শেখরনাথ বলতে লাগলেন, একদিকে তোজোর জাপ বাহিন, অন্যদিকে নেতাজি সুভাষচন্দ্রের আজাদ হিন্দ ফৌজ ভারতের দিকে এগিয়ে আসছিল। আজাদ হিন্দ বাহিনীর লক্ষ্য ছিল মণিপুরের ভেতর দিয়ে আসামে ঢুকে পড়া এবং দেশকে স্বাধীন করা। সে যাক, ইংরেজরা চারদিক এত তো দুর্ভেদ্য করে তুলছিল কিন্তু আল্লামান দ্বীপপুঞ্জকে রক্ষা করতে পারেনি। জাপানিরা তা দখল করে নেয়। যতদূর মনে পড়ছে সেটা উনিশশো বেয়াল্লিশ সালের গোড়ার দিক। ইংরেজরা তাদের রুখতে না পেরে ভীরু কুকুরের মতো পালিয়ে যায়। ইংরেজের যত দাপট সাধারণ নিরস্ত্র ভারতীয়দের ওপর। কিন্তু ব্রিটিশ জাতটা ধুরন্ধর। এখান থেকে পালাবার আগে, সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছু গুপ্তচর ঢুকিয়ে দিয়ে গিয়েছিল। এই স্পাইরা কী করেছিল, পরে বলছি।
এদিকে জাপানিরা কিন্তু আন্দামান দখল করে স্থায়ীভাবে থেকে যেতে আসেনি। জাপানের পার্লামেন্ট নেতাজি সুভাষচন্দ্রকে আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে মেনে নেয়। কিন্তু তার মধ্যেও চাতুরি ছিল। আসল। ক্ষমতা কিন্তু ছিল জাপানিদের হাতেই।
নেতাজি খুব সম্ভব উনিশশো তেতাল্লিশের শেষাশেষি একটি বিমানে আন্দামনে এসেছিলেন। ভারতের মাটিতে সেটাই বোধহয় তার শেষ পা রাখা।
বিনয়, তুমি নিশ্চয়ই জানো, সুভাষচন্দ্র এখানে এসে জিমখানা ময়দানে মার্কেটের সামনে এক অনুষ্ঠানে তাঁর আই এন এর পতাকা তুলে দেশবাসীর উদ্দেশে ভাষণ দেন। আমরা তার সভায় গিয়েছিলাম। তার ইচ্ছা ছিল আন্দামানের নাম হোক শহিদ দ্বীপ আর নিকোবর হোক স্বরাজ দ্বীপ। দেশ স্বাধীন হবার পর সেই ইচ্ছা এখনও পূরণ হয়নি৷
নেতাজি সেলুলার জেল এবং পোর্টব্লেয়ারের চারপাশে বেশ কিছু গ্রামেও গিয়েছিলেন। জেলখানায় তখন রাজবন্দি একজনও ছিলেন না, ছিল প্রচুর সাধারণ কয়েদি। গ্রামে বা সেলুলার জেলে যেখানেই তিনি গেছেন, জাপানি সৈন্যরা তাকে এমনভাবে ঘিরে রেখেছে যাতে এখানকার মানুষের কোনও অভিযোগ বা জাপ শাসনে তাদের দিন কীভাবে কাটছে, প্রায় কিছুই জানতে পারেননি।
ওই যে গুপ্তচরদের কথা বলছিলাম, তারা গোপনে ব্রিটিশ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনকে জাপানিদের সম্বন্ধে অনেক খবর দিচ্ছিল। সেই অনুযায়ী ইংরেজরা এখানে মাঝে মাঝেই বিমান হানা চালায় এবং জাপানিদের প্রচুর ক্ষতি করে। ফলে তারা প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তাদের চরম হিংস্র চেহারাটি নখ দাঁত মেলে বেরিয়ে পড়ে।
জাপানিদের ধারণা হয়েছিল, এই দ্বীপের প্রতিটি মানুষ ইংরেজের গুপ্তচর। তারা যে ভয়ানক নির্যাতন চালিয়েছিল, ইংরেজদের দমননীতি তার কাছে প্রায় কিছুই না।
গুপ্তচর সন্দেহে অজস্র মানুষকে তারা ঠান্ডা মাথায় খুন করেছে। একবার পোর্টব্লেয়ারের কাছাকাছি হামফ্রেগঞ্জে চুয়াল্লিশ জনকে নিয়ে গিয়ে একদিনে তাদের হত্যা করে। ইংরেজ হোক আর জাপানিই হোক, সাম্রাজ্যবাদীদের চেহারা প্রায় একইরকম।
উনিশশো পঁয়তাল্লিশ সালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ থামল। মিত্রশক্তির জয় হল। অক্ষশক্তি সম্পূর্ণ পর্যুদস্ত। জাপানের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। মারাত্মক। হিরোসিমা নাগাসাকিতে অ্যাটম বোমা ফেলে তার শিরদাঁড়া গুঁড়িয়ে ফেলা হয়। জাপান আত্মসমর্পণ করে।
আন্দামান নিকোবরে তাদের আর থাকা সম্ভব ছিল না। ইংরেজদের হাতে দুই দ্বীপপুঞ্জ তুলে দিয়ে তারা চলে যায়। তার। আগে আন্দমানের বহু মানুষকে জলে ডুবিয়ে খুন করে। ইংরেজরা এখানে ফিরে আসার পর ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট সেলুলার জেল চিরকালের মতো বন্ধ করে দেয়।
জাপানিরা যে কত ধূর্ত তা জানা গিয়েছিল পরে।
বিনয় উৎসুক চোখে তাকিয়ে ছিল। জিগ্যেস করল, কী জানা গিয়েছিল?
