বিনয় বলল, সবার নাম জানি না। দুচারজনের নাম শুনেছি বা বইয়ে পড়েছি।
শেখরনাথ সামান্য ভর্ৎসনার সুরে বললেন, একজন ভারতীয় হিসেবে জানা উচিত। দেশের জন্যে জীবন উৎসর্গ করেছেন তাদের কথা না জানাটা অপরাধ। আমরা বাবর, হুমায়ুন, জাহাঙ্গির, চেঙ্গিস খান, মহম্মদ ঘোরি, আলেকজান্ডার কি ক্লাইভ, হেস্টিংস, ডালহৌসি, ওয়েলেসলিদের জীবনচরিত কী তাদের কীর্তিকলাপের কথা গড় গড় করে আওড়ে যেতে পারি, অথচ এই বিপ্লবীদের সম্বন্ধে কিছুই জানি না, হয়তো জানার আগ্রহই নেই। এটা গৌরবের কথা নয় বিনয়।
শেখরনাথের দিকে তাকাতে পারছিল না বিনয়। সে চুপ করে থাকে।
শেখরনাথ বলতে লাগলেন, তোমাকে কয়েকজনের নাম বলছি, আলিপুর বোমার মামলায় নির্বাসনের সাজা খাটতে এসেছিলেন উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমচন্দ্র দাস, উল্লাসকর দত্ত, বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, অবিনাশ ভট্টাচার্য, বীরেন্দ্র সেনরা। নাসিক ষড়যন্ত্র মামলায় মহারাষ্ট্র থেকে সাভারকর ভাইরা– বিনায়ক দামোদর সাভারকর আর গণেশ দামোদর সাভারকর। তাঁদের সঙ্গে নারায়ণ যোশি এমনি অনেকে। ঢাকা থেকে পুলিনবিহারী দাস, জ্যোতির্ময় রায়, খুলনা থেকে সুধীর দে, অশ্বিনীকুমার বসু, শচীন্দ্র মিত্র, ডালহৌসি স্কোয়ার মামলায় শাস্তি পাওয়া ননীগোপাল মুখার্জি। কত নাম আর বলব!
একটু নীরবতা।
তারপর ভেবে ভেবে ফের বলতে শুরু করলেন শেখরনাথ। বোমা-বন্দুক হাতে সশস্ত্র বিপ্লবের পথে পা বাড়িয়েছিলেন যাঁরা শুধু তারাই নন, দুঃসাহসী সাংবাদিক এবং রাজদ্রোহমূলক লেখালেখির জন্য যে সব খবরের কাগজের সম্পাদক অপরাধী সাব্যস্ত হতেন তাদের সেলুলার জেলে পাঠানো হত। যেমন এলাহাবাদের স্বরাজ পত্রিকার নন্দগোপাল, হোতিলাল রামহরি বা রামচরণ লাল। যেভাবেই হোক, বিপ্লবী বা কঠোর সমালোচনা করে ইংরেজ রাজত্বের কুকীর্তি, অত্যাচার সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে চাইতেন তাদের বিরুদ্ধেও চরম দমননীতি নিয়েছিল সরকার। এঁদের হাত থেকে কলম কেড়ে নাও, যেভাবে হোক এদের কণ্ঠরোধ কর। তারা যেন সিডিশান ছড়াতে না পারে।
বিনয় জিগ্যেস করল, সেলুলার জেলে এইসব সাংবাদিকের ওপরও কি টরচার চালানো হত?
শেখরনাথের দুচোখ কৌতুকে ঝিকমিক করে ওঠে।–হত মানে! তোমার কি ধারণা,সম্পাদকরা সাংবাদিকরা ইংরেজদের গুরুঠাকুর? বলতে বলতে তার স্বর গম্ভীর হয়ে ওঠে- আমার ধারণা, বোমা-পিস্তলের চেয়ে কলমের শক্তি অনেক বেশি।
বিনয় উত্তর দেয় না। প্রাক্তন বিপ্লবীর দিকে গভীর আগ্রহে তাকিয়ে থাকে।
শেখরনাথ থামেননি। স্বদেশি ডাকাতির কথা শুনেছ নিশ্চয়ই?
