এদিকে খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেলে স্নান করে তৈরি হয়ে নিলেন বিশ্বজিৎ। ছুটির দিন ছাড়া দুপুরে লাঞ্চটা তিনি হয় আদালতে বা রিহ্যাবিলিটেশন ডিপার্টমেন্টে তার চেম্বারে সেরে নেন। শেখরনাথ অবশ্য স্নান করলেন না, ঘরোয়া পোশাকটা শুধু বদলে নিলেন। তারা বিশ্বজিতের গাড়িতে যাবেন।
বেরুবার সময় শেখরনাথ বিনয়কে বললেন, ‘আমি ঘন্টা দেড়েকের মধ্যে ফিরে আসছি। তখন তোমাকে কোম্পানি দিতে পারব।’
বিনয় একটু হাসল শুধু। খানিকটা সময় তাকে নিঃসঙ্গ কাটাতে হবে। অবশ্য কাজের লোকেরা আছে। কিন্তু তাদের সঙ্গে কী গল্পই বা করবে!
ওদিকে মোহনবাঁশি; তার স্ত্রী জ্যোৎস্না এবং ওদের ছেলেমেয়েরাও সকালের খাবার খেয়ে তাদের ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল। মোহনবাঁশির চেক-আপের জন্য তারা কালীপদর জিপে হাসপাতালে ডাক্তার চট্টরাজের জুনিয়রদের কাছে যাবে।
প্রায় একই সঙ্গে সবাই বেরিয়ে পড়ল। বিনয় ধীরে ধীরে তার বেডরুমে ফিরে এসে ডান পাশের জোড়া জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে সেই চেনা ছবি। ছোট বড় নানা দ্বীপ, পাহাড়, জঙ্গল, ঝাঁকে ঝাকে সিগাল আর সেসোস্ট্রেস উপসাগর। কিন্তু কিছুই যেন তার চোখে পড়ছিল না। নির্জন কামরায় মাথায় আবার ঝিনুক আর অবনীমোহন ফিরে এলেন। কোনও অপ্রতিরোধ্য নিয়মে।
.
চিফ কমিশনারের বাংলোর সামনে শেখরনাথকে নামিয়ে দিয়ে বিশ্বজিৎ আদালতে চলে গেলেন। সেকেলে ওয়েস্ট এন্ড ওয়াচ কোম্পানির হাতঘড়িটা একবার দেখে নিলেন শেখরনাথ। ন’টা বেজে একুশ। তাঁর অ্যাপয়েন্টমেন্ট সাড়ে ন’টায়। তিনি আজীবন তার প্রতিটি কাজ, চলাফেরা, সব কাঁটায় কাটায় সময় মেনে চলেছেন। ক্কচিৎ কখনও তার হেরফের ঘটেছে।
বিশাল কমপাউন্ডের মাঝখানে ছবির মতো দোতলা বাংলো। পিকচার পোস্টকার্ডে এমনটা দেখা যায়।
গেটের সামনে চারজন অবাঙালি পাহারাদার। তাদের কাঁধে বন্দুক। চারজনই প্রায় একসঙ্গে বলে উঠল, ‘নমস্তে চাচাজি। নমস্তে। অন্দর যাইয়ে–
একজন বলল, ‘কমিশনার সাহাব বলেছেন, আপনি এলেই যেন অন্দরে নিয়ে যাই।
ওরা বললেই কি যাওয়া যায়? এখনও ন’মিনিট সময় দেরি। হাত তুলে হাসিমুখে পাহারাদারদের থামিয়ে দিলেন শেখরনাথ। সাড়ে ন’টা বাজতেই বললেন, ‘চল—’
একজন পাহারাদার তাকে সঙ্গে করে বাংলো পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে এল।
সাজানোগোছানো, বিশাল ড্রইংরুমে অপেক্ষা করছিলেন চিফ কমিশনার। শেখরনাথকে দরজার বাইরে দেখতে পেয়ে উঠে এলেন। সসম্ভ্রমে বললেন, ‘আসুন আঙ্কল–আসুন–’ বাঙালিদের তিনি যে কতটা পছন্দ করেন, সবসময় তা বুঝিয়ে দেন। কিন্তু এই ধুরন্ধর অফিসার বাকিটা গোপন রাখার কৌশল জানেন। মুখে হাসি ফুটিয়ে, মনে বিষের থলি লুকিয়ে রেখে আন্দামানে বাঙালি উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের যে ব্যাপক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে সেটা নানা ফিকিরে কেটেছেটে যতটা ছোট করা যায় তার মতলব আঁটছেন, এমনটাই অনেকের ধারণা। অর্থাৎ আন্দামান দ্বীপমালা আর একটা বাংলাদেশ হয়ে উঠুক, এটা তিনি চান না। তবে পরাধীন ভারতের বিপ্লবী শেখরনাথকে তিনি শ্রদ্ধা করেন। সেটা যথেষ্ট আন্তরিক বলেই মনে হয়।
চিফ কমিশনার শেখরনাথকে হাত ধরে সোফায় বসিয়ে নিজে তার মুখোমুখি বসলেন। মুখে মধুর হাসি ফুটিয়ে বললেন, ‘শরীর ভাল আছে আঙ্কল?’
