.
৪.২
বাংলোটা ঘিরে সবুজ ঘাসে ভরা বিশাল কমপাউন্ড। কালীপদ জিপটা সেখানে এনে থামিয়েছিল। সবাই নেমে পড়েছে। সিঁড়ি দিয়ে অনেকটা ওপরে উঠতে হবে মোহনবাঁশিকে। ফুসফুসের ক্ষত শুকিয়ে এলেও একা-একা দোতলায় ওঠা তার পক্ষে কষ্টকর তো বটেই, বিপজ্জনকও। ওঠার সময় চাপ পড়লে ক্ষতস্থান ফেটে রক্ত চুঁইয়ে চুঁইয়ে আসার ভয় আছে। শেখরনাথ গলার স্বর উঁচুতে তুলে ডাকতে লাগলেন, ‘গোপাল, কার্তিক—’
গোপালদের জানাই ছিল আজ দুপুরের আগে আগে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাবে মোহনবাঁশি। তারা কান খাড়া করেই ছিল। তরতর করে নিচে নেমে এল।
শেখরনাথ বললেন, ‘দু’জনে দু’পাশ থেকে ধরে ধরে মোহনবাঁশিকে তোল। আস্তে আস্তে। একদম তাড়াহুড়ো নয়। দেখিস ওর বুকে যেন চাপ না পড়ে।’
তার কথামতো খুব সতর্কভাবে তোলা হল মোহনবাঁশিকে। গোপালদের পেছন পেছন বাকি সবাই। উঠে এল।
শেখরনাথ বললেন, ‘মোহনবাঁশিকে এবার ওর ঘরে নিয়ে শুইয়ে দে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম করুক।’
হলঘরের কোণের দিকের একটা ঘরে মোহনবাঁশিকে রেখে ফিরে এল গোপালরা। এবার ডাক পড়ল ভুবনের।
হলঘরের একধারে ড্রইংরুমের একটা সোফায় বসে পড়েছিলেন শেখরনাথ, তাঁর মুখোমুখি বিনয়ও।
ভুবন কিচেন থেকে এর মধ্যে ব্যস্ত পায়ে চলে এসেছে। শেখরনাথ জিগ্যেস করলেন, ‘রান্না কতদূর?’
ভুবন বলল, ‘হয়ে এসেচে। আধঘন্টার মদ্যে শেষ হয়ে যাবে।’
শেখরনাথ বললেন, ‘আমি যেরকম বলেছি সেইমতো বেঁধেছিস তো? বেশি তেল-মশলা না চলবে কিন্তু। ডাক্তারের বারণ।’
বিনয়ের মনে পড়ে গেল, আজ সকালে হাসপাতালে যাওয়ার সময় ভুবনকে মোহনবাঁশির জন্য পাতলা মাছের ঝোল, অর্থাৎ রোগীর পথ্য যেমন হয় তেমনটাই রাঁধতে বলে গিয়েছিলেন শেখরনাথ। ব্রিটিশ আমলের সশস্ত্র বিপ্লবী এই মানুষটিকে যত দেখছে, তার কথা যত শুনছে ততই অবাক হচ্ছে। সে, তার প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে যাচ্ছে। তেরো-চোদ্দো দিন আগে জেফ্রি পয়েন্টের দুর্গম জঙ্গলে জারোয়াদের তিরে জখম মোহনবাঁশিকে ট্রাকে চাপিয়ে চল্লিশ মাইল পাহাড়ি রাস্তার চড়াই-উতরাইতে ঝাঁকুনি খেতে খেতে পোর্টব্লেয়ারে এসে সেলুলার জেলের ভেতর হাসপাতালে এনে ভর্তি করেছিলেন শেখরনাথ। তখন থেকে প্রতিটি দিন তার ছেলেমেয়েবউকে নিয়ে সকালে হাসপাতালে গেছেন। সঙ্গে বিনয়। সারাদিন সেখানে কাটিয়ে বিকেলের ভিজিটিং আওয়ার্সে পেশেন্টকে দেখে বাংলোয় ফিরতে ফিরতে সন্ধে নেমে গেছে। একদিন দু’দিন নয়, প্রায় দু’টো সপ্তাহ। ক্লান্তি নেই, বিরক্তি নেই। নেই লোশমাত্র ক্লেশবোধ। বাঁচার আশা ছিল না মোহনবাঁশির। শেষ পর্যন্ত ডাক্তার চট্টরাজ এবং তার দুই সহকারী তাকে সুস্থ করে তুলেছেন।
