বিনয় সিঁড়ি টপকাতে টপকাতে উঠে এল। অন্যদিনের মতো লম্বা প্যাসেজের একধারে মোহনবাঁশির বউ জ্যোৎস্না এবং তাদের তিন ছেলেমেয়ে বসে আছে। ক’দিন ধরে রোজ দু’বেলা হাসপাতালে আসছে ওরা। জ্যোৎস্নার পাংশু মুখ অসীম উৎকণ্ঠায় ভরা থাকত। দেখে মনে হত তার স্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে গেছে। চোখ থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় অবিরাম জল ঝরে যেত। রুক্ষ চুল এলোমেলো হয়ে উড়তে থাকত, সিঁথিতে শুকনো সিঁদুর। পরনে সাতবাসি শাড়ি। ছেলেমেয়েগুলোও কেমন যেন জড়সড় হয়ে গুটিয়ে থাকত। ভয়ার্ত, বিহ্বল। কিন্তু আজ জ্যোৎস্না আর তার তিন সন্তানের সমস্ত উদ্বেগ উধাও। চারটি মুখ ঝলমল করছে খুশিতে। পোর্টব্লেয়ার থেকে চল্লিশ মাইল দূরে জেফ্রি পয়েন্টে যেখানে জঙ্গল নির্মূল করে পূর্বপাকিস্তানের রিফিউজিদের সেটলমেন্ট বসানো হচ্ছে সেখানে ক্রুদ্ধ, হিংস্র জারোয়াদের তির আমূল ঢুকে গিয়েছিল মোহনবাঁশির ফুসফুসে। শেখরনাথরা কী কষ্ট করেই না তাকে পোর্টব্লেয়ারে নিয়ে এসেছিলেন। হাসপাতাল থেকে তাকে বাঁচিয়ে নিয়ে যাবে, কদিন আগেও ভাবতে পারেনি জ্যোৎস্নারা। আজ তাদের মুখ তো আলো হয়ে উঠবেই।
বিনয় জিগ্যেস করল, ‘কাকা কোথায়?’
অন্যদিন ক্কচিৎ দু-একটা শব্দ বেরুতো জ্যোৎস্নার মুখ থেকে। ‘হ’ বা ‘না’। তবে রোজই ব্যাকুল স্বরে বলত, ‘আমার পোলা-মাইয়ার বাপেরে আপনেরা বাঁচান।‘ ব্যস, এটুকুই। আজ তার আতঙ্ক, বিহ্বলতা, কিছুই নেই। সে এখন অনেক সহজ আর স্বাভাবিক। জ্যোৎস্না বলল, ‘বাবায় অহন (এখন) ডাক্তরকত্তার ঘরে। আপনে ফিরা আইলে তেনাগো (তাদের) কাছে যাইতে কইছে।‘
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, যাচ্ছি—’ ব্যস্তভাবে দোতলার অন্য প্রান্তে ডাক্তার চট্টরাজের চেম্বারে চলে এল বিনয়।
চেম্বারে আন্দামান-নিকোবরের চিফ মেডিক্যাল অফিসার ডাক্তার চট্টরাজ, শেখরনাথ এবং একজন নার্স ছাড়া আর কেউ ছিল না। বিনয়ের অস্বাচ্ছন্দ্য বাড়ছিল, ভয়ে ভয়ে চোখের কোণ দিয়ে সে। শেখরনাথের দিকে তাকাল। দেরি করে আসার জন্য তিনি কতটা রুষ্ট হয়েছেন, আন্দাজ করতে চেষ্টা করল। কিন্তু বাইরে থেকে দেখে মনে হল না তিনি অসন্তুষ্ট হয়েছেন। এক লহমা বিনয়ের দিকে তাকিয়ে বেশ সহজভাবেই বললেন, ‘এসে গেছ। বোসো—’
নিঃশব্দে একটা চেয়ারে বসে পড়ল বিনয়। তার মধ্যে যে অস্বস্তি জমা হয়েছিল ধীরে ধীরে কেটে গেল।
