বিনয় চুপচাপ শুনতে লাগল।
শেখরনাথ থামেননি। সেলুলার জেল তৈরি হবার আগে এসেছিলেন বিদ্রোহী সিপাহিরা। জেলখানা তৈরি হলে টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরির গোড়ার দিক থেকে যে বিপ্লবীরা জাহাজ বোঝাই হয়ে এখানে এসেছেন তাদের ওপর কত নির্যাতন যে হয়েছে তার কিছু কিছু নমুনা তোমাকে জানিয়েছি। এই জেলের তিন আর দুনম্বর ব্লকে আর খানিক দূরে ভাইপার আইল্যান্ডে ছিল ফাঁসিঘর। কত বিপ্লবীকে যে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছে, তার হিসেব নেই।
বিনয় বলল, আমার একটা কথা জানতে ইচ্ছা করছে। যদি কিছু মনে না করেন, বলব?
শেখরনাথ বললেন, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। মনে করার প্রশ্নই নেই।
যে সব বিপ্লবী এখানে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরের সাজা খাটতে এসেছিলেন তাদের তো মৃত্যুভয় ছিল না। এত নির্যাতন তারা মুখ বুজে সহ্য করেছেন!
বিপ্লবীরা সম্পূর্ণ নিরস্ত্র, সেলের ভেতর বেশিরভাগ বন্দি থাকত। কারও কারও হাতে-পায়ে ডান্ডাবেড়ি৷ তবু তারই মধ্যে প্রতিবাদ অবশ্য করা হয়েছে। পুরানো নথিপত্র যেটুকু পেয়েছি। সেসব ঘেঁটে জেনেছি অলিপুর বোমার মামলায় অপরাধী সাব্যস্ত হয়ে বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, উল্লাসকর। দত্তরা এখানে আসার পর ননীগোপাল নামে অল্পবয়সি যুবক বিপ্লবীকে সেলুলার জেলে পাঠানো হয়। তার আসার আগে থেকেই বিপ্লবীদের মধ্যে প্রচণ্ড অসন্তোষ জমা হচ্ছিল। তারা আন্দোলন শুরু করেছিলেন। জেলে যে অখাদ্য কুখাদ্য দেওয়া। হয় তার বদলে ভালো খাবার দিতে হবে, রাজবন্দিদের অমানুষিক খাটুনি বন্ধ করতে হবে ইত্যাদি। ননীগোপাল এসেই খাওয়াদাওয়া এবং ছোবড়া পেটানো বা ঘানি টানার মতো কাজ বন্ধ করে দিল। তাকে জেলের পোশাকের বদলে চটের জাঙিয়া আর জামা পরতে দেওয়া হল, কুঠুরিতে পুরে রাখা হল, কিন্তু যে বিপ্লবমন্ত্রে দীক্ষা নিয়েছে, দুই আঙুলে সে মৃত্যু নিয়ে খেলা করে, তাকে এসব দিয়ে কি দমানো যায়? ননীগোপালের এই প্রতিবাদ ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে। পরে যে বিপ্লবীরা এসেছেন তাঁরাও বারবার জেল অথরিটির বর্বর দমননীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন। স্রেফ অনশন আর কাজ বন্ধ।
বিনয় বলল, গান্ধীজির মতো প্যাসিভ রেজিস্টান্স?
শেখরনাথ মৃদু হাসলেন। তা বলতে পার।
এইসব আন্দোলনের রেজাল্ট কী হয়েছিল?
