ডাক্তার চট্টরাজ হালকা গলায় বললেন, ‘আস্তে আস্তে বল এসে যাবে। এখন থেকে কীভাবে চলতে হবে, কাকাকে বলে দিয়েছি। তার কাছ থেকে সব শুনে নিও।
মোহনবাঁশি আবার ঘাড় হেলিয়ে দিল।–’আইচ্ছা।‘
‘হাসপাতাল থেকে তোমার ছুটি হয়ে গেছে। এবার চল—’
সবাই মিলে মোহনবাঁশিকে নিয়ে চেম্বারের বাইরে বেরিয়ে এল। ডাক্তার চট্টরাজও সঙ্গে এসেছেন। খানিক দূরে বসে ছিল জ্যোৎস্নারা। শেখরনাথ হাত নেড়ে তাদের ডাকলেন।
জ্যোৎস্না ত্বরিত পায়ে উঠে এল। তার গায়ের সঙ্গে লেপটে তাদের ছেলেমেয়েগুলোও। যে একান্ত আপন মানুষটা অবধারিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে, বিপুল আবেগে তাকে হয়তো জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা হল। মোহনবাঁশি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দিন থেকে রোজই আসছে জ্যোৎস্না। প্রথম প্রথম তাকে স্বামীকে দেখতে দেওয়া হয়নি। পরে কেবিনের বাইরে থেকে কয়েক পলক দেখেছে, কাছে ঘেঁষা ছিল বারণ। আজ মোহনবাঁশি নাগালের মধ্যেই রয়েছে। কিন্তু মনের ইচ্ছাটা মনেই থেকে গেল। শেখরনাথ, বিনয়, ডাক্তার চট্টরাজরা সঙ্গে রয়েছেন। তাদের সামনে জড়িয়ে ধরা যায় নাকি? নিজেকে সামলে নিয়ে ব্যগ্রভাবে মোহনবাঁশিকে দেখতে দেখতে সিঁড়ি ভেঙে সবার সঙ্গে নিচের চত্বরে নেমে এল সে।
বিশ্বজিৎ রাহার বড় জিপটা একধারে দাঁড়িয়ে আছে। ড্রাইভার কালীপদ সেটার গায়ে ঠেসান দিয়ে অপেক্ষা করছে। এই গাড়িতেই রোজ শেখরনাথ, বিনয়, জ্যোৎস্নারা হাসপাতালে যাতায়াত করেছে এ ক’দিন।
কালীপদ ক্ষিপ্রহাতে সামনের এবং পেছনের দিকের দরজা খুলে দিল। শেখরনাথ বললেন, ‘মোহনবাঁশিকে নিয়ে আমি ফ্রন্টসিটে বসছি। বিনয়, তুমি জ্যোৎস্না আর বাচ্চাগুলোর সঙ্গে পেছনের সিটে বোসো।’
সবাই উঠে পড়ল। শেখরনাথ হাত নেড়ে ডাক্তার চট্টরাজদের বললেন, ‘চলি ডাক্তারবাবুরা—‘
ডাক্তার চট্টরাজরা হাসিমুখে হাত নাড়লেন। জিপ চলতে শুরু করলে তারা হাসপাতাল বিল্ডিংয়ের দিকে পা বাড়ালেন।
বিনয় বেশ অবাকই হয়েছিল। অন্যদিন তাকে নিয়ে শেখরনাথ কালীপদর পাশে বসেন। আজই তার ব্যতিক্রম হল। কারণটা অবশ্য খানিক পরেই বোঝা গেল।
শেখরনাথ কালীপদকে বলছিলেন, ‘গাড়ি আস্তে আস্তে চালাবি। পাহাড়ি রাস্তা, মোহনবাঁশির বুকে ব্যান্ডেজ বাঁধা আছে। আঁকুনি লাগলে ক্ষতি হবে।’
কথামতো স্পিড তুলল না কালীপদ। জিপ খুব ধীরগতিতে এবারডিন মার্কেটের দিকে এগিয়ে চলল।
শেখরনাথ এবার মোহনবাঁশির দিকে ফিরলেন।–’বড় ডাক্তারবাবু কী বলেছেন, মন দিয়ে শুনে নে। সেইমতো তোকে চলতে হবে।’
মোহনবাঁশি জানতে চাইল।–’কী কইছেন তেনি (তিনি)?’
