শেখরনাথ তাঁর ভাইপোটির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। বিশ্বজিতের মনোভাবটা আঁচ করে নিতে পেরেছেন, ভাইপোটি রীতিমতো অস্বস্তি বোধ করছেন। চিফ কমিশনার আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের হর্তাকর্তাবিধাতা, বিশ্বজিতের ওপরওয়ালা। তাঁর কাকা যদি এখানকার প্রশাসনের এই বড়কর্তার সঙ্গে দেখা করে চোটপাট করেন, সেটা বিশ্বজিতের প্রতি আদৌ স্বস্তিকর হতে পারে না। শেখরনাথ একটু হেসে বললেন, ‘তোর ভয়ের কারণ নেই। আমি তো তোদের চিফ কমিশনারের বেয়ারা নই। স্বাধীন ভারতের একজন স্বাধীন নাগরিক। একসময় আর্মড রেভোলিউশনারি ছিলাম বলে বন্দুক উঁচিয়ে চিফ কমিশনারের কাছে যাব, এটা হয় নাকি? তুই আমাকে একজন জেন্টলম্যান ভাবতে পারিস না? ভয় নেই। চিফ কমিশনারকে জারোয়া আর রিফিউজিদের সমস্যার কথা শান্তভাবে। ভাল করে বুঝিয়ে বলব।
বিশ্বজিতের চোখমুখ দেখে বোঝা গেল, তার মাথায় যে দুর্ভাবনাটা চেপে বসেছিল তা অনেক্টাই হালকা হয়ে গেছে। বললেন, ঠিক আছে।
বিনয় চুপচাপ শুনে যাচ্ছিল। এবার বলে উঠল, ‘কাকা, আমাকে আপনার সঙ্গে চিফ কমিশনারের কাছে নিয়ে চলুন না। আগেও এই অনুরোধটা করেছিল সে।
শেখরনাথের একই উত্তর।–-‘না। একজন সাংবাদিক কাছে থাকলে খুব সম্ভব তিনি মন খুলে। কথা বলতে পারবেন না। কী লিখতে কী লিখে বসবে, তার ফলে তাঁকে মুশকিলে পড়তে হবে। নিউজপেপারকে সরকারি আমলারা বেশ ভয়ই পান।’
‘কিন্তু তারা তো প্রেস মিট করেন।’
‘তা করেন। আমি তো চাঁচাছোলা প্রশ্ন করব, উনি সহজে এড়িয়ে যেতে পারবেন না। আমি এখানকার অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সম্বন্ধে এমন অনেক কিছু জানি যা তোমার মতো যারা বাইরে থেকে দু-চার দিন কি দু-চার মাসের জন্যে আসে তাদের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। আমি একা থাকলে সেই সব প্রশ্নের উত্তর চিফ কমিশনারের পক্ষে এড়িয়ে যাওয়া সহজ হবে না। আমি চেপে ধরব। তুমি সামনে থাকলে তার মুখ থেকে বিশেষ কিছু বের করা যাবে না।’
‘ওঁর সঙ্গে কিন্তু আমার একবার দেখা করা দরকার। অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের হেড হিসাবে রিফিউজি সেটলমেন্ট সম্পর্কে তাকে অনেক প্রশ্ন করার আছে। আমাদের এডিটর চান তাঁর বক্তব্য ‘নতুন ভারত’-এ বেরোক।
‘ঠিক আছে, আমি অ্যাপয়েন্টমেন্টের ব্যবস্থা করে দেব। তুমি একা গিয়ে দেখা করবে।’
একটু নিরাশ হল বিনয়। শেখরনাথের সঙ্গে যেতে পারলে তার ভাল লাগত। একটু চুপ করে থেকে জিগ্যেস করল, ‘আর বৈজুর ব্যাপারটা?’
বিশ্বজিতের কৌতূহল হচ্ছিল। জিগ্যেস করলেন, ‘বৈজু কে?’
