‘কিন্তু শেষ পর্যন্ত যদি না আসা হয়?’
খুব সরলভাবেই কথাগুলো বললেন চিফ কমিশনার। কিন্তু এই আপাত সারল্যের আড়ালে অন্য কোনও ইঙ্গিত রয়েছে কি? সেটা বুঝে নেবার চেষ্টা করলেন শেখরনাথ। চিফ কমিশনারের চোখে চোখ রেখে বললেন, ‘উদ্বাস্তুদের জন্যে এই প্রোজেক্টে অন্য কিছুই করতে দেওয়া হবে না।’ তার গলার স্বর শান্ত কিন্তু দৃঢ়।
চিফ কমিশনার তাকিয়েই রইলেন।
শেখরনাথ থামেন নি।–-‘যদি উদ্বাস্তুরা এখন না আসতে পারে কিংবা যত ডিপি ফ্যামিলি আসার কথা, তারা না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তেমন হলে পাঁচ বছর, দশ বছরও। আমাদের মনে রাখতে হবে, এই মানুষগুলো স্বাধীনতার জন্যে সর্বস্ব হারিয়েছে, সবচেয়ে বেশি দাম দিয়েছে। এদের কথা সবার আগে ভাবতে হবে।’
চিফ কমিশনার আঁচ করে নিলেন শেখরনাথ ভেতরে ভেতরে খুবই উত্তেজিত এবং অসন্তুষ্ট। তাকে শান্ত করতে চাইলেন।–-‘গভর্নমেন্ট এখনও অন্য কিছুই ভাবেনি। আপনার টেনশন করার কারণ নেই। প্রোজেক্টের কাজ যেমন চলছে তেমনই চলবে।’
শেখরনাথ বললেন, ‘চললেই ভাল। কিন্তু উদ্বাস্তুদের স্বার্থে যদি আঘাত লাগে, আমাকে কিন্তু প্রতিবাদ করতেই হবে। সেটা কিভাবে করব ভেবে রেখেছি। আচ্ছা, আজ চলি–’
চিফ কমিশনার উত্তর দিলেন না। শেখরনাথকে বাইরের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন।
.
সূর্য মাথার ওপর আকাশের মাঝখানে উঠে আসার আগেই ফিরে এলেন শেখরনাথ। বিনয় উৎসুক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। কিন্তু চিফ কমিশনারের সঙ্গে তার কী কথাবার্তা হয়েছে তার বিন্দুবিসর্গও জানালেন না। বিনয় সাংবাদিক, যদি কিছু লিখে ফেলে, জটিলতা বাড়বে। চিফ কমিশনার খুশি হবেন না। তা ছাড়া উদ্বাস্তুদের জন্য নির্দিষ্ট জমিতে মেপলাদের যে বসানো হবে তার নিশ্চিত কোনও প্রমাণ নেই। শুধু অনুমান আর শোনা কথার ওপর মন্তব্য করা ঠিক নয়। অন্তত তার মতো দায়িত্ববান, শ্রদ্ধেয় একজন মানুষের পক্ষে।
শেখরনাথ চিফ কমিশনারকে সতর্ক করে দিয়ে এসেছেন। তারপর দেখা যাক।
.
৪.৬
পরদিন বিকেলে কালীপদর জিপে বিনয়কে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন শেখরনাথ। বললেন, ‘জেলখানার তলার রাস্তা ধরে সমুদ্রের ধার দিয়ে ডান দিকে এগিয়ে যাবি।’
কালীপদ ঘাড় কাত করল, ‘আচ্ছা—’
মিনিট দশেকও লাগল না, জিপ সেলুলার জেলের তলায় পৌঁছে গেল। এখানে সেসোস্ট্রেস বে আধখানা বৃত্তের আকারে পূর্ব দিকে চলে গেছে। তার, গা ঘেঁষে বিনয়ের চেনা মসৃণ রাস্তাটাও পাশাপাশি চলছে। ঠিক উলটোদিকে ‘রস’ আইল্যান্ড।
কালীপদ জিগ্যেস করল, ‘এবার কোথায় যাব?’
