‘চমৎকার।’ বিনয় বলতে লাগল, ‘সব চেয়ে আমার ভালো লেগেছে চিফ কমিশনারকে। আন্দামানের বিশিষ্ট বাঙালিরা। রিফিউজিদের ভরসা দেবার জন্য ছুটে যাবেন সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নন-বেঙ্গলি চিফ কমিশনার বাঙালি উদ্বাস্তুদের সম্বন্ধে এতটা সিমপ্যাথেটিক, ভাবতে পারিনি।’
চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে বিশ্বজিৎকে। তার মুখে বিচিত্র একটু হাসি ফুটে ওঠে। কী আছে সেই হাসিতে? ব্যঙ্গ? মজা? না তান্য কিছু?
কয়েক লহমা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে বিনয়। তারপর দ্বিধাগ্রস্তের মতো জিগ্যেস করে, হাসছেন যে?’
বিশ্বজিৎ বললেন, ‘লোকটার দুটো চেহারা আছে। একটা আপনি দেখেছেন।’
‘সেটা এত তাড়াতাড়ি কি বোঝা যাবে? সবে তো এলেন–’ বলতে বলতে থেমে গেলেন বিশ্বজিৎ। ধীরে ধীরে মুখটা ওধারের জানলার দিকে ফিরিয়ে আনমনা তাকিয়ে রইলেন।
বিনয় বুঝে নিল, এ নিয়ে আপাতত মুখ খুলবেন না বিশ্বজিৎ। তার মনে একটা ধন্দ ঢুকে গেল। চিফ কমিশনারকে যেটুকু দেখা গেছে তাতে বেশ ভালোই লেগেছে। অমায়িক, সহানুভূতিশীল। আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা কিন্তু লেশমাত্র অহমিকা নেই। এই সদয়, স্নিগ্ধ মুখের আড়ালে অন্য যে মুখটি লুকনো রয়েছে সেটা কেমন, অনুমান করতে চাইল বিনয়। কিন্তু বেশিক্ষণ নয়, চিফ কমিশনারের চিন্তাটা ঠেলে সরিয়ে দিয়ে ঝিনুকের মুখ চোখের সামনে ফুটে ওঠে। উদ্বাস্তুরা তাকে ছাড়তে চাইছিল না। তবু বিশ্বজিৎ তাকে যে একরকম টেনে নিয়েই তার বাংলোয় চলেছেন সেটা একদিক থেকে ভালোই হল। বিশ্বজিতের অ্যাটাচিতে উদ্বাস্তুদের নামের যে দীর্ঘ তালিকাটা রয়েছে সেটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে আজ রাতেই ঝিনুক কাদের সঙ্গে এসেছে, বার করা যাবে।
অনেকটা দৌড়ের পর একটা চৌমাথায় চলে এল বিনয়দের জিপ। কালীপদ গাড়িটা ঘুরিয়ে ডানপাশের রাস্তায় নিয়ে গেল। মোড়ের মুখেই বাঁ দিকে প্যাগোডা ধরনের বড় বিল্ডিং।
বিশ্বজিং ওধারের জানলা থেকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, ‘এটা ফুঙ্গি চাউং–বুদ্ধমন্দির। আর খানিকটা গেলেই আমার বাংলো।’
বিনয়ের মনে পড়ে গেল, ব্রহ্মদেশ ব্রিটিশ আমলে ছিল ভারতের একটি প্রদেশ। উনিশশো পঁয়ত্রিশ পর্যন্ত সেখান থেকে কয়েদিদের পাঠানো হত আন্দামানে। এদের বেশিরভাগই বৌদ্ধধর্মের উপাসক। খুব সম্ভব সেই কারণে এখানে ‘ফুঙ্গি চাউং’ গড়ে তোলা হয়েছে।
বুদ্ধমন্দির পেছনে ফেলে আরও দুতিনটে ছোট ছোট টিলা পেরিয়ে একটা অনেক উঁচু টিলার ঢালে চলে এল জিপ। নিচেই উপসাগর। বিনয় আন্দাজ করে নিল এটা সিসোস্ট্রেস বে। ‘রস’ আইল্যান্ডের দিক থেকে বেঁকে এধারে চলে এসেছে।
