সোমবারী হাতজোড় করে বলল, ‘নমস্তে, নমস্তে। আমরা বহুৎ খুশনসিব যে আপনি এসেছেন—’
বিনয় আগেই বৈজুর সঙ্গে মেয়েমানুষটির সম্পর্কটা অনুমান করে নিয়েছিল। সেও হাতজোড় করল।
সোমবারী উঠে পড়ল।–’চায়-পানি নিয়ে আসি। খেতে খেতে কথা হবে।‘
শেখরনাথ হাঁ হাঁ করে উঠলেন।–’চায়ের দরকার নেই। এইমাত্র আমরা খেয়ে এসেছি।‘
কে কার কথা শোনে। চঞ্চল পায়ে প্রায় উড়তে উড়তে সোমবারী বেরিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর চা, ঘরে তৈরি লাড্ড, নিমকি, ভুজিয়া-টুজিয়া নিয়ে ফিরল।–’লিজিয়ে। চাচাজি, আজ আপনাদের ছাড়ছি না। দু’পহরের খানা খেয়ে যেতে হবে। ঘরে সুরমাই আর পমফ্রেট মছলি আছে। মোরগা ভি আছে। ও হো, আপনি তো মাংস খান না। ঠিক হ্যায়, সবজি টবজি বানিয়ে দেব। আপনারা গপসপ করুন। আমি ঝটাঝট রসুই করে ফেলি।‘
সোমবারী চলে যাচ্ছিল, তাকে হাত ধরে বসিয়ে দিলেন শেখরনাথ। ব্যস্তভাবে বললেন, ‘আজ হবে না রে, তাড়াতাড়ি ফিরে যেতে হবে।
‘নেহি নেহি—’ সোমবারী জোরে জোরে মাথা ঝাঁকাতে লাগল। না খাইয়ে সে ছাড়বে না। অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাকে শান্ত করা গেল। তবে কথা দিতে হল অন্য একদিন শেখরনাথ বিনয়কে নিয়ে এসে খেয়ে যাবেন।
চা খেতে খেতে কিছুক্ষণ পুরনো দিনের স্মৃতিতে মশগুল হয়ে গেলেন শেখরনাথ, সোমবারী আর বৈজু। সেলুলার জেলে দিনগুলো কিভাবে কেটেছে তাই নিয়ে কত গল্পগাছা! কী প্রচণ্ড দাপট যে ছিল পেটি অফিসার, টিন্ডাল আর ওয়ার্ডারদের। আর ব্রিটিশ পুলিশ অফিসারদের দেখলে হাড় হিম হয়ে যেত দুর্ধর্ষ কয়েদিদের। পান থেকে চুন খসলে পুরো একদিনের খানা বন্ধু কি ‘টিকটিকি’তে চড়িয়ে চাবুক মারার হুকুম। কয়েদিরা বড় রকমের গোলমাল করলে হাতে-পায়ে ডাণ্ডাবেড়ি লাগিয়ে সলিটারি সেলে তালাবন্ধ করে রাখা হত। আরও কতরকমের নির্যাতন। সাধারণ কয়েদি হোক বা অগ্নিযুগের বিপ্লবীরা–তাদের সবাইকে রোজ নারকেলের ছোবড়া পিটে দু’সের সরু তার বা হাত দিয়ে ঘানি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পনেরো সের নারকেল কি সরষের তেল বের করতে হত। এক ছটাক কম হলে একবেলার খাওয়া বন্ধ। ইত্যাদি ইত্যাদি। বৈজু অন্যের গলার স্বরটর হুবহু নকল করতে পারে। ব্রিটিশ অফিসার, টিন্ডাল বা ওয়ার্ডাররা কে কেমন করে কথা বলত, চলাফেরা করত, নোংরা নোংরা গালাগাল দিত, খেপে গেলে তাদের চোখমুখের চেহারা কিরকম হয়ে যেত–কখনও বসে, কখনও উঠে দাঁড়িয়ে নানারকম অঙ্গভঙ্গি করে দেখাতে লাগল।
বৈজুর কাণ্ডকারখানা দেখে সবাই হাসতে থাকে। সবচেয়ে বেশি হাসছিল সোমবারী। হাসতে হাসতে তার সারা শরীর বেঁকেচুরে যাচ্ছিল। এমন যে রাশভারী শেখরনাথ, তার মুখেও হাসি। বললেন, ‘বৈজুটা একটা মহা বিচ্ছু—’
