বিনয় বলল, ‘শুনেছি। কাকা বলেছেন—’
‘এই ‘ম্যারিজ সাট্টিফিট’ ছাড়া শাদি করা যেত না। আমি একদিন সেটা পেয়ে গেলাম। পুরা জিন্দেগির জন্যে ‘কালাপানি’ খাটতে এই জাজিরায় (দ্বীপে) এসেছি। আমাদের মতো কয়েদিদের দুলহন তো আসমান থেকে নেমে আসবে না। দেশ থেকেও জাহাজে চেপে কেউ এসে গলায় মালা চড়াবে না। তা হলে দুলহন মিলবে কোথায়? শুনলাম সাউথ পয়েন্ট কয়েদখানার কোনও জেনানাকে শাদি করতে হবে। আরও শুনলাম শাদির পর আর কয়েদখানাতে আমাকে ঢোকানো হবে না। আমাকে ঘর দেওয়া হবে, নৌকরিও পাব। তলব মিলবে। নিজের আওরতকে নিয়ে সেখানে থাকব। দিল তো বহুৎ খুশ হো গিয়া। লেকিন–’
অফুরান আগ্রহ নিয়ে শুনে যাচ্ছিল বিনয়। জিগ্যেস করল, ‘লেকিন কী?’
‘গরমিন আমাকে সাট্টিফিট দিয়েছে। শাদি না করলে যদি আংরেজ অফসররা ‘টিকটিকি’তে চড়িয়ে চাবুক মারে কি ভাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে কয়েদখানার কুঠুরিতে ঢুকিয়ে রাখে? দো রাত ভেবে ভেবে আঁখে নিদ এল না। মনে হল যা হবার তাই হবে। শাদি করব। না করলে গরমিন আমাকে ছাড়বে না। ঝুট বলব না, আমার মনেও শাদির খোয়াব ছিল।’
বলতে বলতে দম নেবার জন্য একটু থামল বৈজু। জোরে জোরে বারকয়েক শ্বাস টানল। ফের শুরু করল।-–’এতোয়ার এতোয়ার (রবিবার রবিবার) সাউথ পয়িন্ট কয়েদখানায় ‘ম্যারিজ প্যারিড’ (ম্যারেজ প্যারেড) হত।‘
বিনয় জিগ্যেস করল, ‘সেটা কী?’
‘বলছি বলছি, শুনুন না। ‘ম্যারিজ প্যারিড’-এর কথা আগে শুনেছি, লেকিন নিজের আঁখে তখনও দেখিনি, জেনানা ফাটকে মরদদের ঢুকতে দিলে তো দেখব। ঢোকা তো দূরের কথা, আধা মাইলের ভেতর কোনও মরদ-কয়েদিকে ঘেঁষতে দেওয়া হত না।–তা আমার মতো আরও বিশ-পঁচিশজন সেবার ‘ম্যারিজ সাট্টিফিট’ পেয়েছিল। ইন্ডিয়ার দূর দূর থেকে তারা কালাপানি এসেছে। বঙ্গালি, পাঠান, বর্মী, পাঞ্জাবি, বিহারি, মান্দ্রাজি–কে নেই? হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান ভি। এক এতোয়ার দু’পহরে বন্দুকবালা পুলিশরা পাহারা দিয়ে আমাদের জেনানা ফাটকে নিয়ে গেল। পায়দল। ফাটকটা ঘিরে চারদিকে উঁচা উঁচা দিবার। অন্দরে কদম রাখলেই বড় ফাঁকা ময়দান। তারপর চার-পাঁচটা ইমারত। ওগুলোতে জেনানারা থাকে। লেকিন এক ভি জেনানা দেখতে পেলাম না।
‘ময়দানের চারপাশ ঘিরে বহুৎ বহুৎ নারিকেল (নারকেল) গাছ। মাঝখানে বড় ছাতার তলায় কুর্সিতে তিন আংরেজ পুলিশ অফসর বসে আছে। এখানেও কমসে কম বিশ জন পুলিশ। তাদের হাতেও বন্দুক।
‘এক অফসরের হুকুমে আমরা যে মরদ কয়েদিরা দুলহনের খোঁজে এসেছিলাম তাদের পর পর কাতার দিয়ে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হল। বঙ্গালির পর পাঞ্জাবি, হিন্দুর পর মুসলমান–এইভাবে।
