শেখরনাথের সঙ্গে ক’দিনেরই বা পরিচয়। কিন্তু এর মধ্যে তাকে অনেকখানিই চিনে ফেলেছে বিনয়। মানুষটি স্বচ্ছ, সহৃদয়, উদার। বর্মা থেকে নর্থ-ওয়েস্টার্ন প্রভিন্স অবধি এই বিশাল দেশে কত যে প্রদেশ! কত ধরনের মানুষ! ওড়িয়া, অসমিয়া, বিহারি, তামিল, শিখ–এমনি অজস্র। কিন্তু শেখরনাথের কাছে সবাই সমান। এদের সবার স্বাধীনতার জন্য একদিন ইংরেজদের বিরুদ্ধে তিনি অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন। কিন্তু উদ্বাস্তুদের সম্বন্ধে, বিশেষ করে যারা পূর্বপাকিস্তান থেকে উৎখাত হয়ে এপারে চলে এসেছে, তাদের প্রতি তার অপার সহানুভূতি। চোদ্দো পুরুষের ভিটেমাটি খুইয়ে যে শরণার্থীরা স্বাধীনতার দাম চুকিয়ে দিচ্ছে তাদের জন্য বহু টালবাহানার পর যে জমি বরাদ্দ করা হয়েছে, শেখরনাথ চান সেখানেই তাদের পুনর্বাসন হোক। তারা সেখানে থিতু হয়ে বসুক। পূর্বপাকিস্তানে যা তারা ফেলে আসতে বাধ্য হয়েছে, এই দ্বীপপুঞ্জে নতুন করে তা গড়ে তুলুক। রাজনৈতিক নানা চতুর চালে আজ হয়তো অনেক উদ্বাস্তু এখানে আসতে চাইছে না, কেউ কেউ খিদিরপুর ডক অবধি এসে পালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এক মাস, দু’মাস কি ছ’মাস বাদে তাদের আসতেই হবে। এই ছিন্নমূলদের জন্য নির্দিষ্ট জমি থেকে যদি কারসাজি করে তাদের বঞ্চিত করার চেষ্টা হয়, শেখরনাথ কিছুতেই মেনে নেবেন না।
ড্রইংরুমের আবহাওয়াটা ভারী হয়ে উঠেছিল। একসময় শেখরনাথ ফের বলতে লাগলেন, যে বা যারা চিফ কমিশনারের কাছে গোপনে আগের বারের বিয়ের খবরটা জানিয়ে এসেছে তারা কী। মানুষ! দু-চারটে ইনক্রিমেন্ট কি একটা প্রোমোশনের জন্যে এমন অসভ্যতা কেউ করে!
নানা কথাবার্তায় রাত অনেকটা বেড়ে গেছে। পোর্টব্লেয়ার শহর এখন নিঝুম। হঠাৎ বাইরে হাওয়ার জোর বেড়েছে, সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সমুদ্রের খ্যাপামিও। আন্দামানের আবহাওয়ার মেজাজের তলকুল পাওয়া যায় না। এই হয়তো শান্ত, পরক্ষণেই উত্তাল। সেসোস্ট্রেস বে’র পাড় ধরে যে নারকেল গাছের সারি তার ওপর ঝড়ো হাওয়া ঝাঁপিয়ে পড়েছে, আওয়াজ উঠছে সাঁই সাঁই। পাহাড়প্রমাণ ঢেউয়ের গর্জন ভেসে আসছে।
বিশ্বজিৎ বললেন, ‘কাকা, কাল কোর্টে একটা কেসের রায় দিতে হবে। আজ রাত্তিরে সেটা টাইপ করে না রাখলে মুশকিলে পড়ব।’
দেওয়াল ঘড়ির দিকে ব্যস্তভাবে তাকালেন শেখরনাথ।– ‘আরে তাই তো, সাড়ে দশটা বাজতে চলল। কাজে বসার আগে খেয়ে নে।’ হাঁক দিয়ে ভুবনকে বললেন, ‘খাবার গরম কর।’
.