‘সোজা এগিয়ে যা—’
উপসাগর যেখানে ডাইনে বাঁক নিয়ে আরও এগিয়ে গভীর সমুদ্রে মিশেছে ঠিক সেই কোণটিতে একটা মাঝারি ধরনের ন্যাড়া টিলা, ওপর দিকটা ফ্ল্যাট, গাছপালা-বাড়িঘর কিছু নেই।
শেখরনাথ কালীপদকে বললেন, ‘গাড়ি থামা—’ জিপ থামলে বিনয়কে নিয়ে নেমে পড়লেন।
বিনয় অবাক।–-‘আমাদের তো বৈজুদের বাড়ি যাওয়ার কথা। এখানে নিয়ে এলেন যে?’
শেখরনাথ হাসলেন।–-‘বৈজুদের ব্যাকগ্রাউন্ডটা জানার জন্যে এখানে আসা দরকার।’
ধন্দটা কাটছে না বিনয়ের।–-‘সেলুলার জেলেই তো বৈজু থাকত। সেটাই—’
তাকে থামিয়ে দিয়ে শেখরনাথ বললেন, ‘আমার সঙ্গে এসো। তোমার মনে যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তার জবাব পেয়ে যাবে। এসো—’
এই ন্যাড়া নির্জন টিলায় কী রহস্য থাকতে পারে বিনয়ের বোধগম্য হচ্ছে না। ওপরে ওঠার সরু আঁকাবাঁকা একটা রাস্তা রয়েছে। শেখরনাথের পিছু পিছু বিনয় টিলার মাথায় উঠে এল। প্রায় সমতল জায়গাটা অনেকখানি এলাকা জুড়ে।
শেখরনাথ বললেন, ‘এখানে এক সময় কী ছিল, ভাবতে পার?’
ডাইনে-বাঁয়ে আস্তে আস্তে মাথা নাড়ল বিনয়–তার জানা নেই।
‘এখানেই ছিল সাউথ পয়েন্ট জেল। সেলুলার জেলের মতো অতটা না হলেও এটাও কম ভয়ঙ্কর জায়গা ছিল না।‘
সাউথ পয়েন্ট জেলের নামটা শোনা শোনা। একটু ভাবতেই চট করে মনে পড়ে গেল বিনয়ের। এটাই ছিল একসময় মেয়েদের কয়েদখানা। তার সারা শরীরে শিহরন খেলে গেল।
শেখরনাথ লঘু সুরে বলতে লাগলেন, ‘বুঝলে বিনয়, মেয়েরাও কম যায় না। বৈজুদের মতো মহাপুরুষেরা দু-চারটে খুন করে সেলুলার জেলে চালান হয়ে আসত, তেমনি সেই নর্থ-ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্স থেকে বার্মা পর্যন্ত আন-ডিভাইডেড ইন্ডিয়ার নানা অঞ্চল থেকে মহামানবীদের কালাপানির এই জেলাখানায় নিয়ে আসা হত। এদের লাইফ হিস্ট্রিও খুবই গ্লোরিয়াস। কেউ দু-তিন জনের মাথা না নামিয়ে এখানে আসেনি। বলে হাসতে থাকেন।
বিনয় শুনতে লাগল। কোনও প্রশ্ন করল না।
শেখরনাথ থামেননি।–’ইংরেজদের মহত্ত্ব আছে, তারা কোনও মহিলা বিপ্লবীকে সাউথ পয়েন্ট জেলে টেনে আনেনি। খুনি মেয়ে-কয়েদিদের নিয়েই এই জেলখানা নরক গুলজার হয়ে থাকত। ইংরেজরা খুব সম্ভব নাইনটিন থার্টিতে এই জেলখানা বন্ধ করে দেয়। পরে বিশাল বিল্ডিংটা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। আন্দামানের একটা ঐতিহাসিক ল্যান্ডমার্ক চিরকালের মতো নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। শুনছি গভর্নমেন্ট অফ ইন্ডিয়া জায়গাটা ফাঁকা ফেলে রাখবে না। কী একটা অফিস বিল্ডিং টিল্ডিং তৈরির কথা ভাবছে।‘
বিনয় উত্তর দিল না। কেমন ছিল সাউথ পয়েন্ট জেলখানার অন্দরমহলটা? ভারতের নানা প্রান্ত থেকে কালাপানি খাটতে আসা অগুনতি হিংস্র খুনি মেয়ে-কয়েদিদের কাল্পনিক চেহারাগুলি ভাবার চেষ্টা করছিল সে। কিন্তু না, ছায়ামূর্তির মতো ঝাপসা কিছু ছবি স্পষ্ট আকার নিতে না নিতেই ভেঙে ভেঙে মিলিয়ে যাচ্ছিল।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।