‘আমার বিশেষ অনুরোধ, আমি কলিকাতা হইতে চলিয়া আসার পর যদি ঝিনুকের সন্ধান পাইয়া থাক, পত্রপাঠ তাহাকে লইয়া একবার কাশী চলিয়া আসিবে। আমি তাহার কাছে করজোড়ে ক্ষমা চাহিয়া লইব। আমার এই শেষ ইচ্ছাটুকু পূরণ করিলে হয়তো কিছুটা হইলেও শান্তি পাইব।
‘গুরুর আশ্রমে আমার অন্য একটি নামকরণ হইয়াছে। কিন্তু গৃহী জীবনের নামটি নিচে লিখিলাম।
শুভার্থী
অবনীমোহন বসু’
চিঠির এককোণে কাশীতে গুরুর আশ্রমের ঠিকানা লেখা আছে।
পড়া শেষ হলে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল বিনয়। এ কোন অবনীমোহন? সেদিন শীতের রাতে নিষ্ঠুর, হৃদয়হীন, সংস্কারগ্রস্ত যে কঠোর মানুষটিকে সে দেখেছিল তাঁর সঙ্গে এই চিঠিটি যিনি লিখেছেন তাকে একেবারেই মেলানো যাচ্ছে না। কাশীতে গিয়ে অবনীমোহনের কি জন্মান্তর ঘটে গেছে?
বাইরে সমুদ্রের তুমুল আছাড়িপিছাড়ি, ঝড়ো বাতাসের খ্যাপামি। বিনয়ের হৃৎপিণ্ডে তেমন কিছুই যেন শুরু হয়েছে।
ঝিনুককে কাশীতে নিয়ে যাওয়ার কথা লিখেছেন অবনীমোহন। আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে তার খোঁজ পাওয়া গেছে, মিডল আন্দামানে তার সঙ্গে দেখা করবে সে। অবনীমোহনের চিঠিগুলো তাকে দেখাবে। কিন্তু অপরাধবোধে বিপর্যস্ত, সন্তপ্ত একটি মানুষের ব্যাকুলতা ঝিনুককে কি আদৌ টলাতে পারবে?
আলো নিবিয়ে একসময় শুয়ে পড়ল বিনয়। কিন্তু চোখ বুজলেই কি ঘুম আসে? একবার অবনীমোহন, একবার ঝিনুক, এইভাবে দু’টো মানুষ বার বার বন্ধ চোখের ভেতর ফুটে উঠছে।
৪.০৫ কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল
৪.৫
কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল, বিনয়ের মনে পড়ে না। সকালে যখন চোখ মেলল তখনও ভাল করে রোদ ওঠেনি। কাল রাতে কুয়াশাটা একটু বেশিই পড়েছিল। ডান পাশের জোড়া জানলা দিয়ে তার দৃষ্টি চলে গেল বাইরে। সেসোস্ট্রেস বে, দূরের ছোটবড় দ্বীপগুলি কিংবা বাঁ দিকের মাউন্ট হ্যারিয়েট–কিছুই স্পষ্ট নয়। সব ঘন কুয়াশায় ঢাকা। অলীক কোনও ছবির মতো মনে হয়।
বিনয় তাকিয়ে আছে ঠিকই কিন্তু কিছুই যেন দেখছে না। ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে ঝিনুক আর অবনীমোহন ফের তার মাথায় ফিরে এসেছেন। ক’দিন আগে সেলুলার সেলের হাসপাতালের বাইরে ঝিনুকের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। কিন্তু সে তাকে চিনতেই চায়নি। একরকম অস্বীকারই করেছে। যা দু-একটা কথা বলেছে, তাও বেশ রুক্ষ স্বরে। কী চরম উদাসীন সে। ঝিনুক খুব সম্ভব বিনয়ের সঙ্গে জড়ানো তার জীবনের কয়েকটা বছরকে পুরোপুরি অস্বীকার করতে চায়। এদিকে বিনয়ের জীবনের এক মেরুতে ঝিনুক আর এক মেরুতে অবনীমোহন। আয়ুর শেষ প্রান্তে পৌঁছে তিনি ঝিনুককে শেষবারের মতো দেখতে চান। লা-পোয়ের সঙ্গে তার কথা হয়ে গেছে ঠিকই, তবু দ্বিধাটা কাটিয়ে ওঠা যাচ্ছে না। অবনীমোহনের সঙ্গে ঝিনুকের দেখা করানোটা শেষ পর্যন্ত সম্ভব হবে কিনা, কাল রাতে ভেরে ভেবে তলকূল পায়নি বিনয়, আজও পেল না। অফুরান নৈরাশ্য এবং অবসাদ চাই চাই পাথরের মতো তার শরীর আর মনের ওপর চেপে বসতে থাকে।
