বিনয় তার ঘরে চলে গেল। শেখরনাথও উঠে পড়লেন।
.
৪.৩
দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর শুয়ে পড়েছিল বিনয়। শিয়রের দিকের দেওয়ালজোড়া জানলা দিয়ে অলস চোখে বাইরে তাকাল সে। সকালের দিকে সেসোট্রেস বে এবং আরও দূরের সমুদ্র বেশ শান্ত ছিল। লক্ষ-কোটি ছোট ছোট ঢেউ নরম রোদে ঝিলমিল করছিল। ঝিরঝির করে বাতাস বয়ে যাচ্ছিল। গায়ে লাগলে মনে হচ্ছিল পালকের ছোঁয়া।
কিন্তু বে অফ বেঙ্গল একটা আশ্চর্য খ্যাপাটে সমুদ্র। তার মেজাজ-মর্জি, মতিগতি বোঝা ভার। এই ভরদুপুরে তার চেহারাটাই পুরোপুরি বদলে গেয়েছে। এই শান্তশিষ্ট, পরক্ষণেই হয়তো উন্মত্ত হয়ে উঠল।
এখন সমুদ্রের ঢেউগুলো পাহাড়ের মতো উঁচু হয়ে বিপুল আক্রোশে আছড়ে পড়ছে পাথরের বোল্ডারগুলোর ওপর। কী প্রচণ্ড গজরানি সেগুলোর। রোদও আর তেমন মায়াবী নেই; যেন আগুনের হলকা হয়ে গেছে। সামনের দিকে যতদূর চোখ যায়, সমুদ্র থেকে তীব্র ভাপ উঠে আসছে। বাতাসের ওপর কোনও দানব ভর করেছে; সাঁই সাঁই করে আছড়ে পড়ছে পাড়ের সারি সারি নারকেল গাছের ওপর। সেগুলোর ঝুঁটি ধরে ঝাঁকিয়ে আঁকিয়ে নাস্তানাবুদ করে দিচ্ছে।
জানলার দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল বিনয়। সারা শরীরে কয়েকদিনের ক্লান্তি জড়ো হয়েছিল। কখন যে দু’চোখ গাঢ় ঘুমে জুড়ে গেছে, খেয়াল নেই।
.
ঘুম যখন ভাঙল, সন্ধে নামে নামে। সূর্যটাকে এখন আর দেখা যাচ্ছে না। পশ্চিম দিকে মাউন্ট হ্যারিয়েটের উঁচু চুড়োর আড়ালে কখন নেমে গেছে টেরও পাওয়া যায়নি। বাসি হলুদের মতো যে মলিন, ফ্যাকাশে আলোটুকু সমস্ত চরাচরে ছড়িয়ে রয়েছে, লাটাইতে সুতো গোটানোর মতো কেউ যেন অদৃশ্য হাতে সেটুকু দ্রুত টেনে নিচ্ছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যে সেই আলোও থাকবে না, ঝপ করে আঁধার নেবে যাবে।
বিছানা থেকে উঠে বাথরুমে গিয়ে চোখে মুখে জল দিয়ে এল বিনয়; তারপর কী ভেবে জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সমুদ্র খুব স্পষ্ট না হলেও দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ মনে পড়ল, কয়েকদিন আগে ঝিনুক এক বৃদ্ধ এবং বৃদ্ধার সঙ্গে প্রাইভেট কোম্পানির জাহাজ ‘এস এস সাগর’-এ উঠে বহুদূরে সেসোস্ট্রেস বে যেখানে মাউন্ট হ্যারিয়েটকে বেড় দিয়ে গভীর সমুদ্রের দিকে গেছে সেখানে মিলিয়ে গিয়েছিল। তাদের গন্তব্য মিডল আন্দামান; সেখানে সবে উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের কাজ শুরু হয়েছে। অঘ্রান মাসের কুয়াশায় ঝাপসা এক শীতের রাতে ভবানীপুরের প্রিয়নাথ মল্লিক রোডের বাড়ি থেকে ঝিনুক অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। চরম অপমানে, আত্মগ্লানিতে। কলকাতার বিশাল জনারণ্যে তাকে কত খুঁজেছে বিনয়। তারপর বহু আলোকবর্ষ পেরিয়ে তার সঙ্গে আবার আন্দামানে দেখা হল। একবার নয়, দু-দু’বার। প্রথমবার ‘রস আইল্যান্ড’ থেকে সে যখন ইন্টার-আইল্যান্ড শিপ সারভিসের জাহাজ ‘চলুঙ্গা’য় মিডল আন্দামানে যাচ্ছে সেই সময়। দূর থেকে দেখা, তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগই পাওয়া যায়নি। আর দ্বিতীয়বার মাত্র কয়েকদিন আগে। মিডল আন্দামান থেকে একটি প্রাইভেট টিম্বার কোম্পানির ছোট জাহাজ ‘এস এস সাগর’-এ একজন অসুস্থ বৃদ্ধ এবং এক বৃদ্ধাকে সঙ্গে করে সেলুলার জেলের হাসপাতালে এসেছিল। ওরা যখন ফিরে যাচ্ছে সেই সময় ঝিনুকের সঙ্গে তার দেখা।
যে মেয়েটি ছেলেবেলা থেকে বিনয়ের পাশাপাশি বড় হয়ে এখন পূর্ণ যুবতী। ধর্ষিতা, প্রায় অপ্রকৃতিস্থ যে ঝিনুককে বুকের ভেতর আগলে আগলে সে মহাসংকটের ভেতর দিয়ে, জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে সীমান্তের এপারে চলে এসেছে, সেই মেয়ে তাকে দেখার পরও না চেনার ভান করেছে। কী নিদারুণ উদাসীন সে, পুরোপুরি নিরাসক্ত। একদিন ঝিনুক যে তার সঙ্গে শতপাকে জড়িয়ে গিয়েছিল, তা মনে করে রাখার আর প্রয়োজন বোধ করেনি সে। স্মৃতি থেকে পুরনো অতীতটাই
সে একেবারে মুছে দিতে চেয়েছে। এমনকি নিজের ঝিনুক নামটাও বদলে দিয়েছে। তার পরিচয়। এখন সীতা।
বিনয়ের মনে পড়ছে দু-চারটের বেশি কথা বলেনি ঝিনুক। নেহাতই দায়সারা। অতি সংক্ষেপে। কেউ প্রশ্ন করলে উত্তর দিতে হয়, ব্যস এটুকুই। তাকে উপেক্ষা করে, পেছনে ফেলে তার সঙ্গী বৃদ্ধ এবং বৃদ্ধাটিকে নিয়ে সেসোস্ট্রেস বের ছোট জেটির দিকে চলে গিয়েছিল।
বিশ্বজিৎ রাহার বাংলার এই ঘরের জানলা দিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে সেই দৃশ্য দু’টি বারবার মনে পড়ছিল বিনয়ের। ‘রস’ আইল্যান্ড থেকে ‘চলুঙ্গা জাহাজে একবার, আর দ্বিতীয়বার ‘এস এস সাগর’-এ সেসোস্ট্রেস বে পেরিয়ে কয়েকটা দ্বীপের পাশ দিয়ে গভীর সমুদ্রে ঝিনুকের অদৃশ্য হয়ে যাওয়া।
বিনয় ভেবে পায় না, তার ওপর ঝিনুকের কেন এত তীব্র অভিমান, এত প্রচণ্ড ক্রোধ। তার বাবা অবনীমোহন ঝিনুকের মতো এক ধর্ষিতা মেয়েকে মেনে নিতে পারেননি, সে অপরাধ কি বিনয়ের? কেন এত অবুঝ ঝিনুক? ন’দশ বছর বয়স থেকে সে বিনয়কে দেখে আসছে। অবনীমোহন তার আদ্যিকালের সংস্কার, সেকেলে ধ্যানধারণা নিয়ে থাকুন। কিন্তু বিনয়? সে তো ঝিনুককে জীবনের সাতপাকে জড়িয়ে নেওয়ার জন্য দু’হাত বাড়িয়েই ছিল। সেটা বুঝল না মেয়েটা? অনন্ত উদাসীনতায় নিজেকে ঢেকে রেখে ঝিনুক যতই তাকে দূরে ঠেলে দিতে চাক, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড চষে ফেলে তাকে খোঁজার পর যখন জানা গেছে সে মিডল আন্দামানে রয়েছে, বিনয় সেখানে পৌঁছে যাবেই যাবে। শেল কালেক্টর। লা-পোয়ের সঙ্গে আজই তার কথা হয়ে গেছে। দু-তিন সপ্তাহের মধ্যে সে তাদের ছোট মোটরবোট ‘সি-বার্ড’-এ করে বিনয়কে মিডল আন্দামানে নিয়ে যাবে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।