এসব বিনয়ের অজানা নয়। এই নিয়ে কতজনের সঙ্গেই না তার কথা হয়েছে। এদের মধ্যে ‘নতুন ভারত’ কাগজের নিউজ এডিটর তারাপদ ভৌমিক, চিফ রিপোর্টার প্রসাদ লাহিড়ি তো আছেনই, রয়েছেন বিশ্বজিৎ রাহাও। তারা খুবই উত্তেজিত এবং উদ্বিগ্নও। আন্দামানে আসতে না দিলে কী হাল হবে বাঙালি উদ্বাস্তুদের? কিছু ছিন্নমূল মানুষ কলকাতার চারপাশে–গড়িয়া, যাদবপুর, নাকতলা, ওদিকে আগরপাড়া, ঘোলা, সোদপুর ইত্যাদি অঞ্চলে ফাঁকা মাঠ, জলা জায়গার খোঁজ পেয়ে জবরদখল কলোনির পত্তন করছে কিন্তু তা নিয়ে জমির মালিকদের গুণ্ডা-বাহিনীর সঙ্গে রোজ দাঙ্গাহাঙ্গামা চলছে। উদ্বাস্তুদের মধ্যে ক’জন আর এইসব কলোনিতে ঠাই পেয়েছে? বাকি লক্ষ লক্ষ মানুষ? তারা শিয়ালদা, ঢাকুরিয়া, যাদবপুর রেলস্টেশনের চত্বরে এবং সরকারি অস্থায়ী ত্রাণশিবিরগুলোতে তিলে তিলে ক্ষয়ে-ক্ষয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। এমনটা ঘটতে দেওয়া কোনওভাবেই ঠিক নয়। আন্দামান প্রকল্পকে সফল করে তুলতে প্রতিটি পলিটিক্যাল পার্টির উচিত একসঙ্গে হাত মেলানো এবং তা বাঙালিরই স্বার্থে। কিন্তু পশ্চিমবাংলায় তার উলটো ছবিটাই দেখা যাচ্ছে।
শেখরনাথ বললেন, ‘মোহনবাঁশির মৃত্যু হলে যে কয়েকশো ফ্যামিলি এর মধ্যেই আন্দামানে চলে এসেছে, তাদের কি ধরে রাখা যেত? এই দ্বীপে তুমুল গোলমাল শুরু হয়ে যেত। তুমি তোমাদের কাগজে এই রিপোর্ট পাঠাও আর না পাঠাও, মৃত্যুর খবরটা একটু দেরি হলেও কলকাতায় পৌঁছে যেত। তার ফলটা কী হত, বুঝতে পারছ?’
এই বিষয়ে আগেই বিশ্বজিৎ রাহার সঙ্গে বিনয়ের কথা হয়েছে। সে উত্তর না দিয়ে শেখরনাথ কী বলেন শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে রইল।
শেখরনাথ বলতে লাগলেন, ‘মৃত্যুর খবরটা পাওয়া মাত্র লুফে নিত কমিউনিস্ট পার্টি আর অন্য বিরোধী দলগুলো। সেটাকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে কলকাতায় আন্দোলনের ইনটেনসিটি যে কতগুণ বাড়িয়ে দিত, ভাবা যায় না। আন্দামানে রিফিউজি মুভমেন্ট খুব সম্ভব বন্ধ হয়ে যেত। আসলে ব্যাপারটা কী জানো?’
বিনয় বলল, ‘কী?’
‘কমিউনিস্ট পার্টি এখন ছোট দল। অন্য বিরোধী দলগুলো আরও ছোট। আর দু-তিন বছরের ভেতর দেশের প্রথম জেনারেল ইলেকশনের কথা ভাবা হচ্ছে। তার আগে উদ্বাস্তুদের মধ্যে নিজেদের সাপোর্ট-বেস তৈরি করতে চায় এই পার্টিগুলো। চল্লিশ-বিয়াল্লিশ লাখ মানুষ একটা বেশ বড় রকমের শক্তি। এদের ভোট টানতে পারলে নিজেদের স্ট্রেংথ কতটা বেড়ে যাবে ভাবতে পারো?’
