এধারে নিরঞ্জন আর বিভাস চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলছিল, মালপত্তর কান্ধে (কাঁধে) তুইলা আমাগো লগে চলেন। নিশ্চয় হগলটির (সকলের) ক্ষুদা পাইছে। কয়দিন সমুন্দুরে ঝড়-তুফানে। আপনেগো দলামোচড়া কইরা ছাড়বে। আইজ সকালে ‘রস’-এ। নামনের পর সারাটা দিন শরীলের উপর দিয়া মেলা (অনেক) তাফাল গেছে। আমাগো লোকেরা ভাত ডাইল মাছ তরকারি রাইন্ধা বাড়ছে। গিয়া খাইয়া শুইয়া পড়বেন। ঘুমটা জবর দরকার।
উদ্বাস্তুরা যাবার জন্য তৈরি হতে লাগল।
শহরের যেসব দোকানদার, হোটেলওয়ালা, মুদি, সেলুনওয়ালা জড়ো হয়েছিল, চিফ কমিশনার গাড়িতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তারাও সরে পড়েছে।
এধারে বিনয় বলছিল, সকালে পোর্টব্লেয়ারের ভি আই পি বাঙালিরা রিফিউজিদের রিসিভ করতে ‘রস’ আইল্যান্ডে গিয়েছিলেন। সন্ধেবেলা চিফ কমিশনার এবারডিন মার্কেটের সামনে তাদের রিসিভ করলেন। এটাই নিয়ম নাকি?’
‘আপনি লক্ষ করেছেন দেখছি।’ বিশ্বজিৎ বলতে লাগলেন, ‘নিয়ম ঠিক নয়, তবে আন্দামানের রিফিউজি আসা শুরু হতেই এটা চলছে। আসুন, আপনি আমার সঙ্গে যাবেন—’
একটু অবাক হল বিনয়! –’কোথায়?’
‘কোথায় আবার? আমার বাংলোয়।’
‘সে হয় না। রিফিউজিরা আমাকে কিছুতেই ছাড়বে না।’
‘আমি ওদের সঙ্গে কথা বলছি।’
‘কিন্তু—’
‘আবার কী?’
‘কাল সকালে ওরা নতুন সেটলমেন্টের জায়গায় চলে যাবে। ওদের সঙ্গে আমারও তো যাওয়া দরকার।‘
বিশ্বজিৎ হাসলেন।–’যাবেন, নিশ্চয়ই যাবেন। আমিও আপনাদের সঙ্গে যাব। চিন্তা করবেন না।’
উদ্বাস্তুরা কিন্তু নাছোড়। রাত্তিরটা বিশ্বজিতের বাংলোয় গিয়ে বিনয় থাকবে, এটা জানাতেই হুলস্থুল বেধে গেল। বিনয় কড়ার করেছিল, যতদিন না আন্দামানের পুনর্বাসন কেন্দ্রে শরণার্থীরা থিতু হয়ে বসছে সে তাদের সঙ্গে থাকবে। বিনয় আন্দামানে পা দিয়েই যদি অন্য কোথাও রাত কাটাতে যায় কার ভরসায় তারা থাকবে? বিনয় কাছে না থাকলে তারা সেটলমেন্টে তো যাবেই না, এমনকী আজ রাতের জন্য নিরঞ্জনরা সেখানে তাদের নিয়ে যেতে চাইছে, যেখানেও যাবে না।
উদ্বাস্তুদের আশঙ্কাটা কোথায়, মোটামুটি আঁচ করতে পেরেছিল বিনয়। ওরা হয়তো ভেবেছে, ভুজুং ভাজুং দিয়ে আন্দামানে তাদের পৌঁছে দিয়ে বিনয় কলকাতায় চলে যাবে। বিশ্বজিৎ রাহার বাংলোয় রাত কাটাতে যাওয়াটা কৌশলমাত্র। কাল আর সে তাদের কাছে ফিরে আসবে না। আন্দামানের চিফ কমিশনার থেকে বড় বড় অফিসার এবং পুরো পুনর্বাসন দপ্তরের কর্মীরা তাদের যথেষ্ট খাতিরযত্ন করেছে। কিন্তু তাদের ওপর মাত্র একদিনে উদ্বাস্তুদের আস্থা তৈরি হয়নি। বিনয়কে তাদের পাশে চাইই চাই।
