‘দুই নমুনার কথা তো শুনলেন। এরপর একে একে তিন বর্মী জেনানাকে নিয়ে আসা হল। মরদ কয়েদিদের মধ্যে পাঁচ ছে আদমি বর্মা মুল্লুকের। তারা আওরতগুলোকে পসন্দ করে ফেলল। চারদিকে উঁচা উঁচা দিবার। অন্দরে কদম রাখলেই বড় ফাঁকা ময়দান। তারপর চার-পাঁচটা ইমারত। ওগুলোতে জেনানারা থাকে। লেকিন এক ভি জেনানা দেখতে পেলাম না।‘
‘ময়দানের চারপাশ ঘিরে বহুৎ বহুৎ নারিকেল (নারকেল) গাছ। মাঝখানে বড় ছাতার তলায় কুর্সিতে তিন আংরেজ পুলিশ অফসর বসে আছে। এখানেও কমসে কম বিশ জন পুলিশ। তাদের হাতেও বন্দুক।
‘এক অফসরের হুকুমে আমরা যে মরদ কয়েদিরা দুলহনের খোঁজে এসেছিলাম তাদের পর পর কাতার দিয়ে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হল। বঙ্গালির পর পাঞ্জাবি, হিন্দুর পর মুসলমান–এইভাবে।
‘এতটা উঁচানিচা রাস্তা ভেঙে এসেছি। মাথার ওপর আসমানে সুরুষটা (সূর্য) চুলহার মতো জ্বলছে। আমরা চৌবিশ (চব্বিশ) কয়েদি দাঁড়িয়ে আছি তো দাঁড়িয়েই আছি। কমরে (কোমর) দর্দ হচ্ছে। পাও দু’টো ছিঁড়ে পড়বে মনে হচ্ছে। পসিনায় ভিজে যাচ্ছে কুর্তা। দুলহন কখন আসবে, কে জানে। ‘কালাপানি’তে শাদি করাটা সোজা ব্যাপার নয়।
‘আমার সামনের দুই, কয়েদি আস্তে আস্তে কথা বলছিল।‘
‘শাদির জরুরত নেই। চল, ভেগে যাই—’
‘তোর মাথা কি খারাপ হয়ে গেছে? ভাগতে গেলে পুলিশ সিধা গোলি চালিয়ে দেবে।‘
‘তারপর দুজনেই চুপ।
‘লগভগ দো ঘণ্টা বাদ তিন জেনানা টিন্ডালান ফটকের একটা বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে এল। সঙ্গে সঙ্গে চারদিক থেকে আমাদের দিকে বন্দুক তাক করে কড়া নজরে তাকিয়ে রইল পুলিশ। লেড়কি দেখে মরদদের কেউ যদি গড়বড় করে ফেলে সিধা গোলি তার সিনায় ঘুষে যাবে।
‘জেনানা টিল্ডালানরা যে জেনানা কয়েদিকে নিয়ে এসেছিল সে মোটি, কালা, পুরা চার হাত লম্বা। বিলকুল রাক্ষসী (রাক্ষসী) য্যায়সা। টিন্ডালানরা আমাদের একেকজনের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে করিয়ে, মরদ আওরত দু’জনকেই জিগ্যেস করছে, ‘পসন্দ হল?’ মরদ কয়েদিটি বহুৎ ডরে যাচ্ছে। জোরে জোরে মাথা ঝাঁকিয়ে জানিয়ে দিচ্ছে–পসন্দ হয়নি। এইরকম দুলহন নিয়ে কে আর ঘর করতে চায়? চব্বিশজন মরদ কয়েদিই তাকে খারিজ করে দিয়েছে। তাকে পসন্দ না করায় আওরতটা খেপে গিয়েছিল। সে আঁখ লাল করে গালি দিতে দিতে ফাটকের বিল্ডিংয়ে ফিরে গেল। ‘শালে, কুত্তা, জানবরের দল– ভাইসাব, একেই ‘ম্যারিজ প্যারিড’ বলা হত।‘
চমকপ্রদ এক আখ্যান মনোযোগ দিয়ে শুনে যাচ্ছিলেন শেখরনাথ। বেশ মজাই লাগছিল তার। লঘু সুরে বললেন, ‘ব্রিটিশ জেলাররা দেখছি রামায়ণ-মহাভারতের মতো স্বয়ম্বর সভা বসিয়ে দিয়েছিল সাউথ পয়েন্ট জেলে!’
