জিগ্যেস করলাম, সাউথ পয়েন্ট জেলটা ঠিক কোন জায়গায়? বৈজু বুঝিয়ে দিল সিসোস্ট্রেস উপসাগরের এক মাথায় পাহাড়ের মাথায় সেলুলার জেল, আর উপসাগর যেখানে ডান দিকে অনেকটা এগিয়ে ঘুরে ডান পাশে গেছে সেই বাঁকের মুখে সাউথ পয়েন্ট জেল।
পরের দিনই সেই পুলিশ অফিসার হরীন্দর সিং এবং দুজন আর্মড পুলিশ এসে বৈজুকে নিয়ে গেল। আর সে সেলুলার জেলে ফিরে আসেনি। বহু বছর বাদে, স্বাধীনতার পর আবার তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। কীভাবে তার বিয়ে হয়েছে সেদিন জানতে পারলাম। কিন্তু তা অন্য কাহিনি।
***
পুরনো দিনের স্মৃতির ভেতর ডুবে গেলেও সময় সম্পর্কে পুরোপুরি খেয়াল থাকে শেখরনাথের। বিনয় লক্ষ করেছে দুপুর হলে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। আজও তেমনটাই দেখা গেল। মুখ তুলে একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, অনেক বেলা হয়ে গেল। এবারডিন মার্কেট থেকে দুপুরে খাবার কিনে হাসপাতালে ফিরতে হবে। মোহনবাঁশির বউ ছেলেমেয়েরা অপেক্ষা করছে।
বিনয় উত্তর দিল না। সে যেন আশ্চর্য এক ঘোরের মধ্যে রয়েছে। শেখরনাথের বলার ভঙ্গিটা এমন চমৎকার যে পরাধীন আমলের সেলুলার জেলের নানা বিচিত্র ঘটনা, আজব সব কয়েদি, পুলিশ অফিসার, আর্মড গার্ডরা ছবির মতো চোখের সামনে ফুটে উঠছিল। প্রাক্তন বিপ্লবীর বর্ণনার গুণে সব যেন জীবন্ত মনে হচ্ছে।
কিন্তু সকলকে ছাপিয়ে বৈজুই বার বার চোখের সামনে এসে পড়ছে। হঠাৎ মনে পড়ল, কিছুদিন আগে জেফ্রি পয়েন্টের উদ্বাস্তু কলোনির সৃষ্টিধরের গর্ভবতী বউকে প্রসব করানোর জন্য দাই। জোগাড় করতে শেখরনাথের সঙ্গে অনেকটা দূরের আরেকটা রিফিউজি কলোনিতে গিয়েছিল বিনয়। সেই কলোনিটার গা ঘেঁষে রয়েছে ব্রিটিশদের বসানো পেনাল সেটলমেন্ট। সেখানে রঘুবীর সিং এবং তার বর্মি বউ মা পোয়ের পরিচয় হয়েছিল। তারাও জেল খাটতে আন্দামানে এসেছিল বহুকাল আগে। ম্যারেজ সার্টিফিকেট পেয়ে নিশ্চয়ই তাদের বিয়ে হয়। কিন্তু আন্দামানের জেলে কোন পদ্ধতিতে ওদের বিয়ে হয়েছে, শোনা হয়নি। আজও শেখরনাথ বৈজুর বিয়ের ব্যাপারে খুঁটিনাটি কিছুই জানাননি। কেননা তিনি তখন সেলুলার জেলে, সেই সময় তার পক্ষে সব জানা সম্ভব ছিল না। পরে অবশ্যই জেনেছেন। কিন্তু দুপুর হয়ে যাওয়ায় তা বলা হয়নি।
বিনয় ঠিক করে ফেলল, শেখরনাথকে আর কিছু জিগ্যেস করবে না। মোহনবাঁশি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠলে তিনি তো শাদিপুরে বৈজুদের বাড়িতে যাচ্ছেনই। বিনয়কেও নিয়ে যাবেন বলেছেন। যারা নিজেরা বিয়ে করেছে তাদের মুখ থেকে শোনা আর তৃতীয় পক্ষের কাছে শোনার মধ্যে প্রচুর তফাত। অনেক কিছু বাদ পড়ে যায়। বিনয় বৈজুদের কাছ থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সমস্ত জেনে নেবে।
