শেখরনাথের গলার স্বর ফের শোনা গেল।–’তোমাকে সেদিন বলেছিলাম না, পুরুষ কয়েদিরা সেলুলার জেলে আড়াই বছর শান্তশিষ্ট হয়ে থাকলে, জেলের আইন না ভাঙলে, তাদের ম্যারেজ সার্টিফিকেট দিত জেল অথরিটি। মনে পড়ছে?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ–’ বিনয় মাথা কাত করল।
‘আর মেয়ে-কয়েদিরা যদি একবছর ঝামেলা-ঝঞ্ঝাট না বাধাত তারাও এলিজিবল ফর ম্যারেজ। তাদেরও ম্যারেজ সার্টিফিকেট দেওয়া হত। পুরুষ কয়েদিদের মধ্যে বিয়ের অনুমতি যাদের দেওয়া হত তারা এই সাউথ পয়েন্ট জেলখানা থেকে স্ত্রী-রত্ন লাভ করত। কোনও খরচ-খরচা নেই, একেবারে মুফতে সারা জীবনের জন্য একটা রমণীকে পাওয়া যেত।’ বলে হাসতে লাগলেন শেখরনাথ।
বিনয় অবাক। ব্রিটিশ আমলের এই বিপ্লবীটিকে খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে তার। সাদাসিধে, সহৃদয়, অকপট। তাকে ঘিরে প্রবল এক ব্যক্তিত্বও রয়েছে। কিন্তু দেশ ছাড়া তার ভাবনায় আর কিছুই নেই। সদ্য তরুণ, শেখরনাথ একদিন ভারতের স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। মৃত্যুভয়কে গ্রাহ্য করেননি। স্বাধীনতা এল ঠিকই। কিন্তু লক্ষ লক্ষ মানুষকে নিজেদের ভিটেমাটি থেকে উৎখাত করে যা পাওয়া গেল তার নাম কি স্বাধীনতা? সেই যে উনিশশো কুড়িতে ‘দ্বীপান্তরী’ সাজা নিয়ে সেলুলার জেলে এসেছিলেন তারপর আর দেশের মূল ভূখণ্ডে ফিরে যাননি। পুনর্বাসনের জন্যে যে ছিন্নমূল মানুষদের আন্দামানে পাঠানো হচ্ছে তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। শুধু কি পূর্ব পাকিস্তানের শরণার্থী? এই দ্বীপপুঞ্জে যেখানে যত বিপন্ন মানুষ তাদের পাশেও শেখরনাথ। দেশ আর দেশের মানুষ ছাড়া অন্য কোনও দিকে তাকানোর সময় নেই। ইচ্ছাও নয়। সেই বিপ্লবীটিই যে আন্দামানের কয়েদিদের বিয়ে নিয়ে এমন মজা করতে পারেন, কল্পনাও করা যায় না।
বিনয়ও হেসে ফেলল।–-‘কিন্তু—’
‘কী?’
‘এদের বিয়েটা হত কিভাবে?’
‘সেটা বৈজু আর গিন্নি সোমবারীই বলতে পারবে। চল, আমাদের নেক্সট ডেস্টিনেশন শাদিপুর—’
বিনয়ের মনে পড়ল, শাদিপুরেই থাকে বৈজুরা। দু’জনে টিলার মাথা থেকে নেমে এসে জিপে বসল। শেখরনাথ কালীপদকে বললেন, ‘বৈজুদের ওখানে যাব।‘
পাহাড়ি রাস্তার ওপর দিয়ে চড়াই-উতরাই ভাঙতে ভাঙতে একসময় একটা পাহাড়ের ঢালে সারি সারি একতলা ক’টা কাঠের ব্যারাক চোখে পড়ল। অল্প কিছুদিন হল সেগুলোতে রং করা হয়েছে। টাটকা পেন্টের ঝাঝালো গন্ধ নাকে এল।
একটা ব্যারাকের মাঝামাঝি জায়গায় এসে জিপ থামাল কালীপদ। গাড়ির শব্দে সারা পাড়াটায় লোকজন কেউ বাইরে বেরিয়ে এল, কেউ জানলা বা দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। শেখরনাথকে দেখে তারা ভীষণ খুশি। একসঙ্গে সবাই হইচই বাধিয়ে দিল।
