সন্ধে নেমে এসেছিল। সাগরপাখিরা সারাদিন ছোঁ মেরে মেরে সমুদ্রে ছোট ছোট সার্ডিন কি পমফ্রেট শিকার করে কখন যেন তাদের আস্তানায় ফিরে গেছে। বেশ ক’টা স্টিমার ‘রস’ আইল্যান্ডের দিক থেকে এসে চ্যাথাম জেটির দিকে চলে যাচ্ছে। এই সব জলযানের আলোগুলো অন্ধকারে অলৌকিক মনে হয়। পোর্টব্লেয়ার শহরেও টিলার মাথায় মাথায় এবং ঢালগুলোতে যে সব কাঠের বাড়িটাড়ি রয়েছে সেগুলোতেও অজস্র আলো। রাস্তায় মিউনিসিপ্যালিটির বাতিগুলো তেজ কিন্তু কম। টিম টিম করে জ্বলছে।
সমুদ্রের দিকে তাকিয়েই ছিল বিনয়। দূরমনস্ক মতো। হঠাৎ কার ডাকে চমকে ফিরে দাঁড়াল। গোপাল। সে বলল, ‘কাকা আপনাকে বসার ঘরে যেতে বললেন। আসুন—’
একটু হেসে ব্যস্তভাবে ড্রইংরুমে চলে এল বিনয়। শেখরনাথ সোফায় বসে আছেন। তার সামনে সেন্টার টেবিলে দু’টো চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উড়ছে। শুধু চা-ই নয়, ভুবন সিঙাড়াও ভেজেছে। এক প্লেট বোঝাই গরম সিঙাড়া চোখে পড়ছে।
শেখরনাথ বললেন, ‘বোসো। তোমার জন্যেই ওয়েট করছি। গোপালকে এর আগে দু’বার তোমার ঘরে পাঠিয়েছি। সে দু’বারই এসে বলল, ঘুমোচ্ছ। ‘নাও, শুরু কর’–বলে তিনি একটা সিঙাড়া তুলে নিয়ে কামড় দিলেন। চিবুতে চিবুতে বলতে লাগলেন, ‘ভুবনটার হাতে ম্যাজিক আছে। যা রাঁধে তাই অমৃত। যাক, ঘুমটা তা হলে বেশ জব্বরই হয়েছে, কী বল? আমিও খুব একচোট ঘুমিয়েছি। ক’টা দিন খুব ছোটাছুটি গেছে। তোমার আর আমার এই ঘুমটা ভীষণ দরকার ছিল। এখন ফ্রেশ লাগছে, তাই না?’
বিনয় হেসে মাথা কাত করল।
খেতে খেতে এলোমেলো কথা হচ্ছে। এই বাংলোর সব ঘর থেকে সেসোস্ট্রেস উপসাগরটা দেখা যায়। মাঝে মাঝে সেদিকে চোখ চলে যাচ্ছিল বিনয়ের। এটা পূর্ণিমাপক্ষ। আকাশে পূর্ণ চাঁদের মায়া। সেই চাঁদ সমুদ্রের ওপর স্নিগ্ধ রুপোলি আলো ঢেলে দিচ্ছে। বাঁ পাশের মাউন্ট হ্যারিয়েট, ডানপাশের ‘রস’ আইল্যান্ড, আরও দূরের নানা আকারের ছোট-বড় দ্বীপগুলি অপার রহস্যে মোড়া। দিনের বেলা কতবার এগুলো দেখেছে বিনয় কিন্তু এই পূর্ণিমার রাতে তাদের আগাগোড়া অচেনা মনে হচ্ছে।
ওদের খাওয়া আর গল্পের মধ্যেই কাঠের সিঁড়িতে আওয়াজ তুলে বিশ্বজিৎ রাহা ফিরে এলেন। কার্তিকরা সবাই ড্রইংরুমে দাঁড়িয়ে ছিল। গোপাল ছোঁ মেরে বিশ্বজিতের অ্যাটাচি কেসটা টেনে নিয়ে তার বেডরুমে রেখে এল।
বিশ্বজিতের চোখ সেন্টার টেবিলের দিকে। বললেন, ‘কী ব্যাপার, আমি কি দু-একটা সিঙাড়া পাব না? সব শেষ নাকি?