আন্দামানে ব্রিটিশ আমলে পুরুষ এবং মেয়ে কয়েদিদের মধ্যে কীভাবে বিয়ে হত তা নিয়ে একটা চমকে দেবার মতো লেখা তৈরি করা যায়। তাতে নতুন ভারত-এর পাঠকরা নিশ্চয়ই খুশি হবে। বিস্ময়কর অজানা তথ্যগুলোকে গুছিয়ে গুছিয়ে গল্পের আকার দেওয়া দরকার।
লেখাটি বেরোলে নতুন ভারত সম্পর্কে মানুষের আগ্রহ বেড়ে যাবে। শেখরনাথের পাশাপাশি হাঁটতে লাগল বিনয়।
৩.০৯ আবার এল বিনয়রা
অন্য সব দিনের মতো পরদিন সকালে যথারীতি আবার এল বিনয়রা।
মোহনবাঁশিকে দেখে, ডাক্তার চট্টরাজের সঙ্গে কিছুক্ষণ পেশেন্ট সম্পর্কে কথা বলে, দোতলার অলিন্দে জ্যোৎস্না আর ছেলেমেয়েদের বসিয়ে বিনয়কে সঙ্গে করে বেরিয়ে পড়লেন শেখরনাথ।
সংকট আগেই কেটে গিয়েছিল মোহনবাঁশির। তার মুখচোখে অসুস্থতার যে কালচে, পুরু ছোপ পড়েছিল তা প্রায় নেই বললেই হয়। সে জায়গায় সজীবতা ফিরে আসতে শুরু করেছে। ডাক্তার চট্টরাজ বলেছেন, আর চার পাঁচ দিনের মধ্যেই তাকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হবে।
দুজনে তিন নম্বর ব্লকের সামনে চলে এসেছিল। আজ আর বিল্ডিংটার ভেতর ঢুকলেন না শেখরনাথ। বললেন, আজ অন্য কয়েদি নয়, শুধু বিপ্লবীদের কথা তোমাকে বলব। তুমি নিশ্চয়ই জানো, আঠারোশো সাতান্নর সিপয় মিউটিনি দমন করার পর ইংরেজরা কত বিদ্রোহী সিপাহিকে আন্দামানে পাঠিয়েছিল তার কোনও হিসেব নেই। তাদের অনেকের পরিচয় আজ পর্যন্ত জানা যায়নি। তবে যেটুকু হদিশ পাওয়া গেছে তাতে মনে হয়, যাদের আনা হয়েছিল, বেশিরভাগকেই নির্মমভাবে গুলি করে খুন করা হয়। তখনও সেলুলার জেল তৈরি হয়নি।
বিনয় বলল, হ্যাঁ জানি। হিস্টোরিয়ানদের লেখায় পড়েছি।
তিন নম্বর ব্লকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকলেন না শেখরনাথ। তিন, চার এবং পাঁচ নম্বর ব্লকের পাশ দিয়ে বিনয়কে নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে বলতে লাগলেন, টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরির গোড়া থেকেই সারা ভারতবর্ষ জুড়েই ইংরেজদের এদেশ থেকে উৎখাত করার জন্যে সশস্ত্র বিপ্লবীদের নানা গুপ্ত সংগঠন এবং তাঁদের কর্মকাণ্ড তীব্র হতে থাকে। ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট, জেলার বা পুলিশ অফিসারদের ওপর বিপ্লবীরা বোমা-পিস্তল নিয়ে আক্রমণ চালাতে লাগলেন। এঁদের অনেকে মারাও গেলেন। শঙ্কিত বিদেশি শক্তি হাত-পা গুটিয়ে বসে রইল না। তারা রুদ্র মূর্তিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল বিপ্লবীদের ওপর। নানা কৌশলে তাদের ধরে চরম নির্যাতন চালানো হতে লাগল। দেশি মিরজাফররা ইংরেজদের এ ব্যাপারে নানাভাবে সাহায্য করেছে। বিপ্লবীদের অনেকের ফাঁসি– হল, বাকি সবাইকে নানা মামলায় জড়িয়ে দেওয়া হল নানা মেয়াদের জেলা কারওকে পাঁচ বছর, কারওকে সাত বছর, কারওকে দশ বছর। যাদের সাজা আরও বেশি হল তাদের অনেককে পাঠানো হল কালাপানিতে অর্থাৎ এই সেলুলার জেলে। কোন কোন বিপ্লবী এখানে এসেছিলেন, তুমি জানো?

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।