‘কাগজ পড়ে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ, কলকাতার অবস্থা ভয়াবহ। চারিদিকে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা। কবে যে এই অস্থিরতা আর উত্তেজনা কমবে জানি না।
‘যাই হোক, তোমার রিপোর্ট এবং চিঠির আশায় রইলাম। নিজের শরীর স্বাস্থ্যের যত্ন নিও। সাবধানে থেকো।
‘ইতি, শুভার্থী প্রসাদদা।’
চিঠিটা খামের ভেতর পুরে রাখতে রাখতে বিনয়ের মনে পড়ল, ফটোগ্রাফারের ব্যাপারটা আগের একটা চিঠিতেও জানিয়েছিলেন প্রসাদ লাহিড়ি। কিন্তু জেফ্রি পয়েন্টের রিফিউজি রিহ্যাবিলিটেশনের নানা সমস্যায় এমনভাবে সে জড়িয়ে পড়েছে যে ফোটোগ্রাফার জোগাড় করায় চিন্তাটা মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। বিশ্বজিৎ রাহাই এই দ্বীপপুঞ্জে তার সবচেয়ে বড় ভরসা। কাল তাঁকে ফোটোগ্রাফারের কথাটা বলতে হবে। তিনি নিশ্চয়ই ব্যবস্থা করে দেবেন। পেনাল কলোনি নিয়ে বৈজুদের বাড়ি যাবেন, সেটা ঠিক হয়ে আছে। আশা করা যায়, সপ্তাহখানেকের মধ্যে পেনাল কলোনি নিয়ে একটা বড় লেখা পাঠানো যাবে।
এবার দ্বিতীয় ঘামটা তুলে নিজের নামটা বারকয়েক দেখে নিল বিনয়। সেটার মুখ ছিঁড়ে চিঠি বের করতে গিয়ে চমকে উঠল। খামের ভেতর একটা নয়, দু’দু’টো চিঠি। একটা সুনীতির, কিন্তু অন্য চিঠিটার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিল না বিনয়। হাতের লেখা দেখেই চেনা গেল–অবনীমোহন। তার বাবা।
নিস্পৃহ, উদাসীন যে মানুষটি নিজের সন্তান, আত্মীয়-পরিজন নিয়ে গড়ে তোলা ভূমণ্ডলটি পেছনে ফেলে বেনারসে গুরুর আশ্রমে চলে গিয়েছিলেন, সমস্ত অতীতকে মুছে দিয়েছিলেন নিজের জীবন থেকে, হঠাৎ তিনি যে ফের চিঠি লিখতে পারেন, ভাবা যায়নি।
অপার বিস্ময়ে কয়েক লহমা চিঠিটার দিকে তাকিয়ে রইল বিনয়। তারপর ধীরে ধীরে পড়তে শুরু করল।
‘কল্যাণীয়েষু,
‘বিনু, অনেকদিন তোমাদের খোঁজখবর লওয়া হয় নাই। যখন কলিকাতা ত্যাগ করিয়া কাশীধামে গুরুর আশ্রয়ে চলিয়া আসি সেই সময় স্থির করিয়াছিলাম অতীত সংসার জীবনের কোনও কিছুর সঙ্গে লেশমাত্র সম্পর্ক রাখিব না। আমি সম্পূর্ণ নিরুৎসুক এবং আগ্রহশূন্য হইয়া নূতন জীবনে মগ্ন হইয়া থাকিব। প্রাণপণে সেই প্রয়াসই চালাইয়া গিয়াছি।
‘কিন্তু অতীত আমার পিছু ছাড়ে নাই। বিগতস্পৃহ সন্ন্যাসী হইতে গেলে যে মনোবল এবং নিরাসক্তির প্রয়োজন, খুব সম্ভব আমার তাহা নাই। অতীত এবং বর্তমানের মাঝখানে আমি ত্রিশঙ্কুর মতো ঝুলিয়া আছি, বলিতে পার।