একরকম ঢোক গিলে প্রশাসনকে একটা কমিশন বসাতে হয়। কমিশনের কর্তাদের সুপারিশ ছিল রাজবন্দিদের সঙ্গে একটু মানবিক ব্যবহার করা হোক। কিন্তু সেসব সুপারিশ বস্তায় পুরে গুদামে ফেলে রাখা হয়েছে। তার ওপর ধুলোর স্তর জমেছে। কিন্তু সিস্টেম পালটায়নি। ট্র্যাডিশন সমানে চলছিলই।
একটু চুপ করলেন শেখরনাথ। তারপর ফের শুরু হল আন্দোলন, সম্পর্কে পরে তোমাকে ডিটেলে সব বলব। এখন ইতিহাসের কথা বলছিলাম, সেখানে ফিরে যাই। আমরা সেলুলার জেলে আসার পর উনিশশো তিরিশে লাহোর ষড়যন্ত্র মামলার রায়ে ভগৎ সিং, শুকদেব এবং রাজগুরুকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। জয়দেব কাপুর, বিজয় সিং, কমলনাথ তেওয়ারি, বটুকেশ্বর দত্ত এমন কয়েকজনকে ট্রান্সপোর্টেশনের শাস্তি দিয়ে আন্দামানে পাঠানো হল। এলেন চট্টগ্রামের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইংরেজরা যাকে বলত চিটাগাং আর্মারি রেইড, অসমসাহসী যোদ্ধারা। দেখতে দেখতে কয়েকটা বছর কেটে গেল। আমরা যারা আগে কালাপানি এসেছিলাম তাদের আর ছোবড়া পেটানোর বা ঘানি টানার মতো হাড়ভাঙা খাটুনির কাজ করতে হত না, আমাদের সেলুলার জেলের বাইরে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট বা পি ডব্লু ডিতে ডিউটি দেওয়া হল। আমি ছিলাম পি ডব্লুতে। কয়েদিরা পাথর ভেঙে রাস্তা বানাত; আমাকে তার তদারকি করতে হত। পাছে পালিয়ে যাই, সেজন্য পাহারাদার থাকত আর্মড পুলিশরা। ডিউটি শেষ হলে আবার আমাকে জেলখানায় ফিরিয়ে আনা হত। তবে খুব বেশিদিন নয়, কী কারণে আমার ওপর জেল অথরিটি সদয় হয়েছিল জানি না। হয়তো ভেবেছিল, ব্যাটা পালাবে কোথায়? জঙ্গলে ঢুকলে জারোয়াদের তিরে পঞ্চত্বপ্রাপ্তি ঘটবে; আর সমুদ্রে নামলে সোজা হাঙরের পেটে চলে যাবে। আমার থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল পোর্টব্লেয়ারেরই হ্যাঁডো নামে একটা এলাকায়।
আবার কিছুক্ষণ নীরবতা।
শেখরনাথ নিজের মধ্যে যেন মগ্ন হয়ে রইলেন। পুরনো স্মৃতি তাঁকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। বিনয় অপেক্ষা করতে লাগল।
একসময় শেখরনাথ বলতে লাগলেন সময় উড়ে যাচ্ছিল ঝড়ের গতিতে। উনিশশো উনচল্লিশে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হল। চোখের পলকে তা ছড়িয়ে পড়ল সারা পৃথিবীতে। জাপান ছিল অক্ষশক্তি অর্থাৎ অ্যাক্সিস ফোর্সের এক বিরাট শক্তি। জার্মানি আর ইতালির শরিক। তারা দুরন্ত বেগে ধেয়ে আসছে ভারতের বিশেষ করে কলকাতার দিকে। একে একে পতন হচ্ছে সিঙ্গাপুর, মালয় এবং বার্মার। কলকাতা দখল করতে পারলে জাপানি ফৌজ হু হু করে ঢুকে যাবে সারা ভারতে। অ্যালায়েড ফোর্সের প্রধান শরিক ইংরেজরা কলকাতাসুদ্ধ সারা বাংলাদেশ ওদিকে আসামকে এমনভাবে সুরক্ষিত করে ফেলল যাতে জাপানিরা। কোনওভাবেই ঢুকতে না পারে। ইংরেজ আর আমেরিকান টমিতে ছেয়ে গেল ইস্টার্ন ইন্ডিয়া।
বিনয় বলল, কাকা, আপনি হয়তো শুনেছেন, আমরা আনডিভাইডেড বেঙ্গলের ঢাকা ডিস্ট্রিক্টের বিক্রমপুরে রাজদিয়া নামে একটা জায়গায় থাকতাম। সেখানেও ইংরেজরা রাতারাতি একটা সেনা ঘাঁটি বসিয়ে ফেলল। কত যে ব্রিটিশ আর আমেরিকান নিগ্রো সোলজারকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সারাদিন, এমনকী রাতেও তারা জিপে এলাকায় টহল দিয়ে বেড়াত।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।