‘আপনার সঙ্গে আমি একমত। সেরকম পরিকল্পনা গভর্নমেন্টের আছে।’
‘গভর্নমেন্টের বারো মাসে নয়, আটত্রিশ মাসে বছর। কোনও পরিকল্পনা করলে তা শুরু হতে যুগ-যুগান্তর কেটে যায়। জেফ্রি পয়েন্টের হাসপাতালটা কিন্তু ফেলে রাখা চলবে না।’
চিফ কমিশনার মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। বললেন, ‘যত তাড়াতাড়ি সেটা হয়, আমি দেখব। তবে সব কিছু আমার ওপর নির্ভর করে না। ফান্ড আসবে দিল্লি থেকে। তাদের বার বার রিমাইন্ডার পাঠাতে হবে।’
কফি জুড়িয়ে আসছিল। কয়েক চুমুকে বাকিটা শেষ করে ফেললেন শেখরনাথ। কাপটা নামিয়ে রেখে টোস্টে কামড় দিয়ে শুরু করলেন।–-‘জারোয়াদের নিয়ে একটা মারাত্মক প্রবলেম শুরু হয়েছে, তা কি আপনি জানেন?’
‘কী প্রবলেম বলুন তো—’
‘ওরা ওই অঞ্চলের জঙ্গলের আদি বাসিন্দা। থাকে উত্তর আর পশ্চিম দিকের অনেকটা এলাকা জুড়ে। জঙ্গল কেটে রিফিউজি কলোনি বসানো হচ্ছে, এটা ওরা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। একেবারে খেপে উঠেছে। বুশ পুলিশরা পাহারা দেয় ঠিকই, কিন্তু তাদের পরোয়া না করে কলোনিতে ঢুকে হামলা চালাচ্ছে।’
চিফ কমিশনারকে চিন্তিত দেখায়।–-‘হুঁ, এটা একটা বড় সমস্যাই।’
‘এই সমস্যাটা ফেলে রাখা যায় না।’
‘কিন্তু সমাধান হবে কিভাবে? আপনি কিছু ভেবেছেন আঙ্কল?’
‘ভেবেছি। ওখানে জাঙ্গল ফেলিং বন্ধ করতে হবে। অরণ্য হচ্ছে জারোয়াদের বাসস্থান। সেটা যত ছোট হতে থাকবে, ওদের ক্রোধ তত বাড়বে।’
‘কিন্তু আঙ্কল–’
শেখরনাথ তাঁর দিকে তাকালেন, কিছু বললেন না।
চিফ কমিশনার একটু ভেবে বললেন, ‘জঙ্গল না কাটলে রিফিউজি সেটলমেন্ট হবে কী? ইস্ট পাকিস্তানের হাজার-হাজার ডিপি ফ্যামিলিকে ওয়েস্টবেঙ্গল থেকে এখানে নিয়ে আসার ব্যবস্থা হয়েছে। তাদের কিভাবে চাষের আর বাড়িঘর তৈরির জমি দেওয়া সম্ভব? বহু মানুষের স্বার্থে কিছু মানুষকে তো একটু আধটু স্যাক্রিফাইস করতেই হয়।’
‘মিস্টার আয়ার, জঙ্গলের অধিকার কিন্তু জারোয়াদের। কত কাল ধরে তারা সেখানে বাস করে আসছে। তাদের উৎখাত করাটা কিন্তু অন্যায়। অবশ্য রিফিউজি সেটলমেন্টের বিষয়টা উপেক্ষা করা যায় না। এই মানুষগুলো সর্বস্ব হারিয়ে এদেশে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের জমিজমা দিতে হবে।’ শেখরনাথ বলতে লাগলেন, ‘জেফ্রি পয়েন্টের ব্যাপারে আমি চিন্তাভাবনা করেছি। এই নিয়ে বিশ্বজিতের সঙ্গে কিছু কথাও হয়েছে। আপনাকে সে তা জানিয়েছে কি না জানি না।’
চিফ কমিশনার চোখ আধবোজা করে ভাবতে লাগলেন। আস্তে আস্তে মাথা নেড়ে বললেন, ‘মনে পড়ছে না।’
‘ঠিক আছে, আমার মুখে শুনুন। জাবোয়ারা থাকে জেফ্রি পয়েন্টের উত্তর আর পশ্চিমদিকের গভীর জঙ্গলে। পুব দিকে আসে না। আপনারা এ-ধারের জঙ্গলটায় ‘ফেলিং’ করুন। বহু একর জমি পুব দিকে পাওয়া যাবে। জারোয়ারাও আর উৎপাত করবে না।’
‘কিন্তু আঙ্কল, তা কী করে সম্ভব?’