বিনয় চেম্বারে ঢোকার আগে থেকেই মোহনবাঁশি সম্পর্কে ডাক্তার চট্টরাজের সঙ্গে শেখরনাথের কথাবার্তা চলছিল। তার খেই ধরে ডাক্তার চট্টরাজ ফের শুরু করলেন।–’কাল বলেছিলাম, আজও মনে করিয়ে দিচ্ছি, মোহনবাঁশিকে ডিসচার্জ করে দেওয়া হচ্ছে ঠিকই কিন্তু পোর্টব্লেয়ারে তার মিনিমাম একটা উইক থাকা দরকার। রোজ তাকে একবার হাসপাতালে এসে চেপ-আপ করাতে হবে। জেফ্রি পয়েন্টে চলে গেলে অত দূর থেকে রোজ রোজ তাকে নিয়ে আসা তো সম্ভব নয়। তাই—’
শেখরনাথ হাসলেন।–-‘মনে আছে। আমার বয়েস হয়েছে ঠিকই, তবে স্মৃতিশক্তিতে এখনও মরচে পড়েনি।‘
ডাক্তার চট্টরাজও একটু হাসলেন, তবে সামান্য অপ্রতিভও দেখাল তাঁকে।–’জানি তো।’ তারপর মোহনবাঁশির প্রসঙ্গে ফিরে গেলেন।–‘প্রেসক্রিপশন লিখে দিচ্ছি। ওষুধগুলো নিয়ম করে তিন বেলা খেতে হবে। সকাল বিকেল দশ মিনিট করে ওকে ধরে ধরে হাঁটাতে হবে। পরীক্ষার পর যদি দেখা যায় সব ঠিক আছে, মাস তিনেক কোনও ভারী কাজ করা চলবে না। ওয়েট তোলা বারণ। ফুল রেস্ট। শরীর খুব উইক। ফুসফুসের উন্ড সেরেছে, তবু এতটুকু রিস্ক নেওয়া উচিত নয়। ফের যদি ব্লিডিং হয় মোহনবাঁশিকে বাঁচানো মুশকিল হবে।’
শেখরনাথ বললেন, ‘তুমি স্বয়ং ধন্বন্তরি, ওকে রক্ষা করেছ। যেমনটা বলবে সেভাবেই ও চলবে।
‘আপনাকে আর বিনয়বাবুকে রোজ কষ্ট করে মোহনবাঁশিকে হাসপাতালে নিয়ে আসতে হবে। । যে কেউ ওকে এনে দেখিয়ে গেলেই চলবে।’
‘আচ্ছা—’
ডাক্তার চট্টরাজ প্রেসক্রিপশন এবং ‘ডিসচার্জ’ অর্ডার লিখে পাশে দাঁড়ানো নার্সটিকে বললেন, ‘সিস্টার, তুমি তেতলা থেকে পেশেন্টকে এখানে নিয়ে এসো। ডাক্তার সুকুমার বোস আর তাপস মিত্রকেও আসতে বলবে।’
নার্স চলে গেল। মিনিট দশেক বাদে মোহনবাঁশি কর্মকারকে ধরে ধরে নামিয়ে নিয়ে এল সে। সঙ্গে দুই তরুণ ডাক্তার। আগেও এদের দেখেছে বিনয়। সুকুমাররা কার-নিকোবরে ক’জন নিমুনিয়া আর টাইফয়েডের রোগী দেখতে গিয়েছিল; তাদের ফিরতে দেরি হচ্ছিল তাই ডাক্তার চট্টরাজ মোহনবাঁশির অপারেশনটা শেষ পর্যন্ত একা নিজেই করতে চেয়েছিলেন। সাহায্যকারী ছাড়া এতবড় অপারেশন করা প্রায় অসম্ভব। সুকুমাররা আরও দেরি করলে মোহনবাঁশিকে হয়তো বাঁচানো যেত না।
ডাক্তার চট্টরাজ তার সহকারীদের বললেন, ‘মোহনবাঁশি রোজ চেক-আপের জন্যে কাল থেকে। আসবে। এই দায়িত্বটা তোমাদের। যদি কোনও সমস্যা হয় আমাকে জানাবে।’
সুকুমার এবং তাপস মাথা নাড়ল। ডাক্তার চট্টরাজের নির্দেশ তারা পালন করবে।
ডাক্তার চট্টরাজ তাঁর চেয়ার থেকে উঠে এলেন। প্রেসক্রিপশনটা শেখরনাথের হাতে দিয়ে মোহনবাঁশির কাঁধে একটা হাত রাখলেন।-এখন কেমন লাগছে?
মোহনবাঁশি ঘাড় কাত করে কৃতজ্ঞ সুরে বলল, ‘ভালা ডাক্তরকত্তা। আপনেগো দয়ায় বাইচা গেছি। কিন্তুক শরীলে বল নাই।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।