি তাদের কোঠির দিকে দৌড়তে লাগলাম, লেকিন পৌঁছতে পারলাম না। তার আগেই গাঁওবালিরা খুনের খবর পেয়ে হল্লা করতে করতে আমাকে এসে ধরে ফেলল। তারপর পুলিশ এল, আমাকে নিয়ে গারখানায় ঢোকাল, পরে আদালতে তোলা হল মামলা। জজসাহিব রায় দিলে আমার ‘কালাপানি’ হয়েছে। পঁচিশ সাল আন্দামান জাজিরায় (দ্বীপে) কাটাতে হবে। এই হল আমার জিন্দেগি। এবার তোমার কথা শুনি। কোথায় ঘর ছিল তোমার?’

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।