শেখরনাথ বললেন, ‘আছে মিস্টার আয়ার—’
সাধারণ কিছু কথাবার্তার পর চিফ কমিশনার বললেন, ‘কী একটা আর্জেন্ট আলোচনা আছে বলেছিলেন—’
একটা ধবধবে উর্দি-পরা বেয়ারা কফি, কাজুবাদাম, আখরোট এবং ব্রেকফাস্ট হিসেবে টোস্ট ওমলেট, নানা রকম ফলটল দিয়ে গেল। নিশ্চয়ই তাকে আগে থেকে বলা ছিল।
আস্তে মাথা নাড়লেন শেখরনাথ।–-‘হ্যাঁ। সেই জন্যই আপনার মতো ব্যস্ত একজন ভি আই পি’কে বিরক্ত করা—’
সামান্য বিব্রত হলেন চিফ কমিশনার।–-‘আপনি এলে আমি কখনও বিরক্ত হতে পারি? নিন, খেতে খেতে কথা বলুন—’ নিজের হাতে কফির কাপটা শেখরনাথের হাতে তুলে দিলেন তিনি।
‘কিন্তু আপনার কফিটফি কোথায়?’
‘আমার আটটার ভেতর ব্রেকফাস্ট শেষ হয়ে যায়। এরপর একেবারে লাঞ্চ। তার দেরি আছে।’
শেখরনাথ আলত একটা চুমুক দিয়ে বললেন, ‘আপনার অধীনস্থ একজন অফিসার বিশ্বজিৎ রাহার কাকা হিসাবে আজ আমি এখানে আসিনি। এসেছি স্বাধীন ভারতবর্ষের একজন নাগরিক হিসেবে। শোনা যাচ্ছে আমাদের দেশের কনস্টিটিউশনে লেখা থাকবে এই দেশ হবে ডেমোক্রাটিক কান্ট্রি এবং প্রতিটি নাগরিকের বাক-স্বাধীনতা থাকবে। সে নির্ভয়ে মতামত প্রকাশ করতে পারবে।
চিফ কমিশনার একটু অবাক হলেন।-–’আমিও তা-ই জানি। কিন্তু এসব কথা উঠছে কেন?’
‘আমি সাহস করে জেফ্রি পয়েন্টের রিহ্যাবিলিটেশন সম্পর্কে কিছু বলতে চাই।’
চিফ কমিশনারের চোখেমুখে হালকা একটু হাসি ফুটল।-–‘আপনি ব্রিটিশ ইম্পিরিয়ালিজমের বিরুদ্ধে একসময় আমর্স হাতে তুলে নিয়েছিলেন। কারওকে ভয়টয় পান বলে তো শুনিনি। জেফ্রি পয়েন্ট নিয়ে যা বলার বলুন না। আপনি আন্দামানের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় মানুষ। আপনার মতামতকে এখানকার অ্যাডমিনিস্ট্রেশন যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়।’
‘আপনি হয়তো শুনেছেন, আমি বেশ কিছুদিন জেফ্রি পয়েন্টে রয়েছি।’
‘জানি, আপনার ভাইপো বিশ্বজিৎ রাহা আমাকে বলেছেন।’
‘ওখানে ডি পি ফ্যামিলিগুলো (উদ্বাস্তু পরিবার) প্রচণ্ড অসুবিধে আর ভয়ের মধ্যে রয়েছে। চিকিৎসার কোনওরকম বন্দোবস্ত নেই। অসুখবিসুখ হলে কিংবা কানখাজুরায় (এক ধরনের বড় বড় চেলা বিছে, এক ফুটের মতো লম্বা হয়) কামড়ালে পোর্টব্লেয়ারে এনে ভর্তি করানো যে কী কষ্টকর, বলে বোঝানো যাবে না। কোনও দরকারে যদি ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট কি রিহ্যাবিলিটেশন ডিপার্টমেন্টের মালপত্র নিয়ে ট্রাক সেখানে যায় তাতে চাপিয়ে রোগীদের পোর্টব্লেয়ারে আনা হয়, যেমন আমরা মোহনবাঁশিকে আনতে পেরেছিলাম। নইলে মৃত্যু অবধারিত। তা ছাড়া জেফ্রি পয়েন্টের আশপাশে আরও কয়েকটা রিফিউজি আর পেনাল কলোনি রয়েছে। আরও নতুন নতুন উদ্বাস্তু কলোনি বসানো হবে। মানুষজন অনেক বেড়ে যাবে। এই তো সেদিন এক উদ্বাস্তুর বাচ্চা হল, পোর্টব্লেয়ারে নিয়ে আসার মতো ট্রাক ছিল না। পাঁচটা পাহাড় পেরিয়ে অন্য একটা কলোনি থেকে ধাই নিয়ে আসতে হয়েছিল। এভাবে তো চলতে পারে না। জেফ্রি পয়েন্টে একটা হাসপাতাল বসানো খুব জরুরি। তাতে ওই কলোনিরই শুধু নয়, চারপাশের অন্য উদ্বাস্তু আর পেনাল কলোনিগুলোরও যথেষ্ট উপকার হবে।’

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।