শশব্যস্ত ভুবন বলল, না না, অনেক আছে।
বিশ্বজিৎ জানেন, তাকে বাদ দিয়ে এই বাংলোর কেউ কিছু খাওয়ার কথা ভাবতেই পারে না। তাঁর চোখেমুখে দুষ্টুমির একটু হাসি ফুটল। এত বড় অফিসার, এত দায়িত্ব মাথায়, তবু তার মধ্যে অতি সরল, অতি চঞ্চল একটি বালক লুকনো রয়েছে। কখনও সখনও বাইরের গাম্ভীর্যের শক্ত খোলাটা ভেদ করে সে বেরিয়ে আসে। একটা সোফায় বসতে যাচ্ছিলেন, শেখরনাথ মৃদু ধমকের সুরে বললেন, ‘এ কী, বাইরে থেকে এলি, হাতমুখ ধুয়ে জামাকাপড় পালটে আয়।
বিশ্বজিৎ তার বেডরুমে চলে গেলেন। খানিক বাদে যখন ফিরে এলেন, স্নান করা হয়ে গেছে, চুল পরিপাটি করে আঁচড়ানো। পরনে ঘরোয়া পোশাক–ধবধবে পাজামা আর পাঞ্জাবি।
এর মধ্যে আরও কিছু সিঙাড়া দিয়ে গিয়েছিল ভুবন, এবং বিশ্বজিতের জন্য চা।
সিঙাড়া তুলে নিয়ে মোহনবাঁশির কথা জিগ্যেস করলেন বিশ্বজিৎ। শেখরনাথ সব জানালেন। হাসপাতাল থেকে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, তবে রোজ একবার ডাক্তার চট্টরাজের সহকারীদের কাছে নিয়ে যেতে হবে। সেটা করবে কালীপদ। যে দুর্বলতাটুকু এখনও রয়েছে তা কেটে গেলে মোহনবাঁশি এবং তার বউছেলেমেয়েদের জেফ্রি পয়েন্টের রিফিউজি সেটলমেন্টে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
শেখরনাথের দিকে তাকিয়ে বিশ্বজিৎ বললেন, ‘কটা দিন মোহনবাঁশিকে নিয়ে তোমার আর বিনয়বাবুর দৌড়োদৌড়ি তো গেছে, তার ওপর টেনশনও কম যায়নি। এখন দুর্ভাবনা কেটেছে, তিন চার দিন দু’জনে ভাল করে রেস্ট নাও।
শেখরনাথ বললেন, ‘রেস্ট নেওয়ার কি উপায় আছে? কাল আমাকে চিফ কমিশনারের সঙ্গে দেখা করতে হবে।
এরআগেও জেফ্রি পয়েন্টে থাকার সময় এই নিয়ে শেখরনাথের সঙ্গে কথা হয়েছে বিশ্বজিতের। ভেবেছিলেন পোর্টব্লেয়ারে এসে মোহনবাঁশিকে নিয়ে শেখরনাথ এতই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন যে চিফ কমিশনারের সঙ্গে দেখা করার ব্যাপারটা তার মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে। কিন্তু কাকার স্মৃতিশক্তি এই বয়সেও যথেষ্ট সতেজ। কিছুই তিনি ভোলেন না। বিশ্বজিৎকে বেশ চিন্তিত দেখাল। তার কপালে দু-চারটে ভাঁজ পড়েছে। বললেন, আপনি কি জারোয়াদের ব্যাপারটা বলবেন?
‘শুধু জারোয়াদের কেন, জেফ্রি পয়েন্ট আর তার চারপাশের উদ্বাস্তু কলোনিগুলোর জন্যে না আছে হাসপাতাল, না একটা হেলথ সেন্টার–তা নিয়েও চাপ দেব।’
‘কিন্তু—’ বাকিটা শেষ না করে থেমে গেলেন বিশ্বজিৎ। তাঁর স্বাধীনতা-সংগ্রামী সশস্ত্র বিপ্লবী কাকাটিকে তো তিনি চেনেন, স্পষ্ট কথা মুখের ওপর বলে দিতে পারেন। যিনি যত ক্ষমতাধরই হোন, রেয়াত করেন না। যে মানুষ একদা প্রবল প্রতাপে ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে বন্দুক তুলে ধরেছিলেন, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা ভোগ করতে এসেছিলেন ভয়াবহ সেলুলার জেলে, তিনি একজন চিফ কমিশনারকে পরোয়া করবেন কেন?

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।