একসময় আকাশ যেখানে সমুদ্রের ওপর ঝুঁকে পড়েছে, সেই দিগন্ত থেকে সূর্য মাথা তুলতে শুরু করল। কুয়াশার স্তরগুলি ছিঁড়ে ছিঁড়ে দিনের প্রথম নরম সোনালি রোদ এসে পড়েছে ঘরের ভেতর। বেলা আর একটু বাড়লেই কুয়াশার চিহ্নমাত্র থাকবে না।
বিনয় উঠে পড়ল। বাথরুমের কাজ সেরে ড্রইংরুমে আসতেই দেখা গেল, বিশ্বজিৎ একটা সোফায় বসে আছেন। এখানেই একটা উঁচু টুলের ওপর টেলিফোনটা থাকে। তার পাশে বসার জন্য বেতের মোড়া। মোড়ায় বসে ফোন করছেন শেখরনাথ। নিঃশব্দে বিশ্বজিতের কাছাকাছি বসে পড়ল বিনয়।
শেখরনাথ বলছিলেন, ‘আজই আপনার সঙ্গে দেখা হওয়া দরকার। আমায় একটু সময় দিতেই হবে।…না, কাল নয়, কাইন্ডলি আজই…ব্যস্ত? আপনার মতো মানুষকে, যাঁর মাথায় অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের পুরো দায়িত্ব, সারাক্ষণ তার ব্যস্ততা তো থাকবেই।… সাড়ে ন’টায়? আপনার বাংলোতে? কোনও অসুবিধে নেই।… ব্রেকফাস্ট? মেনি থ্যাংকস, না না, তার দরকার নেই। ব্রেকফাস্ট না করলে দেখা হবে না? ঠিক আছে, আই অ্যাকসেপ্ট…আপনার সঙ্গে দেখা হওয়াটা ভীষণ জরুরি। রিহ্যাবিলিটেশনের ব্যাপারে অনেক কথা আছে। মিস্টার আয়ার, আবারও ধন্যবাদ জানাচ্ছি। তিনি ফোন নামিয়ে রাখলেন।
এতক্ষণ কার সঙ্গে কথা হচ্ছিল, শুনতে শুনতে বোঝা গেছে। শেখরনাথ আগেই বলেছিলেন, চিফ কমিশনারের সঙ্গে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করবেন। সেটাই করে নিলেন। বিনয় জানে, আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের প্রতিটি বাসিন্দা চিফ কমিশনারকে স্যার বলে থাকে, একমাত্র শেখরনাথই বাদ। তিনি বলেন, মিস্টার আয়ার। আয়ারসাহেব তাঁকে সমীহ করে বলেন আঙ্কল।
শেখরনাথ উঠে এসে বিনয়দের পাশে বসলেন। বিশ্বজিতের দিকে ফিরে জিগ্যেস করলেন, ‘তুই। আজ কখন অফিসে যাবি?’
বিশ্বজিৎ বললেন, ‘আগে কোর্টে যেতে হবে। সেখান থেকে অফিসে। নটায় বেরুব।’
‘ভালই হল। তোর গাড়িতে আমাকে চিফ কমিশনারের বাংলোর সামনে নামিয়ে দিয়ে যাস। ন’টায় বেরুলে ঠিক সময়ে পৌঁছতে পারব।’
‘কিন্তু আপনি ফিরবেন কী করে?’
‘তা নিয়ে ভাবতে হবে না। ফেরার ব্যবস্থা একটা কিছু আমি করে নিতে পারব।’
আজ ব্রেকফাস্টের জন্য ভুবন ডালপুরি, ছোলার ডাল আর আলুর দম করেছিল। সে তিনজনকে খাবার দিয়ে গেল। শেখরনাথ খেলেন না। তাঁর ব্রেকফাস্টটা চিফ কমিশনারের বাংলোস সারবেন।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।