উত্তর দিলেন শেখরনাথ।–-‘বৈজুকে তো তুই চিনিস। আমি আন্দামানে আসার কয়েক বছর আগেই কয়েকটা মার্ডারের চার্জে ওকে ‘কালাপানি’ পাঠানো হয়েছিল। সেলুলার জেলে থাকার সময় বৈজু আমাকে প্রচুর সাহায্য করেছে। ও পাশে না থাকলে নারকেল ছোবড়া পিটতে পিটতে আর ঘানি ঘুরিয়ে রোজ পনেরো সের নারকেল কি সরষের তেল বের করতে করতে কবেই শেষ হয়ে যেতাম। তোকে তো সব বলেছি।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে। তা ব্রিটিশ আমলের একজন ড্রেডড ক্রিমিনালের সঙ্গে বিনয়বাবুর কী দরকার?’
‘বিনয় তো শুধু রিফিউজি সেটলমেন্ট দেখতে আসেনি। আগেকার পেনাল কলোনিগুলো সম্পর্কে ওদের পেপারে রিপোর্ট পাঠাবে। বৈজু ওকে প্রচুর মেটিরিয়াল দিতে পারবে।’
আস্তে আস্তে মাথা নাড়লেন বিশ্বজিৎ–‘পেনাল কলোনিগুলোর কিভাবে পত্তন হয়েছিল, তার হিস্ট্রি ভীষণ ইন্টারেস্টিং। কিভাবে সেকালের দুর্ধর্ষ ক্রিমিনালরা ধীরে ধীরে দেশের ভদ্র, সভ্য নাগরিক হয়ে উঠছে তাও কম অ্যাট্রাক্টিভ নয়। এর আগে কেউ এসব নিয়ে লিখেছেন কি না, আমার জানা নেই।–বিনয়বাবু, ডিটেলে বৈজুর কাছ থেকে সেলুলার জেলের পুরনো দিনের ক্রিমিনালদের সম্বন্ধে সব ইনফরমেশন জেনে নেবেন। রিপোর্টগুলো বেরুলে আপনাদের পেপারের সার্কুলেশন অনেক বেড়ে যাবে।’
এরপর খানিকক্ষণ এলোমেলো কিছু কথা হল। তারপর শেখরনাথের দিকে তাকিয়ে বিশ্বজিৎ জিগ্যেস করলেন, ‘কাকা, আপনি আর বিনয়বাবু কি আবার জেফ্রি পয়েন্টে ফিরে যাবেন?’
শেখরনাথ কণ্ঠস্বরে জোর দিয়ে বললেন, ‘নিশ্চয়ই। মোহনবাঁশিকে জারোয়ারা তির মেরেছে, এর ফলে জেফ্রি পয়েন্টের রিফিউজিরা খুব আতঙ্কে আছে। কোনওরকমে তাদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে চলে এসেছি। ফের যদি এমন ঘটনা ঘটে রিফিউজিদের ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। তারা মেনল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার জন্যে তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়ে ছাড়বে। তোদের রিহ্যাবিলেটেশন ডিপার্টমেন্টের যে এমপ্লয়িরা রয়েছে, তাদের পক্ষে উদ্বাস্তুদের সামলে রাখা প্রায় অসম্ভব। তাই আমার কিছুকাল থাকা, দরকার। ডাক্তার চট্টরাজ বলেছে দিন সাতেকের মধ্যে ফিট সার্টিফিকেট দেবে। তারপরই মোহনবাঁশি আর তার ফ্যামিলিকে নিয়ে বিনয় আর আমি জেফ্রি পয়েন্টে চলে যাব। এসব তো তোকে আগেও বলেছি। ভুলে গেছিস নাকি? তা ছাড়া—’
‘কী?’ উৎসুক হলেন বিশ্বজিৎ।
‘জেফ্রি পয়েন্টে সেটলমেন্ট সবে শুরু হয়েছে। অনেক কাজ বাকি। বিনয়ের তা দেখা দরকার।’ শেখরনাথ বললেন।
‘ঠিক বলেছেন–’ বলে বিনয়ের দিকে ফিরলেন বিশ্বজিৎ।–‘আমাদের এখানে বাঙালিদের একটা ক্লাব আছে– ‘অতুল স্মৃতি সমিতি’। তার মেম্বাররা চাইছেন আপনি সেখানে একদিন যান। আমিই নিয়ে যাব। কবে যেতে পারবেন?

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।