শেখরনাথ বললেন, ওরা যে মানুষের ওপর চরম নির্যাতন চালিয়েছিল তার বিশেষ কোনও নথিপত্র পাওয়া যায়নি। প্রায় সব ডকুমেন্ট পুড়িয়ে দিয়ে চলে যায়। এখানকার পেনাল সেটলমেন্টের পুরনো বাসিন্দাদের কাছে গেলে সে সব ইতিহাস জানতে পারবে। জাপানিরা যে তিন বছরের মতো এখানে ছিল, আন্দামানের ইতিহাসে সেটা কলঙ্কজনক চ্যাপ্টার।
আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে বিনয়।
শেখরনাথ বলতে লাগলেন, পঁয়তাল্লিশে যুদ্ধ থামল। ছেচল্লিশে সারা দেশ জুড়ে দাঙ্গা, পূর্ব বাংলা থেকে সুদূর লাহোর, করাচি পর্যন্ত শুধু আগুন, ধর্ষণ আর রক্তস্রোত। কত নিরীহ মানুষ যে মারা গেল; কত তরুণীর জীবনে যে সর্বনাশ ঘটে গেল! দাঙ্গার এক বছর পর পার্টিশান। আচ্ছা বিনয়—
বিনয় বলে, কী কাকা?
সেই সিপয় মিউটিনির পর থেকে এই আন্দামান দ্বীপে কত হাজার হাজার স্বাধীনতা সংগ্রামীকে হত্যা করা হয়েছে তার হিসেব নেই। শুধু কী আন্দামানেই, সারা ইন্ডিয়াতেই ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট অগুনতি বিপ্লবীকে গুলি করে বা ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করেছে। কত যে মুক্তিযোদ্ধা দেশের শত শত কয়েদখানায় বছরের পর বছর বন্দি থেকে জীবন ক্ষয় করে ফেলেছে। এত মানুষের আত্মদানের বদলে আমরা কোন স্বাধীনতা পেয়েছি? বিকলাঙ্গ, ভাঙাচোরা, পোকায়-কাটা এক ফ্রিডম।
শেখরনাথের বুকের ভেতর কত ক্ষোভ, কত উষ্ম, কত বেদনা যে পুঞ্জীভূত হয়েছিল! সেসব ঠিকরে ঠিকরে বেরিয়ে আসতে লাগল। বিনয় নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে।
শেখরনাথ বলতে লাগলেন, তাঁর মুখ উত্তেজনায় লাল হয়ে উঠেছে, কণ্ঠস্বরে তীব্র ঝাঝা পার্টিশনের পর লক্ষ লক্ষ মানুষ, যাদের কোনও অপরাধ নেই, যারা রাজনীতির ধার ধারে না, তারা সর্বস্ব খুইয়ে সীমান্তের এপারে চলে এল। এখনও আসছে। কত বছর, কত কাল ধরে আসতে থাকবে, কেউ জানে না। যে ভূখণ্ডটি তাদের পিতৃপুরুষের বাসভূমি ছিল, ছিল তাদের জন্মস্থান, এক লহমায় সেটা আর তাদের রইল না। শিয়ালদা স্টেশনে, রিলিফ ক্যাম্পে ক্যাম্পে তারা পচে মরছে। মাথা গোঁজার একটুকরো জমির জন্যে তাদের পাঠানো হচ্ছে আন্দামানের জঙ্গলে, ওড়িশায়। শুনছি, দণ্ডকারণ্যেও রিহ্যাবিলিটেশনের জন্য একটা প্রোজেক্টের কথা ভাবা হচ্ছে। তাই নিয়েও কত রকমের দড়ি টানাটানি, কত পলিটিকস।–এর নাম স্বাধীনতা?

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।