বিনয় বলল, ‘কয়েকদিন তো পোর্টব্লেয়ারে আছি। আপনার সুবিধেমতো যেদিন ইচ্ছে নিয়ে যাবেন।’
হঠাৎ কিছু মনে পড়ে গেল বিশ্বজিতের। দু’জনকে লক্ষ করে বললেন, ‘ভাল কথা, বিভাস আর নিরঞ্জনকে তিন সপ্তাহ আগে নতুন রিফিউজি আনার জন্যে কলকাতায় পাঠানো হয়েছিল। আপনারা পোর্টব্লেয়ারে থাকতে থাকতেই তারা খুব সম্ভব চলে আসবে।
বিনয়ের মনে আছে, এই তো সেদিন নিরঞ্জন, বিভাস এবং বহু উদ্বাস্তু ফ্যামিলির সঙ্গে ‘এম ভি মহারাজা’ জাহাজে সে কলকাতা থেকে আন্দামানে এসেছিল। পরের বার ওরা আর রিফিউজি আনতে কলকাতায় যেতে চায়নি। রিলিফ ক্যাম্প আর শিয়ালদা স্টেশন থেকে পূর্বপাকিস্তানের ছিন্নমূল মানুষগুলোকে ঠাণ্ডা মাথায় বুঝিয়ে-সুঝিয়ে কী নিদারুণ কষ্ট করে খিদিরপুরের বাইশ নম্বর ডকে এনে জাহাজে তুলতে হয়, সেই প্রক্রিয়া সম্বন্ধে বিনয়ের স্পষ্ট ধারণা আছে। সহজে কি এই উদ্বাস্তুরা কলকাতা ছেড়ে সুদূর আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে আসতে চায়!
বিভাস আর নিরঞ্জন এবার কলকাতায় আসতে চায়নি। পুনর্বাসন দপ্তরে কিন্তু অন্য কর্মীদের ওপর ভরসা রাখতে পারে না। উদ্বাস্তুদের বোঝাবার মতো ধৈর্য, কৌশল অন্যদের নেই। বিভাস আর নিরঞ্জন দিন নেই রাত নেই, খাটতে পারে প্রচণ্ড। সবচেয়ে বড় ব্যাপার কোনওরকম উসকানিতে তাদের মেজাজ তেতে ওঠে না। সারাক্ষণ হাসিখুশি। দু’জনেই সাবেক পূর্ববাংলার (এখন পূর্ব পাকিস্তান) মানুষ, সেখানকার ভাষাটা অনর্গল বলে। আন্দামানের গুণকীর্তন করতে করতে, সেখানে গেলে কতরকম সুযোগসুবিধা পাবে, তার একটা স্বপ্নের ছবি যখন তুলে ধরে, উদ্বাস্তুদের মনে হয়, ত্রাণশিবির আর শিয়ালদা স্টেশনের চত্বরে পচে গলে শেষ হয়ে যাওয়ার চেয়ে সমুদ্রে পাড়ি দিয়ে সেখানে চলে যাওয়াই ভাল। রাজনৈতিক দলগুলোর অবিরাম বাধা সত্ত্বেও বিভাস আর নিরঞ্জনকে তাদের বড় আপনজন মনে হয়। এই দুজন ছাড়া আর কার ওপরেই বা পুনর্বাসন দপ্তর আস্থা রাখতে পারে?
বিনয় জিগ্যেস করল, ‘এবার কত ডিপি (ডিসপ্লেসড পার্সন অর্থাৎ উদ্বাস্তু) ফ্যামিলি কলকাতা থেকে আসছে?’
বিশ্বজিৎ বললেন, ‘একশো কুড়িটা ফ্যামিলির কোটা। রিলিফ ক্যাম্প ঘুরে ঘুরে পুরোটাই জোগাড় করতে পেরেছে বিভাসরা। ওদের জন্যে মিডল আর সাউথ আন্দামানে জঙ্গল কেটে জমি রিক্রেমও করা হচ্ছে। খিদিরপুরে আসার পর জাহাজ-টাহাজ দেখে উদ্বাস্তুদের মতিগতি বিগড়ে যাবে কি না, খবর পাওয়া যায়নি। হয়তো দেখা যাবে আট-দশটা ফ্যামিলি জাহাজে না উঠে পালিয়ে গেছে।’ তাঁকে বেশ চিন্তিত দেখাল।
বিনয়ের মনে আছে, সে যখন আন্দামানে আসে খিদিরপুর থেকে ছ’টা ফ্যামিলি জাহাজে না উঠে নিঃশব্দে সরে পড়েছিল। ‘রস’ আইল্যান্ডে ‘এস এস মহারাজা’ জাহাজটা ভেড়ার পর ছ’জোড়া অবিবাহিত যুবক-যুবতাঁকে ভরদুপুরে বিয়ে দিয়ে নতুন ফ্যামিলি বানিয়ে ‘কোটা’ পুরণ করা হয়েছিল। উদ্বাস্তু ফ্যামিলিগুলো তাদের জন্য নির্দিষ্ট জমির পুরোটাই পেয়ে গিয়েছিল।
বিনয় একটু হেসে বলল, ‘দুশ্চিন্তার কী আছে, যে ক’টা ফ্যামিলি আসবে না, আগের মতো অন্য সব ফ্যামিলি থেকে ছেলেমেয়ে বেছে নিয়ে বিয়ে দিয়ে ‘কোটা’ কমপ্লিট করে দিলেই তো প্রবলেম সলভড।’
বিশ্বজিৎ বললেন, ‘এবার খুব সম্ভব সেটা হবে না।’
বিনয় অবাক।-–’কেন?’