শুনেছি। বিনয় মাথা নাড়ে।
বিপ্লবীদের তো টাকাপয়সা নেই। গোপনে অস্ত্রশস্ত্র কিনতে ডাকাতি না করে উপায় ছিল না। দেশের কাজের জন্যেই এসব করতে হত। তাছাড়া অত্যাচারী বা ম্যাজিষ্ট্রেট হত্যা তো ছিলই। এই ধরনের ঘটনা কাগজে প্রচার না করা হলে দেশের লোক। জানবে কী করে? মানুষের কাছে পৌঁছবার একমাত্র বাহন তো সংবাদপত্র। বেশিরভাগ পত্রিকা ছিল ইংরেজের খয়ের খাঁ। তাদের অনেকেই এসব এড়িয়ে যেত। অনেকে ছোট করে ছাপত, সেই সঙ্গে বিপ্লবীদের মুণ্ডপাতও করত। কিন্তু যাদের দুর্জয় সাহস তাঁরা কিন্তু ইংরেজের রক্তচক্ষু গ্রাহ্য করতেন না। কাগজে তো ছাপতেনই, সেই সঙ্গে ভারতের বীর সন্তান এইসব বিপ্লবীর দেশপ্রেমকে কুর্নিশ করে এডিটোরিয়াল বা নানারকম আর্টিকল লিখতেন। ইংরেজ এঁদের ভীষণ ভয় পেত। জেল, জরিমানা, কাগজের প্রকাশ বন্ধ করে দেওয়া– এসব তো ছিলই। যাঁদের কোনওভাবেই দমাতে পারা যেত না তাঁদের কালাপানি পাঠানো হত।
আচ্ছা—
বল—
এঁদেরও কি ঘানিটানি টানতে হত?
শেখরনাথ হেসে ফেললেন। এ হল হরিহরছত্রের মেলা। এই জেলের ভাষায় এখানকার সবাই বরাবর মানে সমান। খুনের আসামি, রেভোলিউশনারি বা কাগজের বিখ্যাত সব এডিটর জেল অথরিটির চোখে এদের মধ্যে প্রভেদ নেই। কাগজের লোক বলে বেদিতে বসিয়ে পুজো করবে তেমন বান্দাই নয় ব্রিটিশ জেলার। খুনি কয়েদিদের পাশে দাঁড়িয়ে হোতিলাল, নন্দগোপাল বা রামচরণ লালদের ঘানি ঘোরাতে, ছোবড়া পিটতে কী পাথর ভাঙতে হত। আমাদের আগে যারা এসেছিলেন তাদের কপালে একই দুর্ভোগ ছিল। শুধু. নির্যাতন, নির্যাতন আর নির্যাতন। সেলুলার জেলের ট্রাডিশন সমানে চলছিলই৷
বিনয় কোনও প্রশ্ন করল না।
শেখরনাথ বলেই যাচ্ছেন। তোমাকে রাজনাথের কথা বলেছি। সে পাগল হয়ে গিয়েছিল। তার আগে আলিপুর বোমার মামলায় যাঁরা কালাপানি এসেছিলেন তাদের মধ্যে উল্লাসকর দত্তও ছিলেন। তিনিও উন্মাদ হয়ে যান। এঁদের মতো অসংখ্য বিপ্লবী অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে উন্মাদ হয়ে গেছেন। ইংরেজ একটা পরিকল্পনা ছকে নিয়ে সেই সিপাহি বিদ্রোহের পর থেকে মুক্তি সংগ্রামীদের আন্দামানে পাঠিয়েছিল। সেই অমানুষিক ছকটা ছিল এই দেশপ্রেমিকদের নির্মমভাবে হত্যা করা। বিনয়, তুমি শুনলে অবাক হবে দেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধের অর্থাৎ সিপয় মিউটিনির বীর সৈনিকদের একজনও জীবন্ত অবস্থায় ভারতের মূল ভূখণ্ডে ফিরে আসেনি। তাদের কারওকে গাছের ডালে ঝুলিয়ে, কারওকে গুলি করে, কারও পেছনে ডালকুত্তা লেলিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। ব্রিটিশ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন যেন বুঝিয়ে দিয়েছিল, তোরা স্বাধীনতা চেয়েছিলি তো? এবার মজাটা বোঝা কী ভয়ংকর প্রতিহিংসাপরায়ণ এই নৃশংস সাম্রাজ্যবাদীরা!

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।