‘কেন নয়?’
‘উত্তর পুব দিকেই তো সেটলমেন্টের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সেইমতো কাজও শুরু হয়ে গেছে।’
‘এটা সামান্য বদলেও নেওয়া যায়। তাতে সেটলমেন্টের কাজ কিন্তু নির্বিঘ্নে চলতে পারে। কোনওরকম বাধা ছাড়াই।’
চিফ কমিশনারের চোখেমুখে চকিতের জন্য বিরক্তির ছায়া পড়েই মিলিয়ে গেল। সামান্য গম্ভীর গলায় বললেন, ‘আপনার কথা আমার মনে থাকবে। ভেবে দেখব—’
একটু চুপচাপ।
তারপর শেখরনাথ বললেন, ‘এবার একটা অত্যন্ত গুরুতর প্রসঙ্গে আসছি।‘
‘কী প্রসঙ্গ আঙ্কল?’
‘শুনতে পাচ্ছি, ইস্ট পাকিস্তানের রিফিউজিদের জন্যে যে সেটলমেন্ট বসানো হচ্ছে সেই জমির খানিকটা অংশ নিয়ে মালাবারীদের বসানোর একটা চেষ্টা চলছে খুব গোপনে।’
‘কে বললে?’ চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল চিফ কমিশনারের।
‘নাম শুনে কী হবে? অনেকেই বলেছে। তবে বিশ্বজিৎ এ নিয়ে আমাকে কিছু জানায়নি। সে একজন লয়্যাল অফিসার। তার মুখ দিয়ে অ্যাডমিনিস্টেশনের সিক্রেট কোনও ব্যাপার বেরুবে না। আমি এখানে সেই নাইনটিন টোয়েন্টি থেকে আছি। এই আইল্যান্ডের সবাই আমাকে চেনে, ভালবাসে। তাদের অনেকের কাছেই শুনেছি।’
চিফ কমিশনারের মুখটা থমথমে হয়ে গেল। মাত্র দু-চার লহমা। ব্রিটিশ আমলের ধুরন্ধর আইসিএস। বাইরে থেকে এঁদের মনের ভাবগতিক বোঝা যায় না। হাসি হাসি একটা মুখোশ ফিরে এল তার আসল মুখের ওপর। বললেন, ‘লোকে বানিয়ে বানিয়ে কত কী-ই তো বলে। সেসব কি বিশ্বাস করতে আছে?’
পলকহীন চিফ কমিশনারকে লক্ষ করছিলেন শেখরনাথ। উত্তর দিলেন না।
কী ভেবে চিফ কমিশনার এবার বললেন, ‘তবে একটা দুশ্চিন্তাও আছে।’
‘কিসের দুশ্চিন্তা?’ শেখরনাথের চোখেমুখে, কণ্ঠস্বরে উৎকণ্ঠা।
‘জাঙ্গল ফেলিং করে সাউথ আর মিডল আন্দামানে হাজার হাজার একর জমি রিক্লেম করা হচ্ছে। এরপর নর্থ আন্দামানেও করা হবে। ওদিকে কলকাতায় প্রচণ্ড গোলমাল। পলিটিক্যাল পার্টিগুলো, বিশেষ করে কমিউনিস্টরা রিফিউজিদের আসতে দিচ্ছে না। যদি আন্দামানে রিফিউজি মুভমেন্ট বন্ধ হয়ে যায়, এত জমি গভর্নমেন্ট নিশ্চয়ই ফেলে রাখবে না। অন্য কোনও পরিকল্পনা নিতে পারে। দুর্ভাবনা সেই কারণে।’
শেখরনাথ ব্যগ্রভাবে হাত নাড়তে লাগলেন।–-‘না না, বাধাটা টেম্পোরারি। উদ্বাস্তুরা নিশ্চয়ই আসবে।’
‘আসাই তো উচিত। তাদের জন্যেই এত বড় একটা প্রোজেক্ট।’

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।