‘আইয়ে চাচাজি, আমাদের ঘরে আসুন–’
‘নেহি, আমাদের ঘরে আগে আসতে হবে’
শেখরনাথকে পুরনো কয়েদিরা যে কত ভালবাসে, নিজেদের কতটা আপনজন মনে করে, মুহূর্তে বুঝে গেল বিনয়। অবশ্য এর আগেও শেখরনাথের সঙ্গে যেখানেই গেছে এমন আন্তরিকভাবেই সেইসব এলাকার মানুষজন তাকে ডাকাডাকি করেছে।
বৈজু তার ঘর থেকে শেখরনাথকে দেখতে পেয়ে প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে এল। সঙ্গে খুব সম্ভব তার স্ত্রী। ভারী চেহারা, চুল কাঁচাপাকা, লম্বাটে ভরাট মুখ এই বয়সেও, রং বেশ ফর্সা, হলুদের সঙ্গে দুধ মেশালে যেমনটা দেখায়। পরনে সালোয়ার আর ঢোলা কামিজ।
মহল্লার বাসিন্দারা টানাটানি করছিল শেখরনাথকে নিয়ে। কিন্তু বৈজু আর তার সঙ্গের মধ্যবয়সিনী একরকম ছোঁ মেরেই তাঁকে তাদের ঘরে নিয়ে গেল। বিনয়কে বলল, ‘আইয়ে–চাচাজির সঙ্গে এসেছেন, বহুৎ খুশি হয়েছি।‘
পাশাপাশি দুটো ঘর, রান্নাঘর, চান করার ঘেরা জায়গা–এটুকুই চোখে পড়ল বিনয়ের। আন্দাজ করে নিল অন্য সব বাসিন্দাদের জন্যও একইরকম বাসস্থানের ব্যবস্থা। প্রতিটি ব্যারাকে পাশাপাশি এরকম দু-কামরার পঁচিশ-তিরিশটা করে ইউনিট। একটা ইউনিট মানে একটা ফ্যামিলি। এখানে সাত-আটটা ব্যারাক। প্রতিটি ব্যারাকের পর অনেকটা ফাঁকা জায়গা রেখে আর-একটা ব্যারাক। এইভাবে সেগুলো তৈরি করা হয়েছে।
বৈজু একটা ঘরে এনে শেখরনাথ আর বিনয়কে বসাল। এখানে কাঠের ভারী ভারী আসবাব। চেয়ার, টেবিল, গদি-আঁটা ক’টা মোড়া, ধবধবে চাদরে-ঢাকা নিচু তক্তপোশ, ইত্যাদি। বোঝাই যায় এটা বাইরের ঘর। লোকজন এলে এখানে বসানো হয়।
বৈজু আর মাঝবয়সিনীটি মোড়া টেনে এনে শেখরনাথের কাছাকাছি বসল। মেয়েমানুষটি একেবারে ঝড় বইয়ে দিতে লাগল।–’চাচাজি, সেদিন এসে আমার ঘরবালা বলল, আপনার সাথ বড় কয়েদখানায় (সেলুলার জেল) তার দেখা হয়েছে, আপনি বলেছেন আমাদের এখানে আসবেন। হর রোজ ভাবি আপনাকে দেখতে পাব। আপনি আসেনই না। মনমে বহুৎ দুখ হুয়া, হোড়া গুসা ভি। আর দো-এক রোজ দেখে সিধা রাহাসাহাবের বাংলায় চলে যেতাম।’
‘রাগ করিস না সোমবারী। একটা জরুরি কাজে আটকে গিয়েছিলাম, তাই আসা হচ্ছিল না। যেই ফুরসত পেলাম, তক্ষুনি চলে এসেছি—’ অবুঝ কিশোরীকে বোঝাবার মতো হেসে হেসে সোমবারীর মাথায় হাত বোলাতে লাগলেন শেখরনাথ।
‘কত রোজ বাদ এলেন বলুন তো? পুরা এক সাল—’
‘কী যে বলিস, তিন মাস আগেই তোদের সঙ্গে দেখা করে গেছি। বলতে বলতে কী খেয়াল হল শেখরনাথের।’ওই দ্যাখ, তোর সঙ্গে তো আলাপই করিয়ে দেওয়া হয়নি।–এ হল বিনয়, কলকাতা থেকে এসেছে, খবরে কাগজে কাজ করে। আর ও হল বৈজুর স্ত্রী।’

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।