এক নিশ্বাসে সব জানিয়ে জোরে জোরে বারকয়েক শ্বাস টানল বৈজু। তারপর ফের শুরু করল, কাল ভাগোয়া (পলাতক) লছমনকে মিডল আন্দামান থেকে পুলিশ পাকড়ে এনেছে। রুদ্ধশ্বাসে মুকুন্দ আর আমি শুনে যাচ্ছিলাম। জিগ্যেস করলাম, এতদিন সে কোথায় ছিল! কী খেয়েছে? বৈজু বলল, কোথায় আর থাকবে? জঙ্গলে জঙ্গলে কাটিয়ে দিয়েছে। ভাইসাব, আন্দামানে লাখো লাখো নারিয়েল পেঁড় নারকেল গাছ), সমুন্দরে লাখো লাখো মছলি। খানার কি অভাব? নায়িয়েল পেড়ে, মছলি মেরে খেয়েছে। জানতে চাইলাম, লছমন পালিয়েছিল কেন, কিছু শুনেছ? বৈজু ঘাড় কাত করে বলল, শুনা হয়। ও একটা লম্বা নারিয়েল পেড় খুদে খুঁদে নাও (নৌকো) বানিয়ে ফেলেছিল। সেটায় চড়ে সমুন্দর পাড়ি দিয়ে হিন্দুস্থানে ভেঙ্গে পড়ার মতলব করেছিল। সেই সময় ধরা পড়ে যায়। আভি মাইকেল সাব ওর জীনা (বেঁচে থাকা) বরবাদ করে দেবে। মুকুন্দ আর আমি একেবারে থ। বলে কী বৈজু! একটা নারকেল গাছের ডোঙায় চড়ে বদ্ধ উন্মাদ না হলে কেউ সীমাহীন বঙ্গোপসাগর, যেখানে সর্বক্ষণ চার পাঁচ মাইল এলাকা জুড়ে একেকটা পাহাড়প্রমাণ ঢেউ উঠছে, পাড়ি দেবার কথা ভাবতে পারে। পাড় থেকে সিকি মাইল যেতে না-যেতেই তো ডোঙা উলটে যাবে।
বৈজু এবার বলল, ভাইসাব, লছমনের মতো আরও কেউ কেউ নাও বানিয়ে ভাগার কোশিশ করেছে। জিগ্যেস করলাম, তাদের কী হাল হয়েছে? বৈজু বলল, পতা নেহি। তবে কী আর হবে? নাও ডুবে গিয়ে ওই কয়েদিরা বদমাশ মচ্ছির (হাঙর) পেটে গেছে। বিস্ময়কর ঘটনা বটে!
লছমনের মতো কয়েদিদের বিচিত্র রোমহর্ষক কাহিনি শুনে, লিয়াকত এবং ধনিরামের মতো কয়েদিদের আজব কাণ্ডকারখানা দেখে, সেলুলার জেলের পরম উপাদেয় কাঞ্জি খেয়ে, চামড়ার মতো শক্ত চাপাটি চিবিয়ে ছোবড়া পিটে, ঘানি ঘুরিয়ে দিন কেটে যাচ্ছিল। কয়েদখানার আলুনি, বিস্বাদ, একঘেয়ে জীবন একমাত্র ব্রজদাই মাঝে মাঝে রঙ্গ-তামাশা করে মোটামুটি গ্রহণীয় করে তুলেছিলেন।
গ্রীষ্ম বর্ষা শরৎ হেমন্ত ঋতুচক্রে সময় পাক খেয়ে যাচ্ছিল। আন্দামানে আসার পর আমাদের দুটো বছর পার হল। একদিন সকালে কাঞ্জি খেয়ে ঘানি ঘুরিয়ে তেল বের করছি, বৈজুও আমার কাছাকাছি অন্য একটা ঘানি টানছে, মাঝে মাঝে এসে আমারটাও টেনে দিচ্ছে, হঠাৎ একজন জুনিয়র পুলিশ অফিসার, লোকটা ভারতীয়, ঘানিঘরে এসে হাজির। দুবছরে সব অফিসার, সব কনস্টেবলকে চিনে গেছি। এই অফিসারটিকেও চিনি। নাম, হরীন্দ্র সিং। ছফুট হাইটের তাগড়া চেহারা। সে আঙুল নাচিয়ে বৈজুকে বলল, মেরা সাথ আ।