সেলুলার জেলের অন্দরমহলে কয়েদিদের জীবন কিভাবে কেটেছে আগেই জেনে গেছে বিনয়। শেখরনাথ তাঁকে খুঁটিনাটি সমস্ত বলেছেন। কিন্তু সাউথ পয়েন্ট জেলের অন্তঃপুরটা সম্বন্ধে তিনি কিছু জানাননি, বলেছিলেন, শাদিপুরে গেলে সব জানা যাবে। বিনয় বার বার সোমবারীর দিকে তাকাচ্ছিল।
শেখরনাথ বিনয়কে লক্ষ করেছিলেন। তার মনোভাব অনুমান করে সোমবারীকে বললেন, কলকাতার পত্রকার সাউথ পয়েন্ট ‘জেলের কথা শুনতে চাইছে। নে বল—’
সোমবারী হাসির তোড় কমে গিয়েছিল। একটু ভেবে যা বলল, মোটামুটি এইরকম। মরদদের ফাটক (সেলুলার জেল) আর জেনানা ফাটকের (সাউথ পয়েন্ট জেল) মধ্যে ফারাক নেই বললেই হয়। সেলুলার জেলের কয়েদিদের শুধু সেলুলার জেলেই আটকে রাখা হত না, অনেককে পুলিশ পাহারায় সকালে বাইরে নিয়ে যাওয়া হত। তাদের দিয়ে পোর্টব্লেয়ারের সড়ক বানানো, বনবিভাগ বা শিপিং ডিপার্টমেন্টের কাজ করিয়ে সূর্যাস্তের আগে আগে পাহারা দিয়ে ফের সেলুলার জেলে ফিরিয়ে আনত পুলিশের দল। কিন্তু জেনানা ফাটকের বন্দিনীদের কখনও বাইরে বেরুতে দেওয়া হত না। তফাত এটুকুই। নইলে আর সব একইরকম। তাদেরও নারকেল ছোবড়া পিটে তার এবং ঘানি টেনে তেল বের করতে হত। সাউথ পয়েন্ট জেলেও টিন্ডাল, পেটি অফিসার, ওয়ার্ডার এবং ব্রিটিশ পুলিশ অফিসার মিলিয়ে বিভীষিকার রাজত্ব।
বিনয় যেখানেই যায়, সঙ্গে পেন এবং নোটবই থাকে। সোমবারীর কথাগুলো সে টুকে টুকে নিচ্ছিল।
একসময় সোমবারী চুপ করল।
একটু নীরবতা।
তারপর শেখরনাথ বললেন, ‘আমি হয়তো তোদের এখানে দু-একদিন পরে আসতাম। বিনয়ের জন্যে আজই আসতে হল। ও তোদের কাছে একটা ব্যাপার জানতে চায়। সেটা আমার ভাল জানা নেই। তাই বলতে পারিনি। তোরাই বল—’
বৈজু বলল, ‘হাঁ হাঁ চাচাজি, কী ব্যাপার বলুন—’
‘বিনয় জানতে চায় আন্দামানে ইংরেজ আমলে মেয়ে-কয়েদিদের সঙ্গে পুরুষ-কয়েদিদের কীভাবে শাদি হত।’
বৈজু কথা বলতে ভীষণ ভালবাসে। উৎসাহে তারা চোখ জ্বলজ্বল করতে থাকে। বলল, ‘এ হি বাত! চাচাজি গরমিনের (গভর্নমেন্টের) যেসব কানুন মেনে সোমবারীকে আমি শাদি করেছি, অন্য কয়েদিদেরও সেইভাবেই হয়েছে।‘
শেখরনাথকে বেশ উৎসুক দেখাল। এই ধরনের বিয়ের ব্যাপারটা তার প্রায় অজানা। বললেন, ‘তোদের শাদির কথাটাই শোনা যাক—‘
বৈজু বিনয়ের দিকে তাকাল।-–’ভাইসাব, আপনি কি জানেন, কালাপানির মরদ-কয়েদিরা যদি ঢাই সাল (আড়াই বছর) ঝামেলা-ঝঞ্জাট না করত, জেলখানা থেকে তাদের ‘ম্যারিজ সাট্রিফিট’ (সার্টিফিকেট) দেওয়া হত, আর জেনানাদের বেলা টেইম (টাইম) আরও কম। সিরিফ (স্রেফ) এক সাল।‘

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।