টিলার গায়ে বেশ কটা কাঠের বাংলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।
একটা দোতলা বাংলোর কমপাউন্ডের ভেতর জিপটা নিয়ে এসে থামিয়ে দিল কালীপদ।
বিশ্বজিৎ বললেন, ‘এই আমার আস্তানা। আসুন—’
দু’জনে নেমে পড়ল।
বাইরের দিকে ক’টা বাল জুলছিল। সেই আলোয় দেখা গেল, বাংলোর গ্রাউন্ড ফ্লোরে দু-তিনটে ঘর ছাড়া বাকি অংশটা ফাঁকা; সেখানে গাড়ি রাখার ব্যবস্থা।
একপাশ দিয়ে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি। বিনয়কে সঙ্গে নিয়ে সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে বিশ্বজিৎ কালীপদকে বললেন, ‘আমার অ্যাটাচি আর বিনয়বাবুর সুটকেস-টুটকেস ওপরে নিয়ে আয়।‘
দোতলায় উঠলেই বড় একটা হল-ঘর। কাঠের ফ্লোরে জুটের কাপেট পাতা। তার একধারে দু’সেট বেতের সোফা, সেন্টার টেবিল। আরেক পাশে ডাইনিং টেবিল এবং অনেকগুলো চেয়ার। সিলিং থেকে চারটে ফ্যান ঝুলছে। দু’পাশের দেওয়ালে ল্যাম্পশেডের ভেতর জোরালো আলো জ্বলছিল। একপাশের দেওয়াল জুড়ে কাঁচের পাল্লা দেওয়া আলমারি। সেগুলো রকমারি বইয়ে ঠাসা। হলঘরটি ঘিরে চারটে বেডরুম, কিচেন ইত্যাদি।
বিনয়দের পায়ের আওয়াজে কিচেন আর বেডরুমগুলোর দিক থেকে তিনজন বেরিয়ে এল। বয়স কুড়ি থেকে চল্লিশ বিয়াল্লিশের মধ্যে। দেখেই বোঝা যায় কাজের লোক।
একটা সোফায় বিনয়কে বসিয়ে নিজে তার পাশে বসলেন বিশ্বজিৎ। বিনয়ের সঙ্গে তিনজনের পরিচয় করিয়ে দিলেন।—এঁর কথা তোমাদের বলেছি। যতদিন আন্দামানে আছেন, মাঝে মাঝে আমাদের এখানে এসে থাকবেন। পুবদিকের বড় ঘরটায় ওঁর জন্যে বিছানা-টিছানা করে রাখা হয়েছে তো?’
তিনজনই ঘাড় কাত করে-হয়েছে।
‘রান্নাটান্না?’
ওরা জানায়, তাও হয়ে গেছে।
বিনয় বুঝতে পারে, তাকে যে এখানে নিয়ে আসবেন তা আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন বিশ্বজিৎ।
এবার কাজের লোকেদের নামগুলোও বিনয়কে জানিয়ে দেন বিশ্বজিৎ। সবচেয়ে কমবয়সি ছেলেটির নাম গোপাল, যার বয়স ত্রিশ-বত্রিশ সে কার্তিক আর বয়স্ক লোকটি হল ভুবন।
বিশ্বজিৎ ভুবনকে বললেন, ‘আমাদের জন্যে গরম চা নিয়ে এসো। আগুন আগুন। ঠান্ডা শরবত যেন না হয়ে যায়।’কার্তিককে বললেন, ‘জল গরম করে আমার আর বিনয়বাবুর ঘরের বাথরুমে দিয়ে আসবে। দেরি করো না।
কার্তিক আর ভুবন ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ঝটিতে দু’জনে ভেতর দিকে চলে যায়। নিশ্চয়ই কিচেনে। তবে গোপাল একধারে উদগ্রীব দাঁড়িয়ে থাকে, যদি তাকে কোনও ফরমাশ দেওয়া হয় তারই অপেক্ষায়।
বিনয়ের কৌতূহল হচ্ছিল। কাজের লোকেরা আছে ঠিকই, তবু বাংলোটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা। একটু ইতস্তত করে জিগ্যেস করল, ‘আর কারওকে তো দেখছি না।’

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।