৪.৪
খাওয়া-দাওয়া চুকে গেলে যে যার বেডরুমে চলে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ কী মনে পড়ে যাওয়ায় বিশ্বজিৎ বললেন, ‘বিনয়বাবু, একটু দাঁড়ান, আমি আসছি—’ ত্বরিত পায়ে নিজের ঘরে গিয়ে একটা বড় প্যাকেট আর মাঝারি ধরনের একটা খাম এনে বললেন, ‘এই দুটো কাল এসেছে। আপনাকে দিতে ভুলে গিয়েছিলাম। আই অ্যাম সরি—’ তিনি আর দাঁড়ালেন না।
খাম আর প্যাকেট নিয়ে নিজের ঘরে চলে এল বিনয়। প্রথমে ভারী প্যাকেটটা খুলল সে। ‘নতুন ভারত’-এর শেষ দশ দিনের কপি। তার রিপোর্টগুলো দেখা গেল, খুব গুরুত্ব দিয়ে প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছে। সেই সঙ্গে কলকাতার এবং দেশের নানা খবর। দ্রুত পাতার পর পাতা উলটে যেতে লাগল সে। উদ্বাস্তুরা স্রোতের মতো আসছেই, আসছেই। এর মধ্যে বরিশালে বিরাট আকারের দাঙ্গা হয়ে গেছে। দাঙ্গা বললে ঠিক হবে না, একতরফা খুন, ধর্ষণ, আগুন ইত্যাদি ইত্যাদি। কমিউনিস্ট পার্টি এবং অন্য রাজনৈতিক দলগুলির আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন উদ্বাস্তুদের সঙ্গে পুলিশের খণ্ডযুদ্ধ।
পড়তে পড়তে মন খারাপ হয়ে গেল বিনয়ের। কলকাতা যেন একটা জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির মাথায় বসে আছে। বিনয় আন্দামানে আসার পর থেকে কিছুদিন বাদে বাদে চিফ রিপোর্টার প্রসাদ লাহিড়ি একসঙ্গে আট-দশ দিনের কাগজ পাঠিয়ে দেন। জেফ্রি পয়েন্টে যে কলোনি তৈরি হওয়ার তোড়জোড় চলছে সেখানেই তো আপাতত থাকছে বিনয়। কলকাতা থেকে যে চিঠিপত্র আসে সবই পোর্টব্লেয়ারে বিশ্বজিৎ রাহার ঠিকানায়। জেফ্রি পয়েন্টে মালপত্র বোঝাই ট্রাক কখনও সখনও গেলে তিনি সেসব ড্রাইভারের হাতে পাঠিয়ে দেন। মোহনবাঁশি কর্মকারকে নিয়ে পোর্টব্লেয়ারে আসায় দেরি হয়নি, হাতে হাতেই এবার প্রসাদ লাহিড়ির প্যাকেটটা পাওয়া গেছে।
কাগজগুলো দেখা হয়ে গিয়েছিল। সেগুলোর সঙ্গে দু’টো মুখবন্ধ খামও রয়েছে। খামের ওপর তার নাম লেখা। একটা পাঠিয়েছেন প্রসাদ লাহিড়ি। হাতের লেখা দেখেই বোঝা গেল। দ্বিতীয় খামের লেখাটা দেখে রীতিমতো অবাকই হল বিনয়। ওই গোটা গোটা মুক্তোর মতো অক্ষরগুলো সুনীতির। কিন্তু সে আন্দামানে আসার পর সুনীতি আগে কখনও চিঠি লেখেনি। যা লেখার আনন্দদাই লিখেছে, আর লিখেছে সুধা। হঠাৎ কী এমন ঘটতে পারে?
ক্ষিপ্র হাতে প্রথমে প্রসাদ লাহিড়ির খামের মুখ কেটে চিঠি বের করে পড়ে ফেলল বিনয়।
‘স্নেহাস্পদেষু,
‘তোমাকে আগের পত্রে আন্দামানের পেনালগুলি সম্পর্কে বিস্তারিত রিপোর্ট পাঠাতে লিখেছিলাম, যাতে পরপর কয়েক কিস্তিতে আমাদের কাগজে বেরুতে পারে। এডিটরও তাই চাইছেন। আমাকে ডেকে এর মধ্যে দু’তিনবার বলেও দিয়েছেন। আমি তোমাকে মনে করিয়ে দিলাম। যত দ্রুত সম্ভব পাঠিয়ে দেবে। ক্যামেরা পাঠানোর ব্যবস্থা করছি। যতদিন না তুমি সেটা পাচ্ছ অবশ্যই পোর্টব্লেয়ারের কোনও ফোটোগ্রাফারকে তোমার সঙ্গে কলোনিগুলোতে নিয়ে যাবে। রিপোর্টর সঙ্গে ছবি থাকলে লেখার আকর্ষণ এবং গুরুত্ব বাড়ে। অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্যও হয়ে ওঠে। ফোটোগ্রাফারের জন্য ভাল পেমেন্টের বন্দোবস্ত করা হবে। কয়েকদিনের মধ্যে বেশ কিছু টাকা পাঠাচ্ছি।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।