পূর্বপাকিস্তানে পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি থেকে উৎখাত হয়ে আসা কে.এক তুচ্ছ মানুষ, তার জন্য কী গভীর মায়া, কী অনন্ত উৎকণ্ঠা শেখরনাথের! বিনয় তো তাঁর প্রতিদিনের সঙ্গী, লক্ষ করেছে মোহনবাঁশিকে বাঁচানোর জন্য তার অধীর ব্যাকুলতা। কত দিকে নজর এই বয়স্ক, শ্রদ্ধেয় বিপ্লবীর। আজ মোহনবাঁশিকে হাসপাতালে রিলিজ করে দেওয়া হবে; বাংলোয় ফিরলে তার পথ্য কী হবে, সে খেয়ালও তাঁর ছিল।
শেখরনাথ ভুবনকে বললেন, ‘তুই রান্নাঘরে যা।’
ভুবন কিচেনের দিকে পা বাড়াল।
একটু নীরবতা।
তারপর শেখরনাথ বললেন, ‘মোহনবাঁশি যে বেঁচে গেছে, এটা যে কত বড় স্বস্তি! ও মরে গেলে সর্বনাশ ঘটে যেত।’
এটা ঠিক, মোহনবাঁশির মৃত্যুতে জ্যোৎস্নাদের পরিবারটার বিপুল ক্ষতি হত। জ্যোৎস্না তার স্বামীকে হারাত। ওদের ছেলেমেয়েরা হারাত বাপকে।
শেখরনাথ থামেননি।–’ক্ষতিটা শুধু ওর বউছেলেমেয়েরই না, আন্দামানে রিহ্যাবিলিটেশনের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে তা প্রচণ্ড ধাক্কা খেত। জারোয়াদের তিরে মোহনবাঁশি যে জখম হয়েছে, তোমাদের ‘নতুন ভারত’ কাগজে সেই রিপোর্ট তো তুমি পাঠাওনি।
আস্তে মাথা নাড়ল বিনয়। নিচু গলায় বলল, ‘না–মানে—’
‘জার্নালিস্ট হিসাবে কাজটা উচিত হয়নি। সাংবাদিকের সততা থাকা দরকার। যা সত্যি তাই পাঠককে জানানো দরকার–তাই না?’
চমকে মুখ তুলল বিনয়। রীতিমতো হতচকিত। বিশ্বজিৎ রাহা এ নিয়ে লিখতে বারণ করেছিলেন। সেটা আর জানাল, না। কোনওরকমে গলার ভেতর থেকে স্বরটা বের করে আনতে পারল।–‘আমি–আমি—’
হাত তুলে তাকে শান্ত করলেন শেখরনাথ।–’কিন্তু পুনর্বাসনের স্বার্থে সঠিক কাজই করেছ। পূর্বপাকিস্তানের উদ্বাস্তুদের জন্যে সাউথ, মিডল আর নর্থ আন্দামানের তিনটি বিরাট দ্বীপে প্রায় একশো কুড়ি পঁচিশ মাইল এলাকা জুড়ে রিহ্যাবিলিটেশনের যে বিশাল পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, শেষ পর্যন্ত সেটা কতটা করা সম্ভব হত, বলা মুশকিল।–’
বিনয় উত্তর দিল না।
শেখরনাথ বলতে লাগলেন, তুমি নিজের চোখে দেখে এসেছ, কলকাতায় কমিউনিস্ট আর অন্য পার্টিগুলো উদ্বাস্তুদের নিয়ে তুমুল আন্দোলন শুরু করেছে। দিনকে দিন সেই আন্দোলন আরও তীব্র হচ্ছে। রোজ মিটিং, মিছিল, পুলিশের সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধ। এই পলিটিক্যাল পার্টিগুলো চায় না, উদ্বাস্তুদের পশ্চিমবঙ্গের বাইরে পাঠানো হোক। স্টেটের মধ্যে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু লক্ষ লক্ষ মানুষ বর্ডারের ওপার থেকে সর্বস্ব খুইয়ে চলে এসেছে। এদের বেশিরভাগই কৃষিজীবী, নিরক্ষর। পশ্চিমবাংলা ছোট রাজ্য। আয়তনের তুলনায় মানুষ অনেক বেশি। সেখানে এত মানুষকে চাষের জমি দেওয়া অসম্ভব। আন্দামানে রিহ্যাবিলিটেশনের একটা সুবর্ণ সুযোগ এসেছে। এটা সেকেন্ড বেঙ্গল হয়ে উঠতে পারে। সুযোগটা হাতছাড়া হতে দেওয়া যায় না। কোনওভাবেই উচিত নয়।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।