বিনয় বলল, ‘আপনাদের হয়তো মনে হয়েছে, এই যে রাহাসাহেব আমাকে তার বাংলোয় নিয়ে যেতে চাইছেন, এর পেছনে আমার কু-মতলব রয়েছে। কিন্তু আপনারা তো শুনেছেন, মুখের কথা খসালেই কলকাতায় ফেরা যায় না। তিন সপ্তাহ পর পর এখান থেকে কলকাতার জাহাজ ছাড়ে। কম করে তিন সপ্তাহ আমাকে এখানে থাকতেই হবে। নিশ্চিন্ত থাকুন, কাল সকালেই আপনাদের কাছে চলে আসব।‘
উদ্বাস্তুরা তাকে ঘিরে ধরেছিল৷ ভিড়ের সামনের দিকে রয়েছে হলধর দাস। তার কাঁধে একটা হাত রেখে বিনয় বলল, ‘আপনি তো জানেন, আপনাদের হেমকর্তার নাতি মিছে কথা বলে না।
অনেক বোঝানোর পর উদ্বাস্তুরা অনিচ্ছাসত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত রাজি হল। আজ রাতটা বিনয় বিশ্বজিৎ রাহার বাংলোয় থাকতে পারে।
বিশ্বজিতের ড্রাইভার কালীপদ তার জিপ নিয়ে ঘুরপথে মাঠের পাশের রাস্তায় এসে অপেক্ষা করছিল। বিনয়কে সঙ্গে করে তিনি সেদিকে চলে গেলেন।
এদিকে বিভাস আর নিরঞ্জন লাইন দিয়ে উদ্বাস্তুদের নিয়ে চলেছে এবারডিন মার্কেটের ডানধারের রাস্তার দিকে। বিনয়ের ধারণা ওখানেই কোথাও শরণার্থীদের রাতে থাকার বন্দোবস্ত করা হয়েছে।
১.৪ এবারডিন বাজার
এবারডিন বাজার থেকে যে রাস্তাটা পশ্চিম দিকে,গেছে, সেটা ধরে জিপ ছুটছিল। পাহাড়ি শহর। উঁচু-নিচু পথ। গাড়ি একবার টিলার মাথায় উঠছে, তার পরেই নেমে যাচ্ছে নিচে। চড়াই-উতরাইতে ওঠানামা করতে করতে নাচের তালে দৌড়াচ্ছে জিপটা।
বাজারের জমজমাট এলাকা ছাড়ানোর পর সব কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা। শহর এধারে তেমন দানা বাঁধেনি। দূরে দূরে ছাড়া ছাড়া দু’চারটে বাড়ি চোখে পড়ে। গাড়ি টিলার ওপর চড়লে দু’পাশে গাছ। সেখানে ঝোঁপঝাড়, বুনো গাছের জটলা। উতরাইতে নামলে কিন্তু দৃশ্যটা বদলে যাচ্ছে। এবার ডাইনে বাঁয়ে দুদিকেই সমতল জমিতে ধানের খেত।
রাস্তায় অনেকটা দূরে দূরে ল্যাম্পপোস্টের গায়ে মিটমিট করে দু-একটা বা জ্বলছে। • সেগুলো থাকা না-থাকা সমান। জোনাকির আলোও তার চেয়ে জোরালো। তবে পূর্ণিমার চাঁদ আকাশের অনেকটা উঁচুতে উঠে এসেছে। অঢেল জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে লক্ষ লক্ষ মাইল নিচের পৃথিবী।
জিপের পেছন দিকের সিটে পাশাপাশি বসেছিল বিনয় আর বিশ্বজিৎ। বেশ খানিকটা সময় চুপচাপ কেটেছে। অন্যমনস্কর মতো বাইরের দৃশ্যাবলি দেখছে বিনয়। নতুন একটা জায়গায় এলে সেখানকার সম্বন্ধে আগ্রহ থাকাটা স্বাভাবিক।
‘বিনয়বাবু-’
বিশ্বজিতের ডাক কানে আসতে মুখ ফিরিয়ে তাকায় বিনয়।–’কিছু বলবেন?’
‘হ্যাঁ। ‘রস’ আইল্যান্ডে উদ্বাস্তুরা নামার পর থেকে ওদের যেভাবে রিসিভ করা হয়েছে সেটা আপনার কেমন লাগল?’

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।