‘তোমার ঠিকানা জানা নাই, তাই সুধার ঠিকানায় কিছুদিন পূর্বে একটি পত্র দিয়াছিলাম, কিন্তু উত্তর পাই নাই। পত্রটি কেন সুধাদের বাড়ি পৌঁছাইল না, বুঝিতে পারিতেছি না। ডাকবিভাগের গণ্ডগোল কি না, কে জানে। অগত্যা সুনীতির নিকট আবার লিখিতে হইল। তাহাকে জানাইয়াছি, যেমন করিয়া পারে, অতি সত্বর এই পত্র যেন তোমার নিকট পাঠাইবার বন্দোবস্ত করে। কারণ আমি গুরুতর অসুস্থ, একপ্রকার শয্যাশায়ী বলিতে পার। আশ্রমের গুরুভাইরা আমাকে বাঁচাইয়া রাখার জন্য নিরন্তর চেষ্টা করিয়া যাইতেছেন। ডাক্তার-কবিরাজ তো আছেনই, গুরুভাইরা দিনের বেলা তো বটেই, রাত জাগিয়া সেবা-শুশ্রূষা করিতেছেন।
‘কিন্তু বুঝিতে পারিতেছি, আমার আয়ু ফুরাইয়া আসিতেছে। এই পৃথিবীতে আমি আর বেশিদিন নাই।
‘অন্তিম সময়ে মন ভীষণ দুর্বল হইয়া পড়িয়াছে। বারংবার যে অতীতকে জীর্ণ বস্ত্রের ন্যায় পিছনে ফেলিয়া আসিয়াছি, তাহা আমার সামনে আসিয়া উপস্থিত হইতেছে। সংসারের কত খুঁটিনাটি যে মনে পড়িতেছে ভাবিয়া কুলকিনারা পাই না। যাঁহারা সত্যকারের সাধক তাহাদের চিত্তচাঞ্চল্য ঘটে না। তাহারা স্থিতধী, অচঞ্চল, কোনও কারণেই বিচলিত হন না। তাহাদের একটাই লক্ষ্য-ঈশ্বরোপলব্ধির জন্য সাধনা। অন্য কোনও দিকে দৃষ্টি নাই। যাঁহারা একদা গৃহী ছিলেন, স্ত্রী-পুত্র-কন্যা-আত্মীয়-পরিজনদের দ্বারা পরিবৃত, সেই জীবনকে তাহারা চিরকালের মতো পিছনে ফেলিয়া গিয়াছেন, কোনও দিন ফিরিয়া তাকান নাই। ইহাদের কথা ভাবিলে মনে হয় আমি সাধক জীবনের যোগ্য নই।
‘এ সব প্রসঙ্গ থাক। বিশেষ করিয়া যে কারণে এই পত্র লিখিতেছি, তাহা জানাই। দাঙ্গার সময় নির্যাতিতা ঝিনুককে আমি মানিয়া লইতে পারি নাই। আজন্মলালিত সংস্কার বাধা হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। এই সংস্কারকে আমি প্রাধান্য দিয়াছি। মানবিক কর্তব্য পালন করি নাই। রোগশয্যায় শুইয়া শুইয়া যতই তাহার কথা ভাবি, তীব্র অনুশোচনায় দগ্ধ হই। সেই শীতের রাত্রে ঝিনুক কোথায় নিরুদ্দেশ হইয়াছিল, জানি না। কলিকাতা শহর তো নিরাপদ স্থান নয়, বিশেষ করিয়া একাকী একটি উদ্বাস্তু তরুণীকে পাইলে শকুনের পাল ছিঁড়িয়া খায়।
‘তুমি কি জানো, সে কি বাঁচিয়া আছে? তাহার সন্ধান কি করিয়াছ? তাহাকে কি পাওয়া গিয়াছে? পাইলে কোথায় আছে? আর যদি তাহার মৃত্যু হইয়া থাকে কিংবা পাপের পথে যাইতে বাধ্য হইয়া থাকে, তাহার জন্য আমি সম্পূর্ণ দায়ী। আত্মগ্লানিতে আমি জর্জরিত। একটি নিষ্পাপ মেয়েকে রক্ষা না করিয়া তাহার জীবন ধ্বংস করিয়া দিয়াছি ভাবিলে মনে হয়, ঈশ্বরের সাধনা আমার কাজ নয়। আমি একজন হীন মানুষ। পরকাল বলিয়া যদি কিছু থাকে সেখানেও মৃত্যুর পর নিষ্কৃতি নাই। জন্ম-জন্মান্তর ধরিয়া আমাকে দণ্ডভোগ করিতে হইবে। ঈশ্বর ইহজন্মে বা পরজন্মে এই পাপিষ্ঠকে ক্ষমা করিবেন না।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।