‘রিফিউজিরা মেনল্যান্ড থেকে এলে ‘রস’ আইল্যান্ডে পোর্টব্লেয়ারের বাঙালিরা তাদের রিসিভ করতে যায়। এতদিন এটাই চলে আসছে। শুনছি, এবার নাকি চিফ কমিশনারও বাঙালিদের সঙ্গে উদ্বাস্তুদের ওয়েলকাম জানাতে ‘রস’-এ হাজির থাকবেন।’
শেখরনাথের ভুরু কুঁচকে গেল। তিনি এতক্ষণ নীরবে শুনে যাচ্ছিলেন। জিগ্যেস করলেন, ‘কারণ? হঠাৎ উদ্বাস্তুদের ওপর তিনি এমন মহানুভব হয়ে উঠলেন যে? দেড় বছর এই আন্দামানের হর্তাকর্তা হয়ে এসেছেন। দু-এক মাস পর পর কলকাতা থেকে রিফিউজি আসছে। কোনও দিন তো ‘রস’-এ গিয়ে তাদের রিসিভ করেননি!’
বিশ্বজিৎ বললেন, ‘আমার ধারণা, লাস্ট যে রিফিউজিরা এসেছিল তাদের ভেতর থেকে ছ’ জোড়া যুবক-যুবতীর বিয়ে দিয়ে কোটা’ কমপ্লিট করা হয়েছিল, বাঙালিদের স্বার্থে এটা না করে উপায় ছিল না, খবরটা যেভাবে তোক চিফ কমিশনারের কানে উঠেছে। তাই এই ফন্দিটা বন্ধ করার জন্যে তিনি ‘রস’-এ চলে যাবেন।
কিছুক্ষণ ভেবে শেখরনাথ বললেন, ‘এই খবরটাকে তাকে কে দিতে পারে? বাঙালিরা ছাড়া রিফিউজি আসার দিন প্লোর্টব্লেয়ার থেকে অন্য কেউ তো যায় না!’
বিশ্বজিৎ কটু গলায় বললেন, ‘কে আবার দেবে? নিশ্চয়ই কোনও বাঙালিরই কাজ।’
মেজাজটা তেতো হয়ে গিয়েছিল শেখরনাথের।–-‘বাঙালিদের মধ্যে রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দরা জন্মেছেন ঠিকই, তারা মহাপুরুষ। তাঁদের কথা আলাদা। কিভাবে যে এদেশে জন্মেছেন! বাকি জাতটাই বজ্জাত। উদ্বাস্তুদের জমি সামান্য কৌশল করলে যদি তাদের হাতে থাকে, তোদের ক্ষতিটা কী? বিয়ে তো এই ছেলেমেয়েগুলোর হতই। আলাদা-আলাদা ফ্যামিলিও। না হয় দু-চারদিন আগেই হয়েছে। ইস্ট পাকিস্তান থেকে সর্বস্ব খুইয়ে ওরা এপারে এসেছে। তাদের কথা ভেবে একটু না হয় মুখ বুজেই থাকতিস। ওদিকে ওয়েস্ট পাকিস্তান থেকে পাঞ্জাবে, দিল্লিতে যে– রিফিউজিরা এসেছে তাদের জন্যে সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট সিন্দুক খুলে দশ হাতে ঢেলে দিয়েছে। আর ইস্ট পাকিস্তান থেকে যারা আসছে তাদের জন্যে স্রেফ ছিটেফোঁটা। এরকম একচোখো পক্ষপাতিত্ব ভাবা যায় না। বাঙালি রিফিউজিদের তাদের প্রাপ্য আদায় করে নিতে হবে, হয় আন্দোলন করে, নইলে নানারকম ফন্দি-ফিকির করে। সব বাঙালিরই এদের পাশে দাঁড়ানো উচিত। তা নয়, পেছন থেকে ছুরি মারার চেষ্টা। বলে থমথমে মুখে তিনি চুপ করে গেলেন।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।