বৈজুকে দুবছর দেখছি। কখনও কোনওরকম ঝঞ্ঝাট বাঁধায়নি। জেলের আইনশৃঙ্খলা ভাঙেনি। আচমকা কেন তাকে তলব করা হল তার তলকূল পাচ্ছি না। রীতিমতো ঘাবড়েই গেলাম। অফিসারটাকে যে জিগ্যেস করব তেমন সাহস হচ্ছিল ন। লোকটা মহা বদমেজাজি। যে কজন অফিসার কয়েদিদের ওপর চরম নির্যাতন চালাতে পটু সে তাদের একজন। বিপ্লব মন্ত্রে– দীক্ষা নেবার পর লক্ষ করেছি, ভারতীয় পুলিশ অফিসাররা ব্রিটিশ অফিসারদের চেয়ে এতটুকু কম অত্যাচার চালায় না। বরং কোনও কোনও সময় ইংরেজদের ছাড়িয়েও যায়। প্রভুভক্ত এই কুকুরেরা তার বদলে পায় দু-চার টুকরো মাংস। কিছু ইনাম, এক আধটা প্রোমোশন, রিটায়ারমেন্টের পর কারও কারও বরাতে খেতাব জুটে যায়।
বৈজুরা চলে গেল। আমাদের মন ভীষণ খারাপ। কিন্তু আধ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই লাফাতে লাফাতে ফিরে এল সে। চোখমুখ থেকে খুশি উপচে পড়ছে।
বৈজু দুহাত ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে একটানা বলতে লাগল, ভগোয়ানকা পাস যো মাঙ্গা ও মিল গিয়া। ঘানিঘরে যারা ছিল তাদের কাছে গিয়ে জনে জনে একই কথা বলছে সে। তার গলার স্বরে কী যে উত্তেজনা!
লোকটা কি পাগল হয়ে গেল। জিগ্যেস করলাম, ভগবানের কাছে কী চেয়েছ? বৈজু বলল, শাদিকা টিকট। মানে বিয়ের টিকিট। আমি অবাক তাকিয়ে থাকি। জিগ্যেস করি, সেটা কী জিনিস।বৈজু একটুকরো চৌকো পেতলের পাত দেখাল। তাতে খোদাই করা রয়েছে: ম্যারেজ সার্টিফিকেট। কিছুই মাথায় ঢুকছে না। আমি অবাক তাকিয়ে থাকি। এবার বৈজু বুঝিয়ে বলল, সেলুলার জেলে ছবছর নিয়মশৃঙ্খলা মেনে শান্তশিষ্ট হয়ে থাকলে বিয়ের সার্টিফিকেট পাওয়া যায়। জেলের কর্তারা সেই বিয়ের ব্যবস্থা করে দেয়। একবার বিয়েটা হয়ে গেলে কারওকে আর সেলুলার জেলের কুঠুরিতে থাকতে হয় না। সে তখন বিয়াহি আওরতকে (বিবাহিত স্ত্রী) নিয়ে শাদিপুরে চলে যায়। যারই বিয়ে হোক তাকে সেখানে যেতে হয়। শাদিপুর পোর্টব্লেয়ারের একটা মহল্লা। বিবাহিতদের আর জেলের ঘানি ঘোরাতে বা ছোবড়া পিটতে হয় না। জেলের বাইরে তাদের নানা রকম সরকারি কাজে লাগিয়ে দেওয়া হয়। সেজন্য তলব (মাইনে) মেলে। সেই টাকায় নিজের নিজের সংসার চালাতে হয়।
আমার বিস্ময় শতগুণ বেড়ে যায়। জানতে চাই, শাদি যে করবে, মেয়ে পাবে কোথায়? বৈজু বলল, এখানে জেনানা ফাটক আছে না? আংরেজরা সেটাকে বলে সাউথ পয়েন (পয়েন্ট) জেল। কয়েদিরা বলে রেন্ডিবারিক জেল।
পোর্ট ব্লেয়ারে আসার পর সাউথ পয়েন্ট জেলের কথা ভাসা ভাসা শুনেছিলাম। কিন্তু সেটা কোথায় এবং কারা সেখানে থাকে, কিছুই জানতাম না। বৈজু বলতে লাগল, তামাম হিন্দুস্থান পর বর্মা মুল্লুক থেকে স্রিফ মরদ কয়েদিরা আসে না। দো-চারঠো খুন করেছে এমন জেনানা কয়েদিরাও কালাপানির সাজা খাটতে আসে। মরদদের বেলায় ছে (ছয়) সাল আর আওরত বেলায় দো সাল। দো সাল যদি তারা ঠিকঠাক থাকে, শাদির টিকট পায়।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।