সেই কোন উনিশশো কুড়ি সালে সেলুলার জেলে যাবজ্জীবন কারাবাসের সাজা মাথায় নিয়ে কলকাতা থেকে আটশো-ন’শো মাইল দূরে বঙ্গোপসাগরের মাঝখানে এই দ্বীপে এসেছিলেন শেখরনাথ। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরও তিনি দেশে ফিরে যাননি। স্থির করেছেন বাকি জীবন এখানেই থেকে যাবেন। কত বছর তিনি দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে দূরে রয়েছেন, অথচ সেখানকার, বিশেষ করে পশ্চিমবাংলার যাবতীয় খুঁটিনাটি খবরই রাখেন। অর্থনৈতিক দুর্গতি, রাজনৈতিক টানাপোড়েন, উদ্বাস্তু সমস্যা–সব মিলিয়ে বাংলার খণ্ডিত অংশটি যে তোলপাড়, এসব কী না জানেন তিনি?
শেখরনাথ বললেন, ‘বাঙালির মতো আত্মঘাতী জাত ভূ-ভারতে কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই। ছোট ছোট স্বার্থের জন্যে পলিটিকাল পার্টিগুলো রাজ্যটাকে জাহান্নামে পাঠাতে চলেছে। এখনও যদি নিজেদের না শোধরায়, ভবিষ্যৎ অন্ধকার। নিজেরাই যদি নিজেদের সর্বনাশের রাস্তা তৈরি করি, কে আমাদের বাঁচাবে?’
সমস্ত ড্রইংরুম জুড়ে অদ্ভুত এক বিষাদ নেমে আসে।
একসময় শেখরনাথ একটু হাসলেন।-–’বুড়ো হয়েছি তো। বয়েস হলে মানুষ বেশি বকে। যাও, নিজের ঘরে কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে স্নান কর। ভুবনের রান্না কিন্তু হয়ে এল।’
আজ এমন কিছু ধকল হয়নি। সকালে হাসপাতালে গিয়ে মোহনবাঁশিকে ‘রিলিজ’ করে আনা। গাড়িতে গেছে, গাড়িতেই ফিরেছে। ব্যস, এটুকুই। বিনয় জিগ্যেস করল ‘ও বেলা কি বেরুবেন?’
‘না।’ ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন শেখরনাথ।–-‘আজ তোমার আর আমার পূর্ণ বিশ্রাম।‘
‘তা হলে—’
শেখরনাথ ভুরু দুটো সামান্য ওপরে তুললেন।–-‘তা হলে কী?’
‘সেদিন সেলুলার জেলে বৈজু নামে যে লোকটির সঙ্গে দেখা হয়েছিল, আপনার কাছে শুনেছি, সে ছিল মারাত্মক খুনি। আপনাদের কিছু আগে ‘কালাপানি’-র লম্বা মেয়াদ খাটতে এসেছিল। পরে বিয়েটিয়ে করে ভদ্রসভ্য হয়ে গেছে। আপনি বলেছিলেন তাদের বাড়িতে আমাকে নিয়ে যাবেন। কবে–’ বাকিটা শেষ না করে থেমে গেল বিনয়।
শেখরনাথের মুখের হালকা হাসিটা এবার আরও ছড়িয়ে পড়ল। লঘু সুরে বললেন, ‘বাংলায় একটা কথা আছে, ‘জাতে মাতাল, তালে ঠিক’। তোমার দেখি সেই অবস্থা। পেনাল কলোনি নিয়ে লেখার জন্যে হাত নিশপিশ করছে। অবশ্য প্রেসের খাদ্য তত জোগাতে হবে। নিত্যনতুন সেনশনাল ইনফরমেশন চাই। নিশ্চয়ই নিয়ে যাব তোমাকে। আজ রেস্ট। কাল আমি চিফ কমিশনারের সঙ্গে দেখা করব। পরশু যাব বৈজুদের বাড়ি।
কী কারণে শেখরনাথ চিফ কমিশনারের কাছে যেতে চান, বিনয় তা জানে। সে একটু দ্বিধার সুরে বলল, আমাকে কি আপনার সঙ্গে চিফ কমিশনারের কাছে নিয়ে যাওয়া সম্ভব?
শেখরনাথ বললেন, ‘না। বিনা অ্যাপয়েন্টমেন্টে একজন জার্নালিস্টের যাওয়া তিনি খুব সম্ভব পছন্দ করবেন না। তা ছাড়া আমার এমন কিছু চাচাছোলা প্রশ্ন থাকবে যার উত্তর খবরের কাগজের লোকের সামনে তিনি দিতে চাইবেন বলে মনে হয় না। আর দেরি নয়, এবার উঠে পড়।’

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।