ডাক্তার চট্টরাজ প্রেসক্রিপশনে যা যা লিখেছেন সমস্ত বুঝিয়ে দিলেন শেখরনাথ।
মোহনবাঁশির কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ে।–’অ্যাতদিন হাসপাতলে পইড়া রইলাম। হের (তার) পর ফির হেইহানে (সেখানে) দৌড়াদৌড়ি, হের (তার) পর তিনমাস বিশ্রাম। অ্যাতখানি সোময়.. কি আমাগো পুটবিলাসে (পোর্টব্লেয়ারে) থাকতে অইব?’
‘ডাক্তারবাবু যদি বলেন, থাকতেই হবে।’
‘কিন্তুক—’
‘কিন্তু কী?’
ঢোক গিলে মোহনবাঁশি বলল, ‘সরকার আমাগো পনেরো বিঘা কইরা জমিন দিছে। হেই জমিন সাফসুফ কইরা, চৌরস করতে অইব (হবে)। যদিন পুটবিলাসেই মাসের পর মাস পইড়া থাকি আমার জমিনের কী গতিক? সরকার থিকা অহন (এখন) আমাগো খাওয়াইতে আছে। চিরকাল (চিরকাল) কি খাওয়াইব? চাষবাস না করতে পারলে খামু কী?’
এটা ঠিকই, আপাতত কিছুদিন পুনর্বাসন দপ্তর থেকে জেফ্রি পয়েন্টের উদ্বাস্তুদের চার বেলা খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। রান্নাবান্না থেকে সবার হাতে হাতে শালপাতার থালায় ভাতডাল, তরকারি ইত্যাদি তুলে দেওয়ার যাবতীয় দায়িত্ব দপ্তরের। কিন্তু এটা সাময়িক বন্দোবস্ত। অনন্তকাল তো চলতে। পারে না। জমি চাষের যোগ্য করে তোলার পর সরকারি কিচেন বন্ধ করে দেওয়া হবে। এখানে পুনর্বাসন দপ্তর যখন কো-অপারেটিভ স্টোর বসাবে তখন থেকে ঘর-গৃহস্থালির সমস্ত জিনিসপত্র–চাল-ডাল, আটা, নুন, চিনি, তেল, মশলা, এমনকি জামাকাপড় অবধি পাওয়া যাবে। সেই সময় মাথাপিছু সরকারি ‘ভোল’ চালু করা হবে। সেই টাকায় প্রতিটি ছিন্নমূল পরিবারকে তাদের সংসার চালাতে হবে। রান্নাবান্না সব নিজের নিজের। তবে ওষুধপত্র, গুঁড়ো দুধ এবং ড্রাই ফুডের জন্য খরচের প্রশ্নই নেই। সেসব তো আসছেই, ভবিষ্যতেও আসতেই থাকবে আমেরিকান, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এবং ইউরোপের অন্যান্য ধনী দেশগুলোর নানা প্রতিষ্ঠান থেকে।
শেখরনাথ বললেন, ‘সরকারি তরফে খাবার দেওয়া এখনই তো বন্ধ হচ্ছে না। সেজন্যে দুর্ভাবনার কারণ নেই। তবে হ্যাঁ, অন্য উদ্বাস্তরা অল্পদিনের মধ্যেই তাদের জমি তৈরি করে ফেলবে। তোর পক্ষে তা সম্ভব নয়। জারোয়াদের তিরে তুই জখম হয়ে মরতে বসেছিলি। তাতে তোর তো কোনও দোষ নেই। ভাবিস না, তোর জমি তৈরি করে দিতে সরকার বাধ্য। তাদের আমি বুঝিয়ে বলব।’
মোহনবাঁশি এবার অনেকটা স্বাভাবিক হতে পারল। তার মনে যে উৎকণ্ঠা জমেছিল তা কেটে যাচ্ছে। বলল, ‘আপনের দয়া বড়কত্তা।’
শেখরনাথ উত্তর দিলেন না, একটু হেসে মোহনবাঁশির মাথায় আলতো করে হাত রাখলেন।
একসময় এবারডিন মার্কেট পেছনে ফেলে চড়াই-উতরাই পেরোতে পেরোতে ফুঙ্গি চাউঙের কাছে এসে ডাইনে বাঁক ঘুরে একটা ছোট পাহাড় টপকে উত্তর দিকে সেসোস্ট্রেস বের ধারে বিশ্বজিৎ রাহার বাংলোয় পৌঁছে গেল জিপটা।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।