স্বয়ম্বর-সভা ব্যাপারটা কী, বৈজু ঠিক বুঝতে পারল কি না কে জানে। তবে শেখরনাথ মাজাক ওড়াচ্ছেন, সেটা আন্দাজ করে সব ক’টা ট্যারাবাঁকা দাঁত বের করে খুব একচোট হেসে বলল, ‘তারপর শুনুন—’ নতুন উদ্যমে সে শুরু করে দেয়।–’কালী মোটি তো চলে গেল। এরপর টিন্ডালানরা এক হট্টাকট্টা আওরতকে এনে হাজির করল। গলা নেই, মুণ্ডুটা কান্ধার (কাঁধের) ওপর ঠেসে বসিয়ে দেওয়া। ওঠ দু’টো (ঠোঁট দুটো) পুড়ে পুড়ে কালচে। জরুর বিড়ি কি পিনিক যুঁকত। মনে হচ্ছিল তার গায়ে পহেলবানদের মতো তাকত। এমন লড়কিকে কে শাদি করবে? সেও নাকচ হয়ে গেল। পহেলবান এক মরদ পেল না, ইসি লিয়ে তার শিরে খুন চড়ে গিয়েছিল। চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে মরদ কয়েদিদের সেও বাপ-মা তুলে গালি দিতে দিতে ফিরে গেছে।
‘দুই নমুনার কথা তো শুনলেন। এরপর একে একে তিন বর্মী জেনানাকে নিয়ে আসা হল। মরদ কয়েদিদের মধ্যে পাঁচ ছে আদমি বর্মা মুল্লুকের। তারা আওরতগুলোকে পসন্দ করে ফেলল। জেনানারাও ওদের শাদি করতে রাজি। এইভাবে পর পর লেড়কিদের নিয়ে আসা হচ্ছে, দু’পক্ষেরই জীওন-সাথী পসন্দ হলে অংরেজ পুলিশ অফসরদের হুকুমে আলাগ আলাপ জেনানাদের একদিকে আর মরদদের অন্য জায়গায় বসিয়ে রাখা হল।’
শেখরনাথ বললেন, ‘অন্য সবার কথা তো বলছিস। তোর আর সোমবারীর কী হল?’
বৈজু হাত নাড়ে।–’থোড়েসে সবুর ভাইসাব। এবার বলছি। আমরা সেবিশ মরদ ‘ম্যারিজ সাট্টিফিট’ পেয়েছিলাম। জেনানাদের মধ্যে পেয়েছিল ত্রিশ জন। আঠারো জোড়ির (জোড়ার) বন্দোবস্তু হয়ে গেল। আমার মনমে বহুৎ দুখ। কারওকে আমার পসন্দ হচ্ছে না। যাকে ভাল লাগছে সে আবার আমাকে চাইছে না। যখন ভাবছি আমার নসিবে ঘরবালী নেই, সেই সময় টিল্ডালানরা এক লেড়কিকে নিয়ে এল। আমার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে ছিল এক পাঠান আর এক দাড়িবালা শিখ। দু’জনেই জবরদস্ত জওয়ান। এতক্ষণ ঝামেলা-ঝাট করেনি। আচানক যেন বিলকুল পাগল বনে গেল তারা। দু’জনে দুদিক থেকে লেড়কির হাত ধরে টানাটানি করতে লাগল। পাঠান বলে, ‘এ লড়কি আমার’, শিখ বলে, ‘এ লড়কি সিরিফ (স্রেফ) মেরাহি।‘ দু’জনের মধ্যে মারদাঙ্গা শুরু হয়ে গেল। আমরা যারা লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, হল্লাগুল্লা বাধিয়ে দিলাম।
‘আংরেজ অফসররা সবাই হিন্দুস্থানী বুলি জানত। একজন চার পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে দৌড়ে এল। সমানে গালি দিতে দিতে হাতের ডাণ্ডা চালাতে লাগল।–’মার মারকে হাড্ডি তোড় দুঙ্গা। মারের চোটে যখন শিখ আর পাঠানের নাকমুখ পিঠ সিনা ফেটে খুন বেরিয়ে এল তখন অফসর পুলিশ চারটেকে বলল, ‘এ দো কুত্তাকে বচ্চেকো সেলুলার জেলমে লে যাও। ডান্ডাবেড়ি চড়াকে কুঠুরিমে (সেল) বন্ধ কর, তালা ভি লাগাও। দো রোজ খানা বন্ধ।‘ হুকুম শুনে বন্দুকের কুন্দা দিয়ে ঠেলতে ঠেলতে জেনানা ফটক থেকে দুই জানবরকে (জানোয়ারকে) বের করে নিয়ে গেল পুলিশরা।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।