‘এতটা উচানিচা রাস্তা ভেঙে এসেছি। মাথার ওপর আসমানে সুরুষটা (সূর্য) চুলহার মতো জ্বলছে। আমরা চৌবিশ (চব্বিশ) কয়েদি দাঁড়িয়ে আছি তো দাঁড়িয়েই আছি। কমরে (কোমর) দর্দ হচ্ছে। পাও দু’টো ছিঁড়ে পড়বে মনে হচ্ছে। পসিনায় ভিজে যাচ্ছে কুর্তা। দুলহন কখন আসবে, কে জানে। ‘কালাপানি’তে শাদি করাটা সোজা ব্যাপার নয়।
‘আমার সামনের দুই, কয়েদি আস্তে আস্তে কথা বলছিল।
‘শাদির জরুরত নেই। চল, ভেগে যাই—’
‘তোর মাথা কি খারাপ হয়ে গেছে? ভাগতে গেলে পুলিশ সিধা গোলি চালিয়ে দেবে।’
‘তারপর দুজনেই চুপ।
‘লগভগ দো ঘণ্টা বাদ তিন জেনানা টিন্ডালান ফটকের একটা বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে এল। সঙ্গে সঙ্গে চারদিক থেকে আমাদের দিকে বন্দুক তাক করে কড়া নজরে তাকিয়ে রইল পুলিশ। লেড়কি দেখে মরদদের কেউ যদি গড়বড় করে ফেলে সিধা গোলি তার সিনায় ঘুষে যাবে।
‘জেনানা টিন্ডালানরা যে জেনানা কয়েদিকে নিয়ে এসেছিল সে মোটি, কালা, পুরা চার হাত লম্বা। বিলকুল রাক্ষসী (রাক্ষসী) য্যায়সা। টিল্ডালানরা আমাদের একেকজনের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে করিয়ে, মরদ আওরত দু’জনকেই জিগ্যেস করছে, ‘পসন্দ হল?’ মরদ কয়েদিটি বহুৎ ডরে যাচ্ছে। জোরে জোরে মাথা ঝাঁকিয়ে জানিয়ে দিচ্ছে–পসন্দ হয়নি। এইরকম দুলহন নিয়ে কে আর ঘর করতে চায়? চব্বিশজন মরদ কয়েদিই তাকে খারিজ করে দিয়েছে। তাকে পসন্দ না করায় আওরতটা খেপে গিয়েছিল। সে আঁখ লাল করে গালি দিতে দিতে ফাটকের বিল্ডিংয়ে ফিরে গেল। ‘শালে, কুত্তা, জানবরের দল—’ ভাইসাব, একেই ‘ম্যারিজ প্যারিড’ বলা হত।’
চমকপ্রদ এক আখ্যান মনোযোগ দিয়ে শুনে যাচ্ছিলেন শেখরনাথ। বেশ মজাই লাগছিল তার। লঘু সুরে বললেন, ‘ব্রিটিশ জেলাররা দেখছি রামায়ণ-মহাভারতের মতো স্বয়ম্বর সভা বসিয়ে দিয়েছিল সাউথ পয়েন্ট জেলে!’
স্বয়ম্বর-সভা ব্যাপারটা কী, বৈজু ঠিক বুঝতে পারল কি না কে জানে। তবে শেখরনাথ মাজাক ওড়াচ্ছেন, সেটা আন্দাজ করে সব ক’টা ট্যারাবাঁকা দাঁত বের করে খুব একচোট হেসে বলল, ‘তারপর শুনুন– নতুন উদ্যমে সে শুরু করে দেয়।’কালী মোটি তো চলে গেল। এরপর টিন্ডালানরা এক হট্টাকট্টা আওরতকে এনে হাজির করল। গলা নেই, মুণ্ডুটা কান্ধার (কাঁধের) ওপর ঠেসে বসিয়ে দেওয়া। ওঠ দু’টো (ঠোঁট দুটো) পুড়ে পুড়ে কালচে। জরুর বিড়ি কি পিনিক যুঁকত। মনে হচ্ছিল তার গায়ে পহেলবানদের মতো তাকত। এমন লড়কিকে কে শাদি করবে? সেও নাকচ হয়ে গেল। পহেলবান এক মরদ পেল না, ইসি লিয়ে তাঁর শিরে খুন চড়ে গিয়েছিল। চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে মরদ কয়েদিদের সেও বাপ-মা তুলে গালি দিতে দিতে ফিরে গেছে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।