লা পোয়ে বলল, ইয়াদ আছে। জরুর নিয়ে যাব। লেকিন—
কী?
আমরা এখান থেকে দিন-পনেরো পর জেফ্রি পয়েন্টে ফিরব। সেখান থেকে মিডল আন্দামান যাব। লেকিন আপনি এখানে থাকলে কী করে আমাদের সঙ্গে যাবেন?
বিনয় মনে মনে ভেবে নিল। ডাক্তার চট্টরাজ যা বলেছেন, বড়জোর দিন ছয় সাত মোহনবাঁশিকে চেক-আপের জন্য হাসপাতালে যেতে হবে, তারপর সে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে জেফ্রি পয়েন্টে ফিরতে পারবে। তাকে নিয়ে শেখরনাথ আর সেও চলে যাবে।
বিনয় বলল, আপনাদের জেফ্রি পয়েন্টে যাবার আগেই আমি সেখানে পৌঁছে যাব। আমাকে ফেলে মিডল আন্দামানে যাবেন না কিন্তু।
লা পোয়ে বলল, আপনাকে জবান দিয়েছি। জরুর নিয়ে যাব। ফিকর মাত কিজিয়ে
বিনয় লা পোয়ের দুটো হাত ধরে গাঢ় গলায় বলল, অনেক ধন্যবাদ। এখন আমি চলি। জেফ্রি পয়েন্টে আবার দেখা হবে।
একটু-পর চড়াইয়ের রাস্তা বেয়ে সেলুলার জেলের দিকে উঠতে উঠতে বিনয়ের মনে হচ্ছিল, লা পোয়ে তাকে মধ্য আন্দামানে ঠিকই নিয়ে যাবে, সেখানকার উদ্বাস্তু সেটলমেন্টগুলোতে ঘুরে ঘুরে ঝিনুককে খুঁজে বের করেও ফেলতে পারবে কিন্তু যে মেয়ে তার অতীতকে জীবন থেকে প্রায় মুছে ফেলেছে, অভিমানে, অসম্মানে, তীব্র গ্লানিবোধে বিনয়ের প্রতি যে চরম উদাসীন তার সামনে গিয়ে আবার দাঁড়ালে সে কী করবে? ধিক্কারে, বিতৃষ্ণায় রূঢ়ভাবে হয়তো বলবে, তুমি চলে যাও। আর কখনও আমার কাছে এসো না৷
ঝিনুক একের পর এক তীব্র শেল হেনে যতই ক্ষত-বিক্ষত, জর্জরিত করুক, মুখ বুজে সব সইবে বিনয়। ঝিনুককে মধ্য আন্দামান থেকে ফিরিয়ে আনতেই হবে। আনতেই হবে। এক অদম্য মরিয়া জেদ যেন তার মাথায় চেপে বসতে থাকে।
তৃতীয় পর্ব সমাপ্ত
৪.০১ সেলুলার জেলের দিকে
৪.১
দুরমনস্কর মতো চড়াইয়ের রাস্তা ভেঙে সেলুলার জেলের দিকে উঠতে উঠতে হঠাৎ থেমে, পেছন ফিরে তাকাল বিনয়। অনেক নিচে সেসোস্ট্রেস বে’র জেটিটায় এর মধ্যে ফিরে গেছে লা-পোয়েরা। তারা কিন্তু এবার আর জেটির লম্বা পাটাতনে বসে তখনকার মতো ঢিলেঢালা মেজাজে আড্ডা জমাতে বসল না। পাশেই বাঁধা রয়েছে তাদের ধবধবে সাদা মোটর বোটটা–’সি-বার্ড’। সবাই একে একে ‘সি-বার্ড’-এ উঠে পড়ল। তারপর বোটটা উপসাগরের ডানদিকের কিনারা ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল। বোঝাই যাচ্ছে লা-পোয়ের ডাইভাররা সমুদ্রে ‘সিপি’ অর্থাৎ নানা ধরনের ‘শেল’ যেমন শঙ্খ, টার্বো, ট্রোবাস, ফ্রগ শেল ইত্যাদি নজরে পড়লেই বোট থামিয়ে, জলে নেমে সেসব তুলতে তুলতে এগিয়ে যাবে। যতক্ষণ দিনের আলো থাকবে, আর উপসাগরের ধারের দিকের অগভীর, স্বচ্ছ জলের তলা অবধি দেখা যাবে, তাদের ‘সিপি’ তোলার কাজ চলতেই থাকবে। বিরামহীন। দিন ফুরিয়ে এলে যখন সূর্য পশ্চিম দিকে মাউন্ট হ্যারিয়েটের আড়ালে নেমে যাবে, ঝাপসা হয়ে যাবে চরাচর, তখন আজকের মতো লা পোয়েদের জলতল থেকে ‘শেল’ বা ‘সিপি’ তোলার কাজ শেষ।
মোটর বোট ‘সি-বার্ড’ জল কেটে কেটে দূরে, আরও দূরে চলে যাচ্ছে। তার ইঞ্জিনের ভটভট আওয়াজ ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে। একসময় ‘সি-বার্ডটাকে আর দেখা গেল না। অনেক দূরে ঘোড়ার খুরের আকারের উপসাগর যেখানে একটা ছোটখাটো পাহাড়ের পাশ দিয়ে ডাইনে ঘুরেছে সেখানে অদৃশ্য হয়ে গেল।
বেলা অনেকটাই বেড়ে গেছে। পোর্টব্লেয়ারের উলটোদিকে, কোনাকুনি ‘রস’ আইল্যান্ডের ওধার থেকে সূর্যটা আকাশের ঢাল বেয়ে বেশ খানিকটা ওপরে উঠে এসেছিল। রোদের তেজ দ্রুত বাড়ছে। সিসোস্ট্রেস উপসাগরের মেজাজ আছে মোটামুটি শান্ত। পাহাড়প্রমাণ ঢেউ ছুটে এসে পাড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে না। এখন চারিদিকে লক্ষ কোটি ছোট ছোট ঢেউ। সেগুলোর ওপর রোদ এসে পড়ায় ঝকমক করছে। সব মিলিয়ে সমুদ্র জুড়ে পরমাশ্চর্য এক রোশনাই। কিছুক্ষণ পর কিন্তু সেদিকে তাকিয়ে থাকা যাবে না। বেলা যত আরও চড়বে, রোদ যত তীব্র হবে, নোনা জলের ঢেউ থেকে এমন ঝঝ উঠে আসবে যে চোখ ঝলসে যাবে।
যতদূর চোখ যায়, উপসাগরের দিকে ঝুঁকে অজস্র সিগাল উড়ছে। এই সাগর-পাখিদের পেটে সারাক্ষণ রাহুর খিদে। তাদের ধ্যানজ্ঞান সেসোস্ট্রেস বে’র জলের দিকে। মাছের নড়চড়া চোখে পড়লেই চকিতে তড়িৎগতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, পরক্ষণে ধারালো ঠোঁট এবং পায়ের নখ দিয়ে গেঁথে শিকার। তুলে আনছে। সারা উপসাগর জুড়ে এই একই দৃশ্য। আন্দামানে আসার পর থেকে এসব দেখে চলেছে বিনয়। সে আর দাঁড়াল না।
লা-পোয়েদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে শেখরনাথের কথা খেয়াল ছিল না। আজ মোহনর্বাশি কর্মকারকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ করে দেওয়া হবে, তাও ভুলে গিয়েছিল। শেখরনাথকে বিনয় বলেছিল, কয়েক মিনিটের ভেতর ফিরে আসবে কিন্তু অনেকটা সময় কেটে গেছে। প্রায় চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ মিনিট। নিশ্চয়ই শেখরনাথ খুব বিরক্ত হচ্ছেন। বিনয় অস্বস্তি বোধ করল। পাহাড়ি রাস্তার চড়াই ভাঙার গতি অনেকটাই বাড়িয়ে দিল সে।
সেলুলার জেলের বিশাল গেটের পাল্লাদু’টো দিনরাত হাট করে খোলা থাকে। এখনও রয়েছে। বিনয় গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
সকালের দিকে হাসপাতাল আর অফিসগুলো মোটামুটি ফাঁকাই থাকে। এখন বেলা বাড়ার পর লোজনও বেড়েছে। ব্যস্ততাও। অফিসগুলো গমগম করছে। হাসপাতালেও বেশ ভিড়। এই সময়টা হাসপাতালের এবেলার ভিজিটিং আওয়ার্স। যেসব রোগী ভর্তি আছে তাদের বাড়ি থেকে আত্মীয়-পরিজনেরা এসেছে। তাছাড়া পোর্টব্লেয়ার এবং কাছাকাছি দ্বীপগুলো থেকে নতুন পেশেন্ট নিয়